‘বেঁচে থাকার আরেকটি সুযোগ’: ভূমিকম্পের আতঙ্কের কথা জানালেন ফ্লোরেসের বাসিন্দারা

অনলাইন ডেস্ক:

ইন্দোনেশিয়ার ফ্লোরেস দ্বীপে স্বামীর হাসপাতালের শয্যার পাশে ছিলেন মেলানিয়া নিয়ুস। হঠাৎ শক্তিশালী ভূমিকম্পে কেঁপে ওঠে পুরো শহর। আতঙ্কে রোগীরা হাসপাতাল থেকে বাইরে ছুটে যান।

 

৫৬ বছর বয়সী মেলানিয়া জানান, পরিবারকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করার সময় তিনি প্রার্থনা করছিলেন।

 

ইন্দোনেশিয়ার ফ্লোরেস দ্বীপের পশ্চিম প্রান্তের পাহাড়ি শহর রুতেং থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর জানিয়েছে।

 

শনিবার ভোর সাড়ে ৫টার দিকে ফ্লোরেস দ্বীপের ঠিক উত্তরে ৭ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হানে। মেলানিয়া বলেন, ‘আমরা চারজন ,আমার স্বামী, আমাদের দুই সন্তান ও আমি বিছানায় ছিলাম।’

 

তিনি বলেন, ‘বিছানাটি প্রায় উল্টে যাচ্ছিল। টেবিল ও টেবিলের ওপর ও আলমারির ওপর থাকা সবকিছু পড়ে গিয়ে চারদিকে ছড়িয়ে যায়।’

 

মেলানিয়ার স্বামী বাসিয়ানুস চাক হৃদ্যন্ত্র ও ফুসফুসের সমস্যা এবং ডায়াবেটিসের চিকিৎসার জন্য হাসপাতালের তৃতীয় তলায় ভর্তি ছিলেন।

 

মেলানিয়া বলেন, ‘আমরা আতঙ্কিত হয়ে পড়ি। কম্পন কিছুটা কমলে আমরা সঙ্গে সঙ্গে তার বিছানা ঠেলে বাইরে নিয়ে যাই।’

 

মেলানিয়া জানান, ধ্বংসাবশেষ পড়ে বের হওয়ার পথ আংশিক বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তবে অন্যদের সহায়তায় তারা বের হয়ে আসেন।

 

তিনি বলেন, ‘আমি শুধু প্রার্থনা করছিলাম, ‘হে ঈশ্বর, আপনি যদি আমাদের এখনও বেঁচে থাকার সুযোগ দেন, তাহলে দয়া করে আমাদের জন্য একটি পথ খুলে দিন।’

 

‘ঈশ্বরকে ধন্যবাদ, তিনি আমাদের বেঁচে থাকার আরেকটি সুযোগ দিয়েছেন।’

 

পূর্ব ইন্দোনেশিয়ায় ফ্লোরেস দ্বীপের ঠিক উত্তরে ছিল অগভীর এই ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল।

 

রুতেং থেকে প্রায় ২০০ কিলোমিটার পূর্বে নাজেকেও ছিল সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা।

 

কর্তৃপক্ষ প্রাথমিকভাবে সুনামির সতর্কতা জারি করার পর ফ্লোরেসের প্রায় ২ হাজার বাসিন্দা নিরাপদ স্থানে চলে যান। পরে সতর্কতা প্রত্যাহার করা হয়।

 

ভবনগুলো ধসে পড়ার আশঙ্কায় কয়েক ডজন পরাঘাতের মধ্যে অনেকেই সারা রাত বাইরে অবস্থান করেন।

‘সবকিছু চারদিকে পড়ে যাচ্ছিল’

শনিবার রুতেং হাসপাতালের বাইরে স্থাপিত তাঁবুতে কয়েক ডজন রোগীকে সরিয়ে নেওয়া হয়। তাদের অনেকের সঙ্গে স্বজনরাও ছিলেন।

 

টনসিয়ানুস সামবাংয়ের মা মস্তিষ্কের একটি রক্তনালি ফেটে যাওয়ার কারণে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। ভূমিকম্পের সময় তিনি মায়ের কাছে ছিলেন।

 

৩১ বছর বয়সী এই নরসুন্দর এএফপিকে বলেন, ‘আমরা সবাই আতঙ্কিত হয়ে পড়ি। কেউ কেউ জানালা দিয়ে লাফ দিয়ে বের হন, আবার কেউ বাইরে দৌড়ে যান।’

 

তিনি বলেন, ‘সবকিছু চারদিকে পড়ে যাচ্ছিল। তাই তখন আমাদের প্রধান কাজ ছিল রোগীদের কীভাবে সরিয়ে ওই কক্ষ থেকে বাইরে নিয়ে আসা যায়। দেয়াল ধসে পড়ছিল, ধ্বংসাবশেষ পড়ছিল এবং জিনিসপত্র মেঝেতে ছড়িয়ে পড়ছিল।’

 

টনসিয়ানুস জানান, পরাঘাত নিয়ে তিনি ‘খুবই উদ্বিগ্ন্ন।’ বাইরে মাকে ও অন্য রোগীদের রাত কাটাতে হচ্ছেÑএ নিয়েও তিনি চিন্তিত।

 

তিনি দ্রুত চিকিৎসাসামগ্রী ও অন্যান্য সহায়তা পাঠানোর জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।

 

ভূমিকম্পে আহতদেরও হাসপাতালে আসার চাপ সামলাতে হচ্ছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন ইয়োকতাফিয়ানা সিনার।

 

ভূমিকম্পের সময় তার বাড়ি তার ওপর ধসে পড়ে।

 

৪০ বছর বয়সী এই রেস্তোরাঁকর্মী এএফপিকে বলেন, ‘মাথার ক্ষতটি ভালো হচ্ছে। কিন্তু পায়ে এখনও ব্যথা করছে। বাড়িটি আমার ওপর ধসে পড়ার সময় পা ভেঙে যায়।’

 

তিনি বলেন, ‘সকাল ৬টা বাজে। আমি গোসল করে কাজে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। তখনই ভূমিকম্প শুরু হয়।’

‘আমার নাতি বাইরে ছিল। তাই আমি দৌড়ে তাকে বাঁচাতে যাই। আমি আমার পেটের নিচে নাতিকে আগলে রাখি। বাড়ি ধসে পড়ার সময় আঘাতটা আমার ওপরই পড়ে,’ ইয়োকতাফিয়ানা বলেন।

 

জরুরি বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, জনপ্রিয় পর্যটন দ্বীপটিতে ভূমিকম্পে প্রায় ১৬০টি বাড়ি, কয়েক ডজন শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান এবং অন্যান্য সরকারি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

 

ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব রেড ক্রস অ্যান্ড রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটিজ জানিয়েছে, অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা প্রায় ২ হাজার মানুষের কাছে সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে।

 

সরকার ওই এলাকায় মোট ২৭৫ টন ওজনের ৫০ হাজার ত্রাণ প্যাকেট পাঠিয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রধান উরসুলা ফন ডার লিয়েনও ইউরোপীয় ইউনিয়নের কোপার্নিকাস ভূ-পর্যবেক্ষণ স্যাটেলাইটের মাধ্যমে সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছেন।