নিজস্ব প্রতিবেদক:
শেখ হাসিনাকে ‘ইতিহাসের নিকৃষ্টতম ও ঘৃণ্য ফ্যাসিস্ট’ আখ্যা দিয়ে তার শাসনামল, জুলাই গণঅভ্যুত্থান এবং ভারতে তার বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেছেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী। তিনি অভিযোগ করেছেন, ক্ষমতা ধরে রাখতে শেখ হাসিনা জনগণের ওপর দমন-পীড়ন চালানোর পাশাপাশি দেশের সম্পদ লুট করেছেন। একই সঙ্গে ভারতে শেখ হাসিনাকে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়াকে দেশটির ‘ডাবল স্ট্যান্ডার্ড’ বা দ্বিমুখী নীতির প্রমাণ বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।
বুধবার (৫ আগস্ট) রাজধানীর গুলশানে জুলাই গণঅভ্যুত্থান ও গত ১৭ বছরের আন্দোলনের চিত্র প্রদর্শনী শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এসব কথা বলেন রিজভী।
শেখ হাসিনার সঙ্গে বিশ্বের বিভিন্ন সময়ের ফ্যাসিস্ট শাসকদের তুলনা করে রিজভী বলেন, নাৎসি হিটলার ও মুসোলিনির মতো ফ্যাসিস্টরা জোর করে ক্ষমতায় টিকে থাকলেও তাদের সঙ্গে শেখ হাসিনার পার্থক্য রয়েছে। তার অভিযোগ, হিটলার ও মুসোলিনি জাতিগত নিপীড়নের মাধ্যমে লাখ লাখ মানুষকে হত্যা করলেও নিজেদের জাতিকে শক্তিশালী ও শ্রেষ্ঠ করার চেষ্টা করতেন।
রিজভীর দাবি, শেখ হাসিনার ক্ষেত্রে দেশের প্রতি সেই দায়বদ্ধতা ছিল না। তিনি অভিযোগ করেন, টাকা পাচার, ব্যাংকের অর্থ লুট, শেয়ারবাজার লুণ্ঠন এবং সরকারি জমি দখলের মতো কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে দেশের সম্পদ লুট করা হয়েছে। তার ভাষায়, নিজের আত্মীয়স্বজনকে বিদেশে সুপ্রতিষ্ঠিত করাই ছিল শেখ হাসিনার মূল এজেন্ডা। এ কারণে তাকে ‘ইতিহাসের নিকৃষ্টতম ও ঘৃণ্য ফ্যাসিস্ট’ বলে আখ্যা দেন বিএনপির এই নেতা।
দেশে আওয়ামী ফ্যাসিবাদের উত্থান হয়েছে দাবি করে রিজভী বলেন, রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের একটি বিশেষ চোরাপথে এ ধরনের ফ্যাসিবাদের উত্থান ঘটে। তার অভিযোগ, মানুষকে প্রলোভন দেখিয়ে ও প্রতারণার মাধ্যমে ক্ষমতায় এসে সেই ক্ষমতাকে দীর্ঘস্থায়ী করতে জনগণের রক্ত ঝরাতেও দ্বিধা করেনি আওয়ামী লীগ।
১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ এবং ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ হত্যার শিকার হয়েছেন বলেও অভিযোগ করেন রিজভী। তিনি বলেন, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ এসব ঘটনায় নিহত হয়েছেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গুলিতে কোলের শিশুও নিহত হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। রেস্টুরেন্টের বাবুর্চি, ফলের দোকানের কর্মচারী ও সাংবাদিকসহ বিভিন্ন পেশার মানুষও আন্দোলনের সময় প্রাণ হারিয়েছেন বলে উল্লেখ করেন বিএনপির এই নেতা।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে জনগণের ভেতরে থাকা শক্তির বড় ধরনের জাগরণ হিসেবে বর্ণনা করেন রিজভী। তিনি বলেন, এই গণঅভ্যুত্থান ছিল অত্যাচারীর বিরুদ্ধে জনগণের সুপ্ত শক্তির ‘পারমাণবিক বিস্ফোরণ’। তার বক্তব্য অনুযায়ী, জনগণের মধ্যে থাকা এই শক্তি শেখ হাসিনা বুঝতে পারেননি। এ কারণেই তিনি বারবার ‘ভুয়া ও পাতানো নির্বাচন’ করে ক্ষমতায় টিকে থাকতে চেয়েছেন বলে অভিযোগ করেন রিজভী।
তিনি আরও বলেন, বিশ্বের দু-একটি দেশ ছাড়া অন্যরা সেই সরকারকে সমর্থন করেনি। এরপরও জোর করে ক্ষমতায় থাকা হয়েছিল বলে দাবি করেন তিনি।
ভারতের দিল্লিতে ‘সাউথ এশিয়ান জার্নালিস্টস’-এর একটি অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনার বক্তব্য দেওয়ার প্রসঙ্গও টানেন রিজভী। তিনি বলেন, শেখ হাসিনা পলাতক এবং তার বিরুদ্ধে ফাঁসি ও যাবজ্জীবন দণ্ডের কথা উল্লেখ করে এমন অবস্থাতেও ভারত সরকার তাকে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দিচ্ছে। ভিডিও বার্তার সুযোগ না থাকলেও অডিও বার্তার সুযোগ দেওয়াকে তিনি ভারতের দ্বিমুখী নীতির প্রকাশ বলে মন্তব্য করেন।
রিজভী বলেন, ‘শেখ হাসিনা পলাতক, ফাঁসি ও যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হওয়া সত্ত্বেও তার জন্য ভারত সরকারের এত মায়া, এত কান্না এবং এত কুম্ভীরাশ্রু ঝরছে যে তাকে ভিডিও বার্তা না হলেও অডিও বার্তা দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। এটা হচ্ছে ভারত সরকারের ডাবল স্ট্যান্ডার্ড।’
ভারতের এই অবস্থানের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ফ্যাসিস্টদের প্রতি ভারতের সমর্থনের বিষয়টি তারা মনে রেখেছে বলেই শেখ হাসিনার মতো একজন পলাতক ব্যক্তিকে সেখানে কথা বলার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে বলে তিনি মনে করেন। রিজভীর ভাষায়, ভারত এমন আচরণ করছে যেন অন্য দেশের কোনো পলাতক ও দাগি আসামি ‘ভারতপ্রেমিক’ হলে তার ‘সাত খুন মাফ’।
ভারতের এমন আচরণের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান বিএনপির এই নেতা।
এ সময় গণতন্ত্র ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার আন্দোলন অব্যাহত রাখার কথাও বলেন রিজভী। তিনি বলেন, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার যে গণতান্ত্রিক প্রত্যয় নিয়ে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ লড়াই করেছেন, সেই লড়াইয়ে তারা আবারও শামিল হতে দ্বিধা করবেন না।











