অনলাইন ডেস্ক:
ভারতের অন্ধ্র প্রদেশের উপকূলে আঘাত হেনেছে অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড় ‘অর্ণব’। গত বুধবার (২৮ অক্টোবর) ভোরে উপকূলে আঘাত হানার পর ছয় ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে চলে এর স্থলভাগে প্রবেশের প্রক্রিয়া। এই ঘূর্ণিঝড়সংশ্লিষ্ট পৃথক কয়েকটি ঘটনায় পাঁচজন মানুষের প্রাণহানির সংবাদ পাওয়া গেছে। নিহতদের মধ্যে কেউ বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়েছেন, আবার কেউ গাছ ভেঙে পড়ার আকস্মিক ঘটনায় মারা গেছেন।
ভারতের অন্ধ্র প্রদেশের বিশাখাপত্তনম, আনাকাপল্লে, কাকিনাড়া, কোনাসীমা ও পশ্চিম গোদাবরী জেলায় এই হতাহতের ও মৃত্যুর ঘটনাগুলো ঘটেছে।
ভারতের আবহাওয়া অধিদপ্তর (আইএমডি) গত বুধবার সকাল ৯টা ৫০ মিনিটে প্রকাশিত এক বুলেটিনে জানিয়েছে, একটি ‘অতি প্রবল’ ঘূর্ণিঝড় হিসেবে অর্ণব অন্ধ্র প্রদেশ ও ইয়ানাম উপকূল অতিক্রম করেছে। আইএমডির নিজস্ব শ্রেণিবিন্যাস পদ্ধতি অনুযায়ী, এটি মূলত ঘূর্ণিঝড়ের তৃতীয় সর্বোচ্চ একটি শ্রেণি।
ওই বুলেটিনে আরও জানানো হয়েছিল যে, ঘূর্ণিঝড়টির মূল কেন্দ্র নরসাপুর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার পূর্বে, ইয়ানামের দক্ষিণ-দক্ষিণ-পশ্চিমে ৪০ কিলোমিটার দূরে, কাকিনাড়ার দক্ষিণ-দক্ষিণ-পশ্চিমে ৬০ কিলোমিটার এবং মাচিলিপত্তনমের পূর্ব-উত্তর-পূর্বে ৯০ কিলোমিটার দূরে অবস্থান করছিল।
আইএমডি জানিয়েছে, তাদের সর্বশেষ পর্যবেক্ষণে স্পষ্ট দেখা গেছে যে ঘূর্ণিঝড়টির কেন্দ্র সম্পূর্ণভাবে স্থলভাগে প্রবেশ করেছে। উপকূল অতিক্রম করার সময় এর একটানা সর্বোচ্চ বাতাসের গতিবেগ রেকর্ড করা হয়েছিল ঘণ্টায় ১২৫ থেকে ১৩৫ কিলোমিটার পর্যন্ত। এ ছাড়া এর দমকা ও ঝোড়ো হাওয়ার গতিবেগ ঘণ্টায় ১৫০ কিলোমিটার পর্যন্ত উঠেছিল।
গত বুধবার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে এই ঘূর্ণিঝড়টি অতি প্রবল থেকে কিছুটা দুর্বল হয়ে প্রবল ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নেয় বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট দেশের আবহাওয়া অধিদপ্তর।
এদিকে ঘূর্ণিঝড় অর্ণবের ভয়াল প্রভাবে অন্ধ্র প্রদেশ ও ওডিশার বিভিন্ন জেলায় ব্যাপক ভারী বৃষ্টিপাত হয়েছে। ঝড়ের তাণ্ডব শুরু হওয়ার আগেই দুই রাজ্যের উপকূলীয় ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো থেকে ১ লাখ ৮০ হাজারের বেশি মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে ও স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল।
গত বুধবার সকাল সাড়ে ৮টা পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, অন্ধ্র প্রদেশের বিশাখাপত্তনমে সর্বোচ্চ ৩১৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এছাড়া বিজয়নগরমে ৩০১ মিলিমিটার, আনাকাপল্লেতে ২৭৫ মিলিমিটার, শ্রীকাকুলামে ২৫৭ মিলিমিটার এবং কৃষ্ণা জেলায় ২২৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে।
অন্যদিকে প্রতিবেশী রাজ্য ওডিশার কোরাপুটে ১৮৮ মিলিমিটার, গঞ্জামে ১৬১ মিলিমিটার এবং গজপতিতে ১৩৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করার কথা জানিয়েছে আবহাওয়া অফিস।
এই প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে গত বুধবার বিশাখাপত্তনম ও বিজয়ওয়াড়াগামী বেশ কয়েকটি ফ্লাইট বাতিল করতে বাধ্য হয়েছে বিভিন্ন বিমান সংস্থা। পাশাপাশি বিদ্যুৎ সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে এবং বহু গাছপালা উপড়ে পড়ার ঘটনা ঘটেছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় কিছু কিছু এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে এবং বাতিল করা হয়েছে বেশ কয়েকটি ট্রেনের নিয়মিত চলাচলও।
তবে স্বস্তির বিষয় হলো, ওডিশা ও অন্ধ্র প্রদেশে এই ঘূর্ণিঝড়ের সরাসরি প্রভাবে নতুন করে প্রাণহানির আর কোনো খবর পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। আবহাওয়া কর্মকর্তাদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, এই ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে বুধবার ও বৃহস্পতিবার জুড়ে ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে।
আলোচিত এই ঘূর্ণিঝড়টির নামকরণ নিয়ে মানুষের মনে কৌতূহল কাজ করা স্বাভাবিক। মূলত ‘অর্ণব’ নামটি প্রস্তাব করেছিল বাংলাদেশ। ২০২০ সালে বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) এবং জাতিসংঘের এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কমিশনের (এসকাপ) যৌথ ঘূর্ণিঝড়বিষয়ক প্যানেল অনুমোদিত নামের অফিসিয়াল তালিকায় এটি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল।
বাংলা ভাষায় ‘অর্ণব’ শব্দটির অর্থ মহাসমুদ্র বা সাগর, যা মূলত সাগরের সঙ্গেই সরাসরি সম্পর্কিত।
উত্তর ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ঘূর্ণিঝড়ের নামকরণের এই নির্ধারিত তালিকায় মোট ১৩টি দেশের প্রস্তাবিত নাম রয়েছে। এই দেশগুলো হলো বাংলাদেশ, ভারত, ইরান, মালদ্বীপ, মিয়ানমার, ওমান, পাকিস্তান, কাতার, সৌদি আরব, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইয়েমেন।
তালিকায় প্রতিটি দেশের পক্ষ থেকে ১৩টি করে নাম প্রস্তাব করা হয়েছে, যার ফলে মোট নামের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৬৯টিতে। বঙ্গোপসাগর ও আরব সাগরসহ উত্তর ভারত মহাসাগরে যখনই কোনো ঘূর্ণিঝড়ের সৃষ্টি হয়, তখনই এই তালিকা থেকে ধারাবাহিকভাবে এসব নাম ব্যবহার করা হয়ে থাকে।
ঝড়ের নামকরণের মূল উদ্দেশ্য হলো একটি নির্দিষ্ট ঝড়কে খুব সহজে ও দ্রুত শনাক্ত করা, এর গতিপ্রকৃতি ও সম্ভাব্য বিপদ সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে সচেতন রাখা এবং একই সময়ে একাধিক ঝড় সৃষ্টি হলে যেকোনো ধরনের বিভ্রান্তি এড়ানো বা কমানো।











