‘আরেকটি বিপ্লব আসন্ন’, দেশবাসীকে প্রস্তুত থাকতে বললেন জামায়াত আমির

নিজস্ব প্রতিবেদক:

দেশের বর্তমান পরিস্থিতি দেখে ‘আরেকটি বিপ্লব আসন্ন’ বলে মন্তব্য করেছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। এজন্য দেশবাসীকে প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে জনগণের গণরায় মেনে নেওয়া, শিক্ষাঙ্গনে কথিত ফ্যাসিবাদী সংস্কৃতি বন্ধ, গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট নিরসন এবং জনগণের অধিকার রক্ষায় আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন জামায়াত আমির।

 

বুধবার (৫ আগস্ট) দুপুরে রাজধানীর বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের দক্ষিণ গেটে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকী উপলক্ষে ১১ দলীয় জোটের আয়োজিত গণসমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হক সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন। এতে জোটের বিভিন্ন দলের শীর্ষ নেতারাও উপস্থিত ছিলেন।

 

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, দেশের এমন পরিস্থিতি তৈরি হবে আর তারা বসে থাকবেন, তা হতে পারে না। সবকিছু দেখে তার মনে হচ্ছে, ‘আরেকটি বিপ্লব আসন্ন’। সেই বিপ্লবের জন্য তিনি দেশবাসীকে প্রস্তুত হওয়ার আহ্বান জানান।

 

সরকারের সমালোচনা করে জামায়াত আমির বলেন, কোনো অন্যায়ের পরিণতি সঙ্গে সঙ্গে দেখা না গেলেও একসময় তার ফল ভোগ করতে হয়। তার ভাষায়, পাপ পচে গিয়ে একসময় ঝরে পড়ে। সরকারের সেই পরিস্থিতি বোঝা উচিত। তা না হলে তাদের পতন কেউ ঠেকাতে পারবে না।

 

তিনি বলেন, বিপ্লব কোনো বয়স মানে না। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শিশু থেকে বৃদ্ধ পর্যন্ত সবাই রাজপথে ছিলেন। ভবিষ্যতের আন্দোলনেও সব বয়স ও শ্রেণিপেশার মানুষ অংশ নেবেন বলে মন্তব্য করেন তিনি। ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে আপসহীন সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার কথাও জানান জামায়াত আমির।

 

জেল, জুলুম কিংবা ফাঁসির ভয় দেখিয়ে আন্দোলন দমন করা যাবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি। জাতির মুক্তির জন্য প্রয়োজন হলে ফাঁসির রশিকেও ফুলের মালা হিসেবে গ্রহণ করার কথা বলেন ডা. শফিকুর রহমান। ফাঁসির মঞ্চেও তারা ভয় পাবেন না, বরং বিজয়ের জয়ধ্বনি উচ্চারণ করবেন বলে জানান তিনি।

 

বর্তমান সরকারের আচরণ নিয়েও সমালোচনা করেন জামায়াত আমির। তিনি বলেন, যারা অতীতে ফ্যাসিবাদী শাসনের সময় নির্যাতনের শিকার ছিলেন, তারা যদি এখন একই ধরনের জুলুম ও অপকর্মের পুনরাবৃত্তি করেন, তাহলে জনগণ তাদেরও ফ্যাসিবাদী বলবে। তাই ফ্যাসিবাদী আচরণ পরিহার করে জনগণকে সম্মান করার আহ্বান জানান তিনি।

 

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘বাংলার জমিনে কোনো ফ্যাসিবাদকে আমরা সহ্য করব না।’ জনগণকে সম্মান করলে জনগণও তাদের ফুল দিয়ে বরণ করবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

 

জনগণের জনমত ও গণরায় মেনে নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে জামায়াত আমির বলেন, ‘৭০ ভাগ মানুষের রায়কে অপমান করবেন না।’ জনগণের রায় অস্বীকার করে কেউ টিকে থাকতে পারেনি দাবি করে তিনি বলেন, ইতিহাসে যারা জনগণের রায়কে অস্বীকার করেছে, তাদের অপমানজনকভাবে বিদায় নিতে হয়েছে।

 

তিনি অভিযোগ করেন, তাদের আপস করানোর জন্য নিয়মিত চাপ দেওয়া হচ্ছে এবং নানা ধরনের লোভ দেখানো হচ্ছে। তবে জনগণের গণরায়ের পাহারাদারি তারা করবেন বলে জানান তিনি। মহান আল্লাহর সাহায্যে এই দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত কোনো কিছুর বিনিময়ে, এমনকি জীবনের বিনিময়েও তারা অবস্থান থেকে সরে যাবেন না বলেও ঘোষণা দেন।

 

জুলাই আন্দোলনের কৃতিত্ব কোনো একক ব্যক্তি বা রাজনৈতিক দলের নয় বলেও মন্তব্য করেন জামায়াত আমির। তার দাবি, জুলাই আন্দোলনের কোনো একক ‘মাস্টারমাইন্ড’ নেই। হাজার হাজার নির্যাতিত মানুষই ছিলেন এই আন্দোলনের মূল শক্তি।

 

তিনি বলেন, আন্দোলনের কৃতিত্ব পুরো জাতির, আর নেতৃত্বের কৃতিত্ব ছাত্র ও তরুণ সমাজের। এ নিয়ে রাজনৈতিক টানাটানি না করার আহ্বান জানান তিনি।

 

২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত যারা নিহত, আহত, কারাবন্দি, গুম, নির্যাতন ও মিথ্যা মামলার শিকার হয়েছেন, তাদের আত্মত্যাগ জাতি চিরদিন স্মরণ করবে বলেও মন্তব্য করেন ডা. শফিকুর রহমান।

 

তিনি বলেন, শহীদরা কোনো নির্দিষ্ট দলের সম্পদ নন, তারা পুরো জাতির সম্পদ। তাদের নিয়ে রাজনৈতিক বিভাজন তৈরি করা উচিত নয়। একই সঙ্গে জুলাই আন্দোলনে আহতদের উন্নত চিকিৎসা ও পুনর্বাসন, শহীদ পরিবারকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা এবং হত্যাকাণ্ডের বিচার দ্রুত শেষ করার দাবি জানান তিনি।

 

জামায়াত আমির দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, কয়েক দিন ধরে শিক্ষাঙ্গনে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তাতে ছাত্র ও শিক্ষকরা আতঙ্কের মধ্যে রয়েছেন। গণরুম ও গেস্টরুমের ‘ফ্যাসিবাদী সংস্কৃতি’ আবার ফিরে আসছে কি না, সেই আশঙ্কা তৈরি হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

 

শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও কর্মচারীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, যেখানে অন্যায় হবে, সেখানেই প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। অন্যায়ের ক্ষেত্রে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না বলেও ঘোষণা দেন তিনি।

 

সরকারের প্রতিশ্রুতির প্রসঙ্গ তুলে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় যেসব প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, ক্ষমতায় আসার পর তার অনেকগুলো বাস্তবায়নের উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। জনগণের প্রত্যাশা পূরণে সরকারকে আরও আন্তরিক হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

 

গ্যাসের দাম বাড়ানোর সমালোচনা করে জামায়াত আমির অভিযোগ করেন, মূল্যবৃদ্ধির আগে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হয়। এরপর জনগণ সংকটে অতিষ্ঠ হয়ে পড়লে দাম বাড়িয়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা করা হয়।

 

তার প্রশ্ন, দাম বাড়ানোর পর যদি সংকট দূর করা সম্ভব হয়, তাহলে আগে দাম না বাড়িয়েই কেন সংকটের সমাধান করা হয় না। এ ধরনের কর্মকাণ্ডকে জনগণের সঙ্গে প্রতারণা ও ফ্যাসিবাদী চর্চা বলে দাবি করেন তিনি।

 

দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট এবং জনদুর্ভোগ কমাতে সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। জনগণের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর বদলে তাদের ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন।

 

অতীতে জনগণের সম্পদ লুটপাট, চুরি ও ডাকাতির সঙ্গে জড়িতদের প্রবৃত্তির পরিবর্তন হয়নি বলেও অভিযোগ করেন ডা. শফিকুর রহমান। সরকারের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পর্যায়ের এক নেতার বক্তব্যকে এর প্রমাণ এবং কার্যত স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।

 

সমাবেশে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা কর্নেল (অব.) ড. অলি আহমেদ বীর বিক্রম প্রধানমন্ত্রীকে বিভেদ সৃষ্টি না করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর চারপাশের লোকজন থেকেই তার বিপদ আসতে পারে, বিরোধী পক্ষ থেকে নয়। বিদেশি প্রভাবমুক্ত বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই তারা ঐক্যবদ্ধ হয়েছেন জানিয়ে নিরাপদ দেশ গঠনে প্রয়োজন হলে সরকারকে সহযোগিতার কথাও বলেন তিনি।

 

জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, মানুষের একটাই দাবি, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করতে হবে। তা না হলে পাঁচ বছর নয়, পাঁচ মাসের মধ্যেই সরকারের পতন ঘটানো হবে বলে হুঁশিয়ারি দেন তিনি।

 

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা নাসির উদ্দিন পাটোয়ারী বলেন, ক্ষমতায় থাকতে হলে গণভোটের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে হবে। বাংলাদেশের মালিকানা কোনো ব্যক্তি বা দলের নয়, জনগণের। এখন লড়াই শহীদদের বিচার, গণতান্ত্রিক সংস্কার ও জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই। জনগণের জন্য গ্যাস, বিদ্যুৎসহ মৌলিক সেবা নিশ্চিত করার পাশাপাশি টেন্ডারবাজি ও দখলদারিত্ব বন্ধের দাবি জানান তিনি।

 

বাংলাদেশ নাগরিক পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, ৫ আগস্ট মুক্তি ও গণশক্তির উত্থানের প্রতীক। জুলাই আন্দোলনের চেতনাকে মুছে ফেলা যাবে না। গণভোট ও জাতীয় নির্বাচনকে আলাদা করার চেষ্টা হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তার ভাষায়, জুলাই ছিল, আছে এবং ভবিষ্যতেও পথ দেখাবে।

 

বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা এবং মরহুম দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর প্রতিকৃতিতে হামলার নিন্দা জানান। তিনি বলেন, অতীতে জামায়াতে ইসলামীর সহযোগিতায় বিএনপি একাধিকবার ক্ষমতায় এসেছে, সেই ইতিহাস ভুলে গেলে চলবে না। আওয়ামী লীগের পুনর্বাসনের চেষ্টা বিএনপির জন্য বড় রাজনৈতিক ভুল হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

 

চাঁদাবাজ ও দখলদারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে জুলাইয়ের আত্মত্যাগের উদ্দেশ্য পূরণ হবে না বলেও মন্তব্য করেন লেবার পার্টির চেয়ারম্যান।

 

জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) চেয়ারম্যান রাশেদ প্রধান বলেন, শেখ হাসিনার পতনের মধ্য দিয়ে ভারতীয় আধিপত্যেরও অবসান হয়েছিল। তবে বর্তমান সরকারের কর্মকাণ্ডে আবারও সেই প্রভাবের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি। গুমের তদন্তে যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, সেই পুলিশ বাহিনীকে তদন্তের দায়িত্ব দিলে নিরপেক্ষতা নিশ্চিত হবে না বলেও মন্তব্য করেন। জুলাই আন্দোলন শেষ হয়নি, প্রয়োজনে নতুন করে আন্দোলন গড়ে তোলার কথাও জানান তিনি।

 

সমাবেশে আরও উপস্থিত ছিলেন ঢাকা দক্ষিণ মহানগর জামায়াতে ইসলামীর আমির নুরুল ইসলাম বুলবুল এমপি, ঢাকা-৮ আসনের সংসদ সদস্য জয়নুল আবেদীন এমপি, ঢাকা-৫ আসনের সংসদ সদস্য কামাল হোসাইন, ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি হাফেজ রাশেদুল ইসলাম এমপি, আমার বাংলাদেশ পার্টির যুগ্ম মহাসচিব শাহাদাত উল্লাহ টুটুল, জাগপার সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেনসহ ১১ দলের শীর্ষ নেতারা।

 

সমাবেশের শেষ দিকে ডা. শফিকুর রহমান জনগণের দুর্ভোগ, সন্ত্রাস, ফ্যাসিবাদ ও অধিকার হরণের বিরুদ্ধে যেখানে অন্যায় হবে, সেখানেই প্রতিবাদ গড়ে তোলার আহ্বান জানান। কোনো বাধা না মেনে আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা রেখে ফ্যাসিবাদমুক্ত, মানবিক, ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক মর্যাদাপূর্ণ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার কথা বলেন তিনি।