নিজস্ব প্রতিবেদক:
আওয়ামী লীগের ‘ফ্যাসিবাদী দোসরদের’ আইনের আওতায় আনতে পুলিশের গোয়েন্দা তথ্য কাজে লাগানোর নির্দেশ দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। একই সঙ্গে এসব ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারে ভূমিকা রাখা পুলিশ সদস্যদের পুরস্কৃত করার ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। পাশাপাশি ফ্যাসিবাদী শক্তির সঙ্গে যোগাযোগ বা সহযোগিতার অভিযোগ পাওয়া গেলে পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানিয়েছেন মন্ত্রী।
শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর রাজারবাগ পুলিশ অডিটোরিয়ামে পুলিশ সপ্তাহ ২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত পদক প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, যারা ফ্যাসিবাদী শক্তি ও আওয়ামী লীগের দোসরদের আইনের আওতায় আনতে পারবেন, তাদের পুরস্কৃত করা হবে। গত সপ্তাহে এ ধরনের দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং ২৫ সেপ্টেম্বরও একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
পুলিশের গোয়েন্দা সক্ষমতা ব্যবহারের ওপর জোর দিয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, এতদিন এসব ব্যক্তি দেশের ভেতরেই লুকিয়ে ছিলেন। তাদের শনাক্ত করতে পুলিশের গোয়েন্দা সহায়তা যথাযথভাবে কাজে লাগানোর নির্দেশ দেন তিনি। অন্যান্য সংস্থার গোয়েন্দা সহায়তার সঙ্গে তুলনা করে পুলিশের গোয়েন্দা তথ্যকে তিনি গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন।
দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির চেষ্টা করছে এমন ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
তিনি বলেন, জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, এক মাসে দেশের প্রায় ১ হাজার ৪০০ নাগরিক হত্যার শিকার হয়েছেন। একই সঙ্গে গত ১৭ বছরের বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম ও হেফাজতে মৃত্যুর বিভিন্ন হিসাবের কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যে উঠে আসে অতীতের রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রসঙ্গও। তিনি প্রশ্ন রাখেন, যারা এক মাসে ১ হাজার ৪০০ মানুষকে হত্যা করতে পারে, আকাশ থেকে গুলি করে দেশের নাগরিকদের হত্যা করতে পারে এবং দেশের প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয়করণের মাধ্যমে গণতন্ত্রহীন রাষ্ট্রে পরিণত করতে পারে, বাংলাদেশের মানুষ কি আবার তাদের রাজনীতিতে চায়?
তিনি আরও বলেন, ওই হত্যাকাণ্ডের পরও সংশ্লিষ্টরা দুঃখ প্রকাশ, অনুশোচনা বা ক্ষমা প্রার্থনা করেনি। বরং দেশের বাইরে থেকে তারা বিভিন্ন বক্তব্য দিচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ফ্যাসিবাদী শক্তির সঙ্গে যোগাযোগে কঠোর ব্যবস্থা
পুলিশ সদস্যদের উদ্দেশে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, কোনো পুলিশ সদস্য ফ্যাসিবাদী শক্তির সঙ্গে যোগাযোগ রাখলে বা শৃঙ্খলা ভঙ্গ করলে তাঁর বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রয়োজনে শৃঙ্খলাভঙ্গের ঘটনায় রাষ্ট্রদ্রোহের মামলাও করা হবে বলে সতর্ক করেন তিনি।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, শান্তি-শৃঙ্খলা ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় পুলিশের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। অপরাধ বা নিরাপত্তাহীনতার শিকার মানুষ সাধারণত পুলিশের কাছেই যায়। তাই পুলিশের আচরণ ও দায়িত্ব পালনের ওপর জনগণের আস্থা অনেকাংশে নির্ভর করে।
সরকার দক্ষ, আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর ও মানবিক পুলিশ বাহিনী গড়ে তুলতে চায় বলেও জানান তিনি। দায়িত্ব পালনে দৃঢ়তা ও নিরপেক্ষতার পাশাপাশি জনগণের সঙ্গে সম্মানজনক ও মানবিক আচরণের ওপর গুরুত্ব দেন মন্ত্রী।
শৃঙ্খলাভঙ্গের ক্ষেত্রেও কঠোর অবস্থানের কথা জানান তিনি। দায়িত্বে অবহেলা বা বেআইনি কর্মকাণ্ডে জড়িত হলে শুধু বিভাগীয় ব্যবস্থা নয়, অপরাধের ধরন অনুযায়ী ফৌজদারি আইনেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে দায়িত্ব পালনের সময় সদিচ্ছা থেকে ছোটখাটো ভুল হলে সেটি আলাদাভাবে বিবেচনা করা হবে বলে জানান তিনি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অভিযোগ করেন, অতীতে পুলিশ বাহিনীকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে এবং অনেক পুলিশ সদস্যকে অবৈধ ও বেআইনি নির্দেশ পালন করতে বাধ্য করা হয়েছে। এখন পুলিশকে জনগণের আস্থা অর্জনের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালন না করা, দায়িত্বে অবহেলা কিংবা ফ্যাসিবাদী শক্তিকে গোপনে তথ্য বা অন্য কোনোভাবে সহযোগিতা করার তথ্য সরকারের কাছে রয়েছে বলে দাবি করেন সালাহউদ্দিন আহমদ। পদমর্যাদা যা-ই হোক, জনপ্রত্যাশা বুঝতে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে পরিণতি ভোগ করতে হবে বলেও সতর্ক করেন তিনি।
সাইবার অপরাধ দমনে বিশেষ ইউনিট
সাইবার অপরাধ, অনলাইন প্রতারণা, ডিজিটাল জালিয়াতি ও আন্তদেশীয় অপরাধ মোকাবিলায় পুলিশের সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনার কথাও জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
তিনি বলেন, আগামী সপ্তাহে বাংলাদেশ পুলিশের অধীনে পৃথক ও বিশেষায়িত সাইবার নিরাপত্তা ইউনিট গঠন করা হবে। পুলিশ সদর দপ্তরে অতিরিক্ত আইজিপি পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তার নেতৃত্বে ইউনিটটি পরিচালিত হবে। পদটি বর্তমানে শূন্য থাকলে দ্রুত তা সৃষ্টি করে কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়ার কথাও জানান তিনি।
নতুন ইউনিটের কার্যক্রম দেশের সব মহানগর, প্রশাসনিক বিভাগ ও জেলা পর্যায়ে বিস্তৃত করার পরিকল্পনা রয়েছে। থানা ও জেলা পর্যায় পর্যন্ত সাইবার অপরাধ শনাক্তে আধুনিক সরঞ্জাম সরবরাহ করা হবে।
জটিল সাইবার অপরাধের তদন্তে পুলিশ সদর দপ্তর ও বিভাগীয় পর্যায়ে আধুনিক সাইবার ফরেনসিক ল্যাব স্থাপন এবং প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনার কথাও জানান মন্ত্রী। পরিবর্তিত অপরাধের ধরন মোকাবিলায় দেশজুড়ে প্রযুক্তিগত অবকাঠামো গড়ে তুলে মানুষকে দ্রুত সাইবার নিরাপত্তা দেওয়াই এই বিশেষায়িত ইউনিটের মূল লক্ষ্য বলে জানান তিনি।
শেখ হাসিনাসহ পলাতক আসামিদের ফেরানোর উদ্যোগ
শেখ হাসিনাসহ সাজাপ্রাপ্ত পলাতক আসামিদের দেশে ফেরানোর বিষয়েও বক্তব্য দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি জানান, প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী প্রতিবেশী রাষ্ট্রের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুরোধ জানানো হয়েছে।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, শেখ হাসিনাসহ সাজাপ্রাপ্ত পলাতক আসামিদের ফেরত দেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রের কাছে চুক্তি অনুযায়ী আনুষ্ঠানিক অনুরোধ করা হয়েছে।
তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা স্বেচ্ছায় দেশে ফিরে আইনের মুখোমুখি হলে আইন নিজস্ব গতিতে চলবে বলেও জানান তিনি। তাঁর ভাষ্য, তারা স্বেচ্ছায় দেশে এসে আইনের মুখোমুখি হলে সেটিই ভালো এবং এরপর আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ৯৮ জন পুলিশ সদস্যকে পিপিএম ও বিপিএম পদক পরিয়ে দেন। এ সময় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী, পুলিশের মহাপরিদর্শক মো. আলী হোসেন ফকিরসহ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।








