অনলাইন ডেস্ক:
ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সরকারকে ক্ষমতা থেকে হটাতে বিরোধী জোট ‘চেঞ্জ ব্লক’-এর সঙ্গে হাত মেলানোর জোরালো ইঙ্গিত দিয়েছেন আরব ইসরাইলি নেতা আহমাদ তিবি। তিনি দেশটির পার্লামেন্ট নেসেটের সদস্য এবং আরব সদস্যদের নিয়ে গঠিত জয়েন্ট লিস্ট পার্লামেন্টারি ব্লকের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
তুরস্কের সংবাদ সংস্থার প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, নেতানিয়াহুর সরকারকে নির্বাচনে পরাজিত করে নতুন সরকার গঠনের লক্ষ্যেই বিরোধী দলগুলো এই ‘চেঞ্জ ব্লক’ গঠন করেছে। এই জোরালো জোটে রয়েছে সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকটের ইয়াশার পার্টি, ইয়ার লাপিদের ইয়েশ আতিদ এবং নাফতালি বেনেটের বেয়াখাদসহ বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দল।
এক বিবৃতিতে আরব নেতা আহমাদ তিবি স্পষ্ট করে বলেছেন যে, আরব ভোটারদের ব্যাপক ও স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ জয়েন্ট লিস্টের জন্য একটি ঐতিহাসিক অর্জন। তার সুনির্দিষ্ট ভাষায়, আরব দলগুলোকে সম্পূর্ণ বাদ দিয়ে ইসরাইলে কোনো রাজনৈতিক পরিবর্তন আনা কখনোই সম্ভব নয়। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু এবং কট্টর ডানপন্থী নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভিরের সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতেই তারা বিরোধীদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতে চান। এই রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার একেবারে শুরুতেই নেসেটের স্পিকার আমির ওহানাকে অপসারণ করার কথাও জোরালোভাবে উল্লেখ করেছেন তিনি।
ইসরাইলের স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের পূর্বাভাস অনুযায়ী, প্রায় ৯০ শতাংশ ভোট গণনার পর প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর জোট নেসেটের ১২০টি আসনের মধ্যে মাত্র ৫৩টি আসন পেতে পারে। যা সরকার গঠনের জন্য সংবিধান অনুযায়ী বাধ্যতামূলক প্রয়োজনীয় ৬১ আসনের চেয়ে বেশ কম। অন্যদিকে, গাদি আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন শক্তিশালী বিরোধী জোট ৪৮টি আসন এবং প্রধানত আরবদের নিয়ে গঠিত রাজনৈতিক দলগুলো মোট ১৯টি আসন পেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর মধ্যে জয়েন্ট লিস্ট ১২টি এবং ইউনাইটেড আরব লিস্ট সাতটি আসন পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এই নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক ও চূড়ান্ত ফল প্রকাশের নির্ধারিত তারিখ আগামী ৪ নভেম্বর।
ইসরাইলের আরব নাগরিকদের বিশাল এই অংশটি মূলত ১৯৪৮ সালে ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সেই সংকটময় সময়ে বাস্তুচ্যুত না হয়ে নিজ ভূমিতে থেকে যাওয়া ফিলিস্তিনিদেরই সরাসরি বংশধর। দীর্ঘকাল ধরে তাদের একটি বড় অংশ রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে চরম বৈষম্য ও সহিংসতার যন্ত্রণাদায়ক অভিজ্ঞতার কথা বারবার তুলে ধরে আসছেন। এসব নানা জটিল কারণে অতীতের অনেক জাতীয় নির্বাচনেই আরব ভোটাররা আগ্রহ হারিয়ে ভোটদান থেকে বিরত থাকতেন।
তবে এবারের এই সাম্প্রতিক নির্বাচনে রেকর্ডসংখ্যক আরব ভোটারের অত্যন্ত স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ আরব দলগুলোর সামগ্রিক সাফল্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। গাজা উপত্যকা ও পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের প্রতি নেতানিয়াহু সরকারের কঠোর সামরিক নীতি এবং ইসরাইলের অভ্যন্তরীণ ভূখণ্ডে আরব নাগরিকদের প্রতি অব্যাহত বৈষম্যের নানা অভিযোগ তাদের মনের গভীর ক্ষোভ ও অসন্তোষ বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল।
বিরোধী জোটের অন্যতম প্রধান ও হেভিওয়েট নেতা গাদি আইজেনকট ইসরাইলের একজন সাবেক সেনাপ্রধান। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ফিলিস্তিনের হামাসের নজিরবিহীন হামলার পর তিনি দেশের স্বার্থে নেতানিয়াহুর জরুরি যুদ্ধকালীন মন্ত্রিসভায় যোগ দিয়েছিলেন। তবে দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য সরকারের কাছে কোনো স্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট কৌশল বা রূপরেখা না থাকার জোরালো অভিযোগ তুলে তিনি ২০২৪ সালের জুনে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করে বেরিয়ে আসেন।
চলমান গাজা যুদ্ধে আইজেনকটের ২৫ বছর বয়সি তরুণ ছেলে গাল ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে সম্মুখযুদ্ধে মর্মান্তিকভাবে নিহত হন। এছাড়া তার পরিবারের দুই ভাতিজাও এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতে প্রাণ হারিয়েছেন। পরিবারের সদস্যদের এই অপরিসীম ও মর্মান্তিক ক্ষতি তার সক্রিয় ও সরাসরি রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় অনুঘটক ও ভূমিকা পালন করেছে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন।
বর্তমান পরিস্থিতিতে নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক জোট প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা থেকে অনেকটাই পিছিয়ে থাকায়, আরব দলগুলোর প্রাপ্ত নিশ্চিত আসনগুলো এবং বিরোধী জোটের সঙ্গে তাদের সম্ভাব্য এই রাজনৈতিক সহযোগিতা ইসরাইলের আগামীর সরকার গঠনের জটিল হিসাব-নিকাশকে পুরোপুরি বদলে দিয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক ফ্যাক্টরে পরিণত হয়েছে।











