নিজস্ব প্রতিবেদক:
বেতন বৃদ্ধির দাবিতে বৃহস্পতিবার সকালে ঢাকার আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলে ফের অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়েছে। এদিন সকালের শিফটে কারখানায় হাজিরা নিশ্চিত করার পরপরই শ্রমিকরা কর্মবিরতি দিয়ে রাস্তায় নেমে আসেন। তারা বিভিন্ন কারখানায় গিয়ে অন্য শ্রমিকদেরও কাজে যোগ না দেওয়ার জন্য বাধ্য করেন। এই পরিস্থিতির মুখে শতাধিক পোশাক কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ। পরে আব্দুল্লাহপুর-বাইপাইল সড়কে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ শ্রমিকদের ধাওয়া দিয়ে সরিয়ে দেয়।
বৃহস্পতিবার সকাল ৮টার দিকে শ্রমিকরা নিয়ম অনুযায়ী নিজ নিজ কারখানায় প্রবেশ করেন এবং কার্ড পাঞ্চ করে হাজিরা নিশ্চিত করেন। এরপরই তারা কারখানা থেকে বেরিয়ে এসে পাশের কারখানাগুলোর প্রধান ফটকের সামনে জড়ো হতে থাকেন। তারা অন্য শ্রমিকদেরও বেরিয়ে আসতে বাধ্য করেন। এক পর্যায়ে আশপাশের কারখানাগুলো সাধারণ ছুটি ঘোষণা করলে শতাধিক কারখানার শ্রমিক রাস্তায় নেমে আসেন।
বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা আব্দুল্লাহপুর-বাইপাইল সড়কে অবস্থান নিলে যান চলাচল পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। পুলিশ কয়েকটি পয়েন্ট থেকে ধাওয়া দিয়ে তাদের সড়ক থেকে সরিয়ে দিলে শ্রমিকরা বিভিন্ন শাখা সড়কে গিয়ে অবস্থান নেন।
এর আগের দিন সাভারে ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ এবং পুলিশভ্যান ও মোটরসাইকেলে অগ্নিসংযোগের ঘটনার পর বৃহস্পতিবার সকাল থেকে সাভার শিল্পাঞ্চলের পরিস্থিতি অনেকটাই শান্ত ছিল।
শ্রমিকদের দাবি, মজুরি বোর্ড কমিশন আগামী ডিসেম্বরে বেতন বাড়ানোর ঘোষণা দিলেও সুনির্দিষ্টভাবে কত টাকা বেতন বাড়বে, তা জানানো হয়নি। এই অনিশ্চয়তার কারণেই তারা রাজপথে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন বলে জানিয়েছেন।
এদিকে, যেকোনো ধরনের নাশকতা ও অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে পুরো শিল্পাঞ্চলজুড়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। পুলিশের পাশাপাশি বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে এবং গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে পুলিশের সাঁজোয়া যান প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
শিল্প পুলিশ-১ এর পুলিশ সুপার মোমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া জানান, ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশ ঢাকার আওতাধীন সাভারের আশুলিয়া এলাকার সার্বিক পরিস্থিতি এখন ভালো রয়েছে।
তিনি জানান, তাদের আওতাধীন মোট এক হাজার ৮৬৩টি কারখানার মধ্যে আজকের দিনের জন্য ৭০টি কারখানা সাময়িকভাবে বন্ধ রয়েছে এবং বাকি কারখানাগুলোতে কার্যক্রম স্বাভাবিকভাবে চলছে।
তিনি আরও বলেন, আজ জামগড়া এলাকায় কয়েকটি কারখানায় ছুটির পর কিছু দুষ্কৃতকারী ঢিল ও পাটকেল নিক্ষেপ করছিল। এ সময় তাদের কয়েকজনকে আটক করার পর তারা পুলিশের ওপর আক্রমণ করে এবং পুলিশের গাড়ি ভাঙচুর করে। তখন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ সাউন্ড গ্রেনেড ও টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ করে।
বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে তিনি বলেন, পরিস্থিতি এখন সম্পূর্ণ স্বাভাবিক এবং নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। কিছুক্ষণ আগে প্রায় আড়াই হাজার শ্রমিক জিরাবো থেকে এনভয় কারখানা পর্যন্ত শান্তিপূর্ণ মিছিল করেছেন। গাজীপুরে শ্রমিক হত্যার প্রতিবাদে তারা এ কর্মসূচি পালন করেন।
গ্রেফতার ও নিরাপত্তাব্যবস্থা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আজকের ঘটনায় কতজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে, সে বিষয়ে এখনও কোনো পরিসংখ্যান নেই। তবে এখন পর্যন্ত কেউ আটক নেই। এ ছাড়া বিজিবির পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হয়েছে। বর্তমানে পাঁচ প্লাটুন বিজিবি এপিসিসহ এলাকায় মোতায়েন রয়েছে।
মামলার বিষয়ে তিনি বলেন, এ পরিস্থিতিতে থানা-পুলিশ ও ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশ একযোগে কাজ করছে। দুই বাহিনী সমন্বিতভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা করছে এবং সে অনুযায়ী আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
শ্রমিকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, শ্রমিকরা কর্মপ্রিয় মানুষ, তারা কাজ করতে চান। কিন্তু বাইরে থেকে কিছু দুষ্কৃতকারী ও নাশকতাকারী এসে তাদের ইন্ধন জোগাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উসকানি দিয়ে তাদের কাজে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করছে। বিভিন্ন সময় শ্রমিকরা একত্র হয়ে হইচই করছেন।
তিনি আরও বলেন, সরকার ইতিমধ্যে ন্যূনতম মজুরি বোর্ড ঘোষণা করেছে। এ কার্যক্রম চলমান রয়েছে এবং জানুয়ারি মাসের শুরু থেকে নতুন মজুরি কার্যকরের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে শ্রমিকদের কাজে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে। মালিকপক্ষ নির্ধারিত ন্যূনতম মজুরি বাস্তবায়নে অঙ্গীকারবদ্ধ। তাই শ্রমিকরা কাজে ফিরে গিয়ে আবারও উৎসবমুখর ও কর্মচঞ্চল পরিবেশ ফিরিয়ে আনবেন।
আন্দোলনে উসকানিদাতাদের শনাক্ত করার বিষয়ে ওই কর্মকর্তা বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যারা এসব কর্মকাণ্ডে উসকানি দিচ্ছেন, তাদের শনাক্ত করে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। ইতিমধ্যে অনেককে আটক করা হয়েছে এবং জিজ্ঞাসাবাদে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। তবে তদন্তের স্বার্থে এ মুহূর্তে তাদের পরিচয় প্রকাশ করা সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, বাইরে থেকে বিভিন্ন দুষ্কৃতকারী ও বহিরাগত ব্যক্তি এসে অশান্ত পরিস্থিতি সৃষ্টির চেষ্টা করছে। শ্রমিকদের সামনে রেখে পেছন থেকে তারা উসকানি দিচ্ছে। এসব ব্যক্তির পেছনে কোনো রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়া রয়েছে কি না, তা তারা জানেন না। তবে তারা শ্রমিক নন, বহিরাগত উসকানিদাতা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তারা বেশ সক্রিয়। কোথায় শ্রমিকরা নামছেন, কোথায় গাড়ি ভাঙচুর হচ্ছে কিংবা কোথায় পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে, সেসব বিষয় নিয়ে তারা প্রচার চালাচ্ছে।











