অনলাইন ডেস্ক:
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউসে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে স্বাগত জানিয়েছে। দুই দেশের সম্পর্কের টানাপোড়েনের মধ্যেও জমকালো আয়োজনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই বৈঠকে বাণিজ্য ইস্যুই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তবে বড় ধরনের কোনো অগ্রগতির প্রত্যাশা কম বলে জানিয়েছে রয়টার্স।
চলতি বছরে দুই নেতার এটি দ্বিতীয় বৈঠক। এক দশকেরও বেশি সময় পর শি জিনপিংয়ের এটি প্রথম ওয়াশিংটন সফর। এর আগে বুধবার সন্ধ্যায় যুক্তরাষ্ট্রের জয়েন্ট বেস অ্যান্ড্রুজে শিকে স্বাগত জানান ট্রাম্প। রয়টার্স জানিয়েছে, ১১ বছর পর কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট প্রথমবারের মতো সেখানে বিদেশি কোনো নেতাকে স্বাগত জানালেন। এর আগে ২০১৫ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা পোপ ফ্রান্সিসকে সেখানে স্বাগত জানিয়েছিলেন।
চীনের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা সিনহুয়ায় প্রকাশিত এক বিবৃতিতে শি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আরও স্থিতিশীল সম্পর্কের প্রত্যাশা প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেন, বেইজিং ও ওয়াশিংটনের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, অংশীদার হওয়া উচিত। শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের ঐতিহাসিক বাস্তবতাও বদলায়নি বলে মন্তব্য করেন তিনি।
রয়টার্স বলছে, ট্রাম্পের কাছে এই সফর শুধু কূটনৈতিক আলোচনার বিষয় নয়, জাতীয় মর্যাদা প্রদর্শনেরও সুযোগ। মে মাসে চীনে ট্রাম্প যে জমকালো অভ্যর্থনা পেয়েছিলেন, ওয়াশিংটনে শিকে একই ধরনের আয়োজনের মাধ্যমে স্বাগত জানিয়ে তার প্রতিদান দিতে চান তিনি। হোয়াইট হাউসের সাউথ লন, স্টেট ফ্লোর ও রোজ গার্ডেনজুড়ে শির জন্য বিশেষ আয়োজন রাখা হয়েছে।
তবে বৈঠক থেকে বড় কোনো চুক্তি বা নাটকীয় অগ্রগতির প্রত্যাশা করা হচ্ছে না। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আলোচনায় সবচেয়ে বাস্তবসম্মত ফল হতে পারে নভেম্বরে শেষ হতে যাওয়া বাণিজ্য যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানো এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই থেকে তৈরি ঝুঁকি মোকাবিলায় কাজ করার বিষয়ে সমঝোতা।
মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বুধবার ফক্স নিউজকে জানান, চীনের উপপ্রধানমন্ত্রী হে লিফেংয়ের সঙ্গে আলোচনায় তারা বাণিজ্যযুদ্ধ সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা একটি চুক্তির মেয়াদ ১০ জানুয়ারি পর্যন্ত বাড়ানোর বিষয়ে একমত হয়েছেন। ওই বাণিজ্যযুদ্ধের সময় দুই দেশের পারস্পরিক শুল্ক ১০০ শতাংশেরও বেশি উঠেছিল।
আলোচনায় কিছু শুল্ক কমানো, মাদক পাচার মোকাবিলা এবং দুই দেশের সামরিক বাহিনীর মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোর মতো বিষয়েও সমঝোতা হতে পারে বলে পরিকল্পনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা রয়টার্সকে জানিয়েছেন। চীনে আটক থাকা মার্কিন নাগরিক ও অন্যদের মুক্তির বিষয়টিও ট্রাম্প তুলতে পারেন বলে জানা গেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কার্ট ক্যাম্পবেল মনে করেন, এই বৈঠক মূলত বড় ধরনের আলোচনা বা সমঝোতার চেয়ে দুই নেতার শক্ত অবস্থান প্রদর্শনের একটি সুযোগ। তিনি দুই নেতার মুখোমুখি অবস্থানকে প্রাচীনকালের শক্তিশালী দুই ব্যক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতার সঙ্গে তুলনা করেছেন।
স্থিতিশীল সম্পর্ক চায় দুই পক্ষ
রয়টার্সের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, চীনের সঙ্গে সম্পর্ক স্থিতিশীল রাখার ক্ষেত্রে দুই নেতারই স্বার্থ রয়েছে। চীন সাম্প্রতিক সময়ে বাণিজ্যে অগ্রগতি করেছে এবং বিরল খনিজের সরবরাহের ওপর নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে, যা দেশটির জন্য গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সুবিধা তৈরি করেছে।
অন্যদিকে ট্রাম্প ইরান যুদ্ধ নিয়ে চাপের মধ্যে রয়েছেন এবং চীন অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে। ফলে দুই দেশের সম্পর্ক স্থিতিশীল রাখার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। তবে তাইওয়ান, প্রযুক্তি রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে মতবিরোধ দুই দেশের সম্পর্ককে আবারও উত্তপ্ত করে তুলতে পারে।
এর মধ্যে তাইওয়ান ইস্যুই সবচেয়ে স্পর্শকাতর। চীন স্বশাসিত দ্বীপ তাইওয়ানকে নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ বলে দাবি করে। যুক্তরাষ্ট্রের এশীয় মিত্রদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে, অর্থনৈতিক সুবিধা আদায়ের জন্য ট্রাম্প তাইওয়ানের প্রতি ওয়াশিংটনের সমর্থন কিছুটা কমিয়ে দিতে পারেন।
রয়টার্সকে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শি ট্রাম্পের কাছে তাইওয়ানের জন্য মার্কিন অস্ত্র বিক্রি বন্ধের দাবি জানাতে পারেন। শুক্রবার দুই নেতার যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল আর্কাইভস পরিদর্শনের সময়ও বিষয়টি উঠতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। এর বিনিময়ে ইরানের ওপর চাপ প্রয়োগে সহায়তার প্রস্তাব দিতে পারে চীন বলেও সূত্রগুলো জানিয়েছে।
মে মাসের বৈঠকের পর ট্রাম্প প্রায় ১৪ বিলিয়ন ডলারের একটি অস্ত্র প্যাকেজ আটকে রাখার কথা জানিয়েছিলেন। তিনি সেটিকে চীনের সঙ্গে আলোচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ দর-কষাকষির হাতিয়ার হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন।
ইরান যুদ্ধ নিয়েও ট্রাম্প ও শির আলোচনা হতে পারে। তবে সংঘাতের কারণে জ্বালানি সরবরাহ ও বাণিজ্যে বড় ধরনের প্রভাব পড়লেও ইরানের ওপর মার্কিন দাবির বিষয়ে চাপ প্রয়োগে চীনের আগ্রহের খুব বেশি লক্ষণ দেখা যায়নি বলে জানিয়েছে রয়টার্স।
বাণিজ্যে সমঝোতার সম্ভাবনা
দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য নিয়ে সমঝোতার সম্ভাবনাই তুলনামূলকভাবে বেশি। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে ট্রাম্প বাণিজ্য ক্ষেত্রে সাফল্য দেখাতে চাইছেন। মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার চলতি মাসে জানিয়েছিলেন, কৃষি ও অশুল্ক বাণিজ্য বাধা নিয়ে দুই দেশ কিছু ঘোষণা দিতে পারে।
গ্রিয়ার সোমবার বলেন, চীন ২০০টি বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে অগ্রগতি করছে। তবে নতুন কোনো অতিরিক্ত উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি কাছাকাছি রয়েছে এমন কোনো ইঙ্গিত তিনি দেননি।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাও দুই দেশের সহযোগিতার একটি সম্ভাব্য ক্ষেত্র হতে পারে। জাতীয় নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা ও সামরিক সক্ষমতার ওপর এআইয়ের প্রভাবের কারণে ওয়াশিংটন ও বেইজিং উভয়েই এর অপব্যবহার নিয়ে উদ্বিগ্ন।
স্কট বেসেন্ট সপ্তাহান্তে হে লিফেংয়ের সঙ্গে এআই নিয়ে আলোচনা করেছেন। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানান, বিপজ্জনক পরিস্থিতি এড়াতে শীতল যুদ্ধের সময়কার হটলাইনের মতো কোনো যোগাযোগব্যবস্থা তৈরির বিষয়ে প্রাথমিক চিন্তাভাবনা চলছে। এমন কোনো ঘটনা যাতে অর্থনীতি, সমাজ বা শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সংঘাত সৃষ্টি করতে না পারে, সে বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, এআই নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের তীব্র প্রতিযোগিতার কারণে এই খাতে প্রতীকী সমঝোতার বাইরে বড় কোনো সহযোগিতার সুযোগ সীমিত থাকতে পারে।
বৃহস্পতিবারের রাষ্ট্রীয় নৈশভোজে অ্যাপলের প্রধান নির্বাহী টিম কুক, অ্যামাজনের জেফ বেজোস, অ্যালফাবেটের সুন্দর পিচাই, ওপেনএআইয়ের স্যাম অল্টম্যান, টেসলার ইলন মাস্ক এবং এনভিডিয়ার জেনসেন হুয়াংয়ের মতো প্রযুক্তি ও ব্যবসা খাতের শীর্ষ ব্যক্তিদের উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে।
তবে রয়টার্সকে পরিকল্পনার বিষয়ে অবহিত ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, চীন যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ শিথিল করার যে দাবি করে আসছে, সে বিষয়ে ট্রাম্প কঠোর অবস্থান ধরে রাখতে পারেন।











