নিজস্ব প্রতিবেদক:
ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে শ্রমিক আন্দোলনকে কেন্দ্র করে গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) বিভিন্ন এলাকায় শ্রমিকদের বিক্ষিপ্ত বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ ও টায়ার জ্বালানোর মতো ঘটনা ঘটেছে। সম্ভাব্য সহিংসতা ও নাশকতা ঠেকাতে এই মুহূর্তে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, আর একই সঙ্গে মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে অবস্থান নিয়েছেন বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা।
এদিন সকাল ৯টার দিকে গাজীপুরের নাওজোড় এলাকায় ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন একদল শ্রমিক, যার ফলে মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। এ ছাড়া চন্দ্রা পল্লীবিদ্যুৎ, মৌচাক, কোনাবাড়ী, ভোগড়া ও সফিপুর এলাকাতেও শ্রমিকদের বিক্ষিপ্তভাবে বিক্ষোভ করার খবর পাওয়া গেছে।
একপর্যায়ে কোনাবাড়ী বিসিক এলাকায় বিএনপি নেতাকর্মীরা অবস্থান নিয়ে মহাসড়কে মহড়া দেন এবং এ সময় শ্রমিকদের একটি অংশ লাঠি হাতে তাদের সঙ্গে এসে অবস্থান নেয়। তবে মহাসড়কের আশপাশে ও উড়ালসেতুর নিচে তাদের উপস্থিতি থাকলেও যান চলাচলে কোনো ধরনের বাধা সৃষ্টি করা হয়নি, ফলে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে যান চলাচল সম্পূর্ণ স্বাভাবিক থাকে। দুপুর আড়াইটায় এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত নতুন করে কোনো ধরনের সহিংসতা বা অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি।
শিল্প পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবার সকাল থেকে অধিকাংশ পোশাক কারখানা খুলে দেওয়ায় শ্রমিকরা নিয়মিতভাবে কাজে যোগ দেন। তবে শ্রমিক অসন্তোষ ও নিরাপত্তাজনিত নানা ঝুঁকির কারণে বিভিন্ন এলাকার ২০ থেকে ২৫টি কারখানা ছুটি ঘোষণা করতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ, এবং এসব কারখানার অধিকাংশ শ্রমিক নিরাপদে নিজেদের বাড়ি ফিরে গেছেন।
আন্দোলনরত শ্রমিকদের মূল দাবি হলো ন্যূনতম মজুরি অবিলম্বে ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ করতে হবে। তবে তারা কোনো ধরনের ভাঙচুর বা সহিংসতা চান না এবং আলোচনার মাধ্যমেই এই সংকটের একটি শান্তিপূর্ণ সমাধান চান বলে গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন কয়েকজন শ্রমিক।
গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ও মহানগর বিএনপির সভাপতি মো. শওকত হোসেন সরকার এ বিষয়ে বলেন, শ্রমিক নামধারী দুর্বৃত্তদের যেকোনো অপতৎপরতা রুখে দিতে মহাসড়কের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা অবস্থান নিয়েছেন। তিনি আরও জানান যে, এই সহিংস আন্দোলনের সঙ্গে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের যোগসূত্র থাকতে পারে এবং এ ধরনের সব অপতৎপরতা রাজনৈতিকভাবেই মোকাবিলা করা হবে।
এদিকে, শ্রমিক আন্দোলনের নামে যেকোনো ধরনের সহিংসতা ও ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড কঠোর হাতে ঠেকাতে গাজীপুরের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে অতিরিক্ত পুলিশ, এসআরবিসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের মোতায়েন করা হয়েছে। সেই সঙ্গে পুরো মাঠে টহল দিচ্ছে ১০ প্লাটুন বিজিবি এবং জেলা প্রশাসনের ২৫ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট।
গাজীপুর শিল্পাঞ্চল-২-এর পুলিশ সুপার মো. আমজাদ হোসাইন জানান, সকালে বিভিন্ন কারখানার শ্রমিকরা কাজে যোগ দিতে বের হলেও কয়েকটি এলাকার শ্রমিকরা নাওজোড়, ভোগড়া, কোনাবাড়ী, মৌচাক, সফিপুর ও পল্লীবিদ্যুৎসহ বিভিন্ন স্থানে ঢাকা-টাঙ্গাইল ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভের চেষ্টা চালান। পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনাস্থলে গিয়ে তাদের সরিয়ে দেয় এবং যেকোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতেই মূলত বিভিন্ন এলাকার ২০ থেকে ২৫টি কারখানা কর্তৃপক্ষ ছুটি ঘোষণা করেছে।
অন্যদিকে, গাজীপুরের পুলিশ সুপার মো. জসিম উদ্দিন জানান, গত কয়েক দিনের চলমান শ্রমিক আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সংঘটিত সহিংসতা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় দায়েরকৃত মামলাগুলোতে মঙ্গলবার পর্যন্ত অন্তত চার হাজার জনকে আসামি করা হয়েছে এবং এই পর্যন্ত মোট ৩০ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এছাড়া বহিরাগতদের কোনো অবস্থাতেই আশ্রয় না দেওয়ার জন্য স্থানীয় বাড়ি ও ফ্ল্যাটের মালিকদের প্রতি কঠোর গণবিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছে এবং সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় শিল্পাঞ্চলের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর নজরদারি অব্যাহত রয়েছে।











