ভারতে ধেয়ে আসছে প্রলয়ঙ্করী ‘অর্ণব’, স্কুল বন্ধ ও কর্মকর্তাদের ছুটি বাতিল

অনলাইন ডেস্ক:

অন্ধ্রপ্রদেশ উপকূলে আগামী ২৮ অক্টোবর আঘাত হানার আশঙ্কা থাকা অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড়ের সম্ভাব্য হুমকি মোকাবিলায় সর্বাত্মক প্রস্তুতি জোরদার করেছে ওডিশা সরকার। একইসঙ্গে জরুরি উদ্ধারকারি দলগুলোকে সম্পূর্ণ সতর্ক রাখা হয়েছে এবং সব স্তরের কর্মকর্তাদের নিজ নিজ সদর দফতরে থাকার কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

আসন্ন এই প্রাকৃতিক দুর্যোগের পরিস্থিতির কারণে জেলা কালেক্টর, জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এবং গুরুত্বপূর্ণ দফতরে নিয়োজিত অন্য সব কর্মকর্তার ছুটি তাৎক্ষণিকভাবে বাতিল করা হয়েছে। এর পাশাপাশি সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে এলাকার সব স্কুল-কলেজও বন্ধ রাখা হয়েছে। ভারতীয় আবহাওয়া অধিদফতর (আইএমডি) পূর্বাভাস দিয়েছে যে, বর্তমানে বঙ্গোপসাগরে নিম্নচাপ হিসেবে অবস্থান করা এই ঝড়টি আরও ঘনীভূত হয়ে অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নিতে পারে এবং পরবর্তীতে বাপাটলা ও বিশাখাপত্তনমের মাঝামাঝি কোনো এক স্থান দিয়ে উপকূল অতিক্রম করতে পারে। এই সময়ে বাতাসের গতিবেগ ঘণ্টায় ১১৫ থেকে ১২৫ কিলোমিটার পর্যন্ত হতে পারে, যা বৃদ্ধি পেয়ে দমকা অথবা ঝোড়ো হাওয়ার আকারে ঘণ্টায় ১৪০ কিলোমিটার পর্যন্ত উঠতে পারে।

আবহাওয়ার সর্বশেষ পূর্বাভাস অনুযায়ী, পুদুচেরি, কারাইকাল এবং তামিলনাড়ুর সংলগ্ন জেলাগুলোতে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে। ওডিশার গোপালপুর থেকে পূর্বাভাসিত আঘাত হানার এলাকাটি প্রায় ৩০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত হওয়া সত্ত্বেও, দক্ষিণ ও উপকূলীয় জেলাগুলোতে ভারী বৃষ্টি ও প্রবল বাতাসসহ যেকোনো সম্ভাব্য প্রভাব সাহসিকতার সঙ্গে মোকাবিলা করতে এখন থেকেই সার্বিক প্রস্তুতি নিচ্ছে ওডিশা সরকার।

ঘূর্ণিঝড় পরিস্থিতি বিবেচনায় ওডিশার মুখ্যমন্ত্রী মোহন চরণ মাঝি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জনসুরক্ষা নিশ্চিত করা, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে লোকজনকে দ্রুত সরিয়ে নেওয়া এবং জরুরি সাড়াদান কার্যক্রমকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার কড়া নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি যেকোনো মূল্যে এই দুর্যোগে শূন্য হতাহত নিশ্চিত করার সরকারি লক্ষ্যের কথা আবারও দৃঢ়ভাবে পুনর্ব্যক্ত করেন।

ঘূর্ণিঝড়টি আরও ঘনিয়ে আসায় ওডিশা সরকার সব জেলা কালেক্টর, জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ দফতরে নিয়োজিত সব কর্মকর্তার ছুটি অবিলম্বে বাতিল ঘোষণা করেছে। রাজ্যের সাধারণ প্রশাসন বিভাগ থেকে জারিকৃত সুনির্দিষ্ট বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, প্রশাসনিক প্রস্তুতি শতভাগ নিশ্চিত করতে সব কর্মকর্তাকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে নিজ নিজ সদর দফতরে ফিরে যেতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

মুখ্যমন্ত্রী মোহন চরণ মাঝি আরও জানান যে, ওডিশার দক্ষিণ ও উপকূলীয় জেলাগুলোয় ঘণ্টায় ৭০ থেকে ৯০ কিলোমিটার বেগের তীব্র দমকা হাওয়াসহ ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টি হতে পারে। এর ফলে গঞ্জাম, গজপতি, রায়াগড়া, কোরাপুট ও মালকানগিরি জেলা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত বা প্রভাবিত হবে বলে জোরালো আশঙ্কা করা হচ্ছে, এমনকি অন্য উপকূলীয় এলাকাগুলোতেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃষ্টিপাত হতে পারে।

পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবন করে মুখ্যমন্ত্রী গঞ্জাম, গজপতি, রায়াগড়া, কোরাপুট ও মালকানগিরি জেলার অন্তর্গত সমস্ত স্কুল, কলেজ ও অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্র আগামী ২৮ ও ২৯ অক্টোবর বন্ধ রাখার জন্য সুনির্দিষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন। পরবর্তীতে পরিস্থিতি যেভাবে মোড় নেবে, তার বাস্তবভিত্তিক ওপর নির্ভর করে অন্যান্য জেলার কালেক্টররাও নিজ নিজ এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার বিষয়ে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন। এছাড়া চরম ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের দ্রুত নিরাপদ ও আশ্রয়কেন্দ্রে সরিয়ে নিতে কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মাঝি। বিশেষ করে এলাকার বয়োবৃদ্ধ, অসুস্থ রোগী ও অন্তঃসত্ত্বা নারীদের প্রতি সর্বোচ্চ যত্ন ও বিশেষ মনোযোগ দিতে বলা হয়েছে এবং প্রয়োজনে দ্রুত তাঁদের নিরাপদ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে স্থানান্তরিত করতে বলা হয়েছে।

ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টির এই প্রাথমিক প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন এলাকাগুলোতে এর প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। এর অংশ হিসেবে পুদুচেরিতে বর্তমানে অবিরাম বৃষ্টিপাত অব্যাহত রয়েছে। অন্যদিকে, ভারতের তামিলনাড়ুর নয়টি প্রধান বন্দরে ঘূর্ণিঝড়ের সতর্কসংকেত জারি করা হয়েছে এবং যেকোনো ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে জেলেদের পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত সাগরে যেতে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে। এমনকি বর্তমানে গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে থাকা জেলেদেরও দ্রুত নিরাপদ উপকূলে ফিরে আসার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

উল্লেখ্য, গত ২৪ অক্টোবর বঙ্গোপসাগরে তৈরি হওয়া একটি সুস্পষ্ট নিম্নচাপ অঞ্চল থেকে এই গভীর নিম্নচাপটি সৃষ্টি হয়। এটি পরবর্তীতে ঘূর্ণিঝড়ে পুরোপুরি রূপ নিলে এর নাম হবে ‘অর্ণব’। এই চমৎকার নামটি বাংলাদেশের প্রস্তাব অনুযায়ী নির্ধারিত হয়েছে, যার সহজ বাংলা অর্থ হলো ‘সমুদ্র’।