নিজস্ব প্রতিবেদক:
মজুরি বৃদ্ধিসহ পাঁচ দফা দাবিতে টানা তৃতীয় দিনের মতো আন্দোলনে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা। বুধবার সকালে কয়েকটি কারখানার শ্রমিকেরা সড়কে নেমে বিক্ষোভ ও অবরোধের চেষ্টা চালালে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে তাদের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ এ সময় টিয়ার শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে এবং ঘটনাস্থল থেকে পাঁচজনকে আটক করে।
বুধবার (৪ নভেম্বর) সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের পাশে ফতুল্লার কুতুবআইল কাঠেরপুল এলাকায় মূলত এই সংঘর্ষ ও উত্তেজনার সূত্রপাত হয়।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে পাওয়া তথ্যে জানা যায়, বুধবার সকালে ফতুল্লার শিবু মার্কেট ও কাঠেরপুলসহ আশপাশের বিভিন্ন শিল্প এলাকার শ্রমিকেরা প্রতিদিনের মতো কারখানায় কাজে যোগ দিতে আসেন। কিন্তু এর কিছুক্ষণ পরেই কয়েকটি কারখানার শ্রমিকেরা কাজ বন্ধ করে হঠাৎ সড়কে নেমে এসে তীব্র বিক্ষোভ শুরু করেন। তারা প্রধান সড়ক অবরোধের জোরালো চেষ্টা চালালে পুরো শিল্পাঞ্চলজুড়ে চরম উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
পরিস্থিতি একপর্যায়ে আরও জটিল হয়ে ওঠে যখন কাঠেরপুল এলাকার মেট্রো গার্মেন্টসের শ্রমিকেরা সড়কে শক্তভাবে অবস্থান নেওয়ার চেষ্টা করেন এবং পুলিশ তাতে বাধা দেয়। এ সময় উভয় পক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া শুরু হয়। তীব্র উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণে পুলিশ বেশ কয়েকটি টিয়ার শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে, যার ফলে শ্রমিকেরা চারদিকে ছত্রভঙ্গ হয়ে পালিয়ে যান। পরবর্তীতে পুলিশ ধাওয়া চালিয়ে ঘটনাস্থল থেকে বেশ কয়েকজনকে আটক করে নিয়ে যায়।
এই পুরো ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী স্থানীয় দোকানি জামাল মিয়া জানান, বিভিন্ন কারখানার শ্রমিকেরা সেখানে জড়ো হওয়ার পরপরই স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীদের সঙ্গে তাদের তীব্র বাগ্বিতণ্ডা শুরু হয়। পরবর্তীতে পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করে। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় এবং শ্রমিক ও পুলিশের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া শুরু হয়ে যায়।
অন্যদিকে, আন্দোলনরত বিক্ষুব্ধ শ্রমিকদের পক্ষ থেকে পরিষ্কার অভিযোগ করা হয়েছে যে, তারা সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণভাবে তাদের ন্যায্য মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছিলেন। ঠিক সেই মুহূর্তে বিএনপির স্থানীয় নেতারা সেখানে এসে তাদের ওপর চড়াও হন এবং মারধর করেন। শ্রমিকদের অভিযোগ, নেতাদের সেই হামলার পরই পুলিশ তাদের ওপর জোরেশোরে অভিযান চালায়।
ঘটনা প্রসঙ্গে নারায়ণগঞ্জের এএসপি তারেক আল মেহেদী জানান, সার্বিক পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে ও নিজেদের আয়ত্তে রাখতে পুলিশ শুরু থেকেই সতর্ক অবস্থানে দায়িত্ব পালন করছিল। তিনি আরও নিশ্চিত করেন যে, এই সংঘর্ষ ও বিশৃঙ্খলার ঘটনায় এখন পর্যন্ত মোট পাঁচজনকে আটক করা হয়েছে।
এর আগে গত সোমবার ও মঙ্গলবারেও ঠিক একই দাবিতে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোড অবরোধ করে তীব্র বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছিলেন বিভিন্ন পোশাক কারখানার শ্রমিকেরা। বিশেষ করে মঙ্গলবারের টানা আন্দোলনে পুলিশের সঙ্গে শ্রমিকদের ব্যাপক ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছিল। সেই সংঘর্ষে প্রায় ১০ জন পুলিশ সদস্য আহত হওয়ার পাশাপাশি চারজন শ্রমিককে আটক করা হয়েছিল।
আন্দোলনরত শ্রমিকদের পক্ষ থেকে মোট পাঁচ দফা জোরালো দাবি পেশ করা হয়েছে। তাদের প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ করা, দেশের সব পোশাক কারখানায় অবিলম্বে রেশনিং ব্যবস্থা চালু করা, শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়নের অধিকার যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা, শ্রমিক আমজাদ হোসেন কামালসহ সকল নিহত শ্রমিকদের হত্যার সঠিক বিচার নিশ্চিত করা এবং কোনো ধরনের কারণ ছাড়াই শ্রমিক ছাঁটাই সম্পূর্ণ বন্ধ করে শ্রম আইনের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন করা।











