নিজস্ব প্রতিবেদক:
দেশের মহাসড়কে দীর্ঘদিন ধরেই অনুমোদনহীন স্লিপার কোচ অবাধে চলাচল করছে। কিন্তু অনুমোদনহীন স্লিপার কোচ নিয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবর্তন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। সংস্থাটি রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অনুমোদনহীন স্লিপার কোচের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে শুরু করেছে। ওই লক্ষ্যে কোথাও গ্যারেজে জরিমানা, কোথাও বাস জব্দ ও ডাম্পিং, আবার কোথাও চলাচলরত কোচের বিরুদ্ধে মামলা ও অর্থদণ্ড করা হচ্ছে। চলতি আগস্ট মাসেই বিআরটিএ অনুমোদনহীন স্লিপার কোচ তৈরি, সাধারণ বাসের কাঠামো পরিবর্তন এবং অনিবন্ধিত গ্যারেজে যানবাহন মেরামতের বিরুদ্ধে অভিযান চালাচ্ছে। বিআরটিএ সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, বর্তমানে দেশের সড়কে চলাচলরত স্লিপার বাসগুলো অনুমোদনহীন। দেশের সড়ক-মহাসড়কে চলাচলকারী স্লিপার কোচের বৈধতার বিষয়টি উচ্চ আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে। এ বিষয়ে বিগত ২০২৫ সালে হাইকোর্টে রিট হয়। আদালত অবৈধ ওসব স্লিপার কোচের বিরুদ্ধে কী পদক্ষেপ নিয়েছে বিআরটিএকে তা জানাতে বলেছিল। সম্প্রতি ওই মামলার শুনানিতে বিআরটিএ আদালতকে জানিয়েছে, বর্তমানে দেশের সড়কে ৮২৯টি অবৈধ স্লিপার বাস চলাচল করছে। একই সঙ্গে সংস্থাটি তাদের সামপ্রতিক অভিযানের বিষয়েও আদালতকে অবহিত করে। সংস্থাটি স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, তারা কোনো স্লিপার বাস চলাচলের অনুমতি দেয়নি। বরং তারই ধারাবাহিকতায়ই এখন বিআরটিএ বিভিন্ন এলাকায় স্লিপার কোচের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে এবং অভিযান পরিচালনা করছে।
সূত্র জানায়, অতিসম্প্রতি বিআরটিএ’র ভ্রামমাণ আদালত রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকায় অভিযান চালায়। ওই অভিযানে অনুমোদনহীন স্লিপার কোচের কাঠামো তৈরি, বাসের কাঠামো পরিবর্তন এবং অবৈধ গ্যারেজ পরিচালনার অভিযোগে ৫টি প্রতিষ্ঠানকে মোট আড়াই লাখ টাকা জরিমানা করে। তার আগে রাজধানীর গাবতলীর আমিনবাজার ও মানিকনগর এলাকার বিভিন্ন বডি বিল্ডিং গ্যারেজে বিআরটিএ অভিযান চালায়। ওই অভিযানে প্রায় ১০ থেকে ১২টি গ্যারেজ পরিদর্শন করা হয়। তার মধ্যে অনুমোদনহীন স্লিপার বাস মেরামত এবং প্রয়োজনীয় নিবন্ধন না থাকায় ৪টি গ্যারেজকে ২ লাখ ৩০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। আর অভিযানে মেরামতের সময় ৮টি গাড়ি ডাম্পিংয়ে পাঠানো হয় এবং চলাচলের অনুপযোগী দুটি স্লিপার বাস জব্দ করা হয়। ওই সময় সিলগালা করা হয় একটি বডি গ্যারেজ। তাছাড়া স্লিপার কোচের বিরুদ্ধে রাজধানীর বাইরেও অভিযান চালাচ্ছে বিআরটিএ। সিলেটেও জেলা প্রশাসন ও বিআরটিএ যৌথ অভিযান চালিয়েছে। ওই অভিযানে অনুমোদন ছাড়া স্লিপার বাস পরিচালনা এবং বিভিন্ন অনিয়মের জন্য ৫টি প্রতিষ্ঠানকে ১৫ হাজার টাকা করে মোট ৭৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। তাছাড়া ওই অভিযানে দূরপাল্লার বাসের বিরুদ্ধেও মামলা করে আদায় করা হয় মোট এক লাখ টাকা জরিমানা।
সূত্র আরো জানায়, কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমতি ছাড়া কোনো মোটরযানের দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, উচ্চতা, সিট বিন্যাস কিংবা মূল অবয়ব পরিবর্তন করা সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮ অনুযায়ী দণ্ডনীয় অপরাধ। এ অবস্থায় বিআরটিএ শুধু অনুমোদনহীন স্লিপার কোচ চলাচলের মধ্যে অভিযান সীমাবদ্ধ রাখছে না। বরং সাধারণ বাসের কাঠামো পরিবর্তন করে স্লিপার বাসে রূপান্তর, অনিবন্ধিত গ্যারেজে ওসব যানবাহন তৈরি বা মেরামত এবং প্রয়োজনীয় কারিগরি অনুমোদন ছাড়াই সড়কে পরিচালনার অভিযোগও খতিয়ে দেখছে। কারণ গ্যারেজ, ওয়ার্কশপ ও সড়কে চলাচলরত বাস- সবপর্যায়েই অনিয়মের অভিযোগ মিলছে।
এদিকে সড়ক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বিআরটিএর অভিযান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের মতে, গ্যারেজে অভিযান চালিয়ে জরিমানা করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। কারণ গ্যারেজে তৈরি হওয়া স্লিপার কোচগুলো শেষ পর্যন্ত সড়ক ও মহাসড়কেই চলাচল করছে। ফলে উৎপাদনস্থল ও মেরামতকেন্দ্রের পাশাপাশি সড়কে চলাচলরত অনুমোদনহীন বাসের বিরুদ্ধেও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
অন্যদিকে এ বিষয়ে রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান জানান, শুধু গ্যারেজে অভিযান চালিয়ে অনুমোদনহীন স্লিপার কোচ নির্মাণ বন্ধ করা সম্ভব নয়। কারণ ওসব কোচ গ্যারেজে পড়ে থাকে না। বরং তৈরি হওয়ার পরই মহাসড়কে চলাচল করে। সেজন্য গ্যারেজে নজরদারির পাশাপাশি মহাসড়কেও কঠোর নজরদারি করতে হবে। সেক্ষেত্রে বিআরটিএ, পুলিশ, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন (বিআরটিসি), ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ), সিটি করপোরেশনসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় জরুরি।











