নিজস্ব প্রতিবেদক:
গতির অভাবে সিডিউল ঠিক রাখতে পারছে না বাংলাদেশ রেলওয়ের ট্রেনগুলো। বর্তমানে দেশে ১৪০ কিমি.র গতিসম্পন্ন ট্রেন চলাচল করছে গড়পড়তা ৬৫ কিলোমিটার গতিতে। অথচ শুধু রেলপথ বা ইঞ্জিন-কোচ সংস্কার হলেই ট্রেনে ফেরানো সম্ভব অন্তত একশ কিলোমিটার গতি। আর ট্রেনের গতি ফিরিয়ে আনতে পারলে একই সময়ে দ্বিগুণ সংখ্যক ট্রেন পরিচালনা সম্ভব হবে। বর্তমানে রেলের যাত্রীবাহী ট্রেন রয়েছে ২৮৫টি। তার মধ্যে ১২০টি আন্তঃনগর ট্রেন। আর মাত্র ৩টি বিরতিহীন ট্রেন। সঠিক সময়ে ট্রেন পৌঁছানোই ট্রেনের যাত্রী পরিষেবার মূল বিষয়। তাছাড়া যাত্রীসেবা ও সুরক্ষার অন্যান্য কার্যক্রমও রয়েছে। কিন্তু গত দুই যুগ ধরেই রেল থেকে উধাও হয়ে গেছে ওই মূল তিনটি বিষয়ই। ফলে নিয়মে পরিণত হয়েছে ট্রেনের ঘণ্টার পর ঘণ্টার ট্রেন দেরি করে চলা। বাংলাদেশ রেলওয়ে সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, দেশের রেলপথে কোনো ট্রেনই যথাযথ গতিতে চালানো সম্ভব হচ্ছে না। এদেশে ১২০ কিংবা ১৪০ কিলোমিটার গতি নিয়ে ট্রেন চালানো স্বপ্নের বিষয় এখনো। মূলত জরাজীর্ণ ইঞ্জিন, রুট এবং জনবল সংকট এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। বর্তমানে দিন দিন আরো প্রকট হচ্ছে রেলের ইঞ্জিন সংকট। এমন পরিস্থিতিতে বেশি গতির ট্রেন দুর্ঘটনায় পড়ার শঙ্কা থাকে। বর্তমানে জরাজীর্ণ বাংলাদেশ রেলওয়ের প্রায় ৮৫ শতাংশ রুট। যদিও প্রতি অর্থবছরই বরাদ্দ থাকে রেলপথের চলমান সংস্কার কার্যকর রাখতে। কিন্তু ওই বরাদ্দের বেশির ভাগই লুটপাট হয়ে যায়।
সূত্র জানায়, বর্তমানে বাংলাদেমের রেলপথে মাইলের পর মাইল যথাযথ পাথর নেই। আর পুরো রেলপথের অধিকাংশ স্থানে স্লিপার, ডগস্পাইক (হুক), ফিশপ্লেট খোলা রয়েছে। তাছাড়া বর্তমানে রেলওয়ে সেতুর মধ্যে প্রায় ৬৬ শতাংশই মেয়াদোত্তীর্ণ। বিশেষ করেআখাউড়া থেকে সিলেট রেলপথ খুবই জরাজীর্ণ। ফলে ওই পথে কখনো কখনো ট্রেন চলে ৫ থেকে ১০ শতাংশ গতিতে। তাছাড়া জয়দেবপুর-ময়মনসিংহ, ভৈরব-কিশোরগঞ্জ রেলপথও প্রায় তিন যুগ ধরে জরাজীর্ণ। ফলে প্রায়শই ওসব লাইনে দুর্ঘটনা ঘটছে। পাশাপাশি রেলপথে বৈধ কিংবা অবৈধ লেভেল ক্রসিংগুলো মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে রেলের ২৭০টি ইঞ্জিন রয়েছে। তবে ওসব ইঞ্জিনের ৭৭ শতাংশই মেয়াদোত্তীর্ণ। বিগত আওয়ামী সরকার প্রায় ১৬ বছরে রেলে সোয়া ১ লাখ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করলেও বাস্তবে তার বেশিরভাগই লোপাট হয়ে গেছে।
সূত্র আরো জানায়, ঢাকা থেকে কক্সবাজারের ৪৮০ কিলোমিটার দূরত্বের পথপৌঁছাতে ট্রেনের ৩ ঘণ্টা ৪০ মিনিট সময় লাগার কথা। আর ঢাকা-পঞ্চগড়ের ৬৩৯ কিলোমিটার দূরত্ব অতিক্রমে ৪ ঘণ্টা ৫০ মিনিট সময় লাগার কথা। কিন্তু ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে ট্রেন পৌঁছাতেই প্রায় ৯ ঘণ্টা সময় লাগছে আর পঞ্চগড়ে যেতে সময় লাগছে ১২ ঘণ্টা। ফলে ট্রেনগুলো গড়পড়তা (আন্তঃনগর, মেইল ও কমিউটার) ৫০ শতাংশ সময়ানুবর্তিতাও ধরে রাখতে পারছে না। সেক্ষেত্রে ট্রেনের গতি বাড়ানোর কার্যক্রম বাস্তবায়নে রেল সংশ্লিষ্ট কতিপয় কর্তকর্তা গড়িমসি করে। অভিযোগ রয়েছে, বিলম্বে ট্রেন পরিচালনার ক্ষেত্রে বাস মালিকদের সঙ্গে রেলওয়ে বিভাগ ও রেলপথ মন্ত্রণালয়ের কতিপয় অসাধু কর্মকর্তাদের যোগসাজশ রয়েছে। তাছাড়া মালবাহী ট্রেন পরিচালনায় চলছে চরম নৈরাজ্য। যদিও বিগত অর্থবছরেও বাংলাদেশ রেলওয়ে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা লোকসান গুনেছে।
এদিকে এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন) মো. নাজমুল হোসেন জানান, যাত্রীবাহী ট্রেনের গতি বাড়ানো ছাড়া বিকল্প নেই। গতি বাড়ানোর সঙ্গে আয় বাড়ার সম্পর্ক রয়েছে। গতি বাড়লে ঢাকা-যশোর ও ঢাকা-কক্সবাজার রেলপথে বেশি সংখ্যক ট্রেন পরিচালনা করা সম্ভব। কিন্তু ইঞ্জিন ও কোচ পাওয়া যাচ্ছে না।
অন্যদিকে এ প্রসঙ্গে রেলপথমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম জানান, ট্রেনের গতি বাড়ানোসহ যাত্রীদের সেবা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বেশ কয়েকটি প্রকল্প নেয়া হচ্ছে। জরাজীর্ণ লাইন থাকায় ট্রেনে গতি উঠানো সম্ভব হচ্ছে না। পূর্ণাঙ্গ গতির ট্রেন হলে যাত্রীদের মধ্যে আস্থা ও বিশ্বাস বাড়তো। তাতে আয়ের পাশাপাশি যাত্রীসেবা ও সুরক্ষাও বাড়তো। রেলের জন্য নতুন করে উচ্চগতির ইঞ্জিন ও কোচ কেনা হচ্ছে।










