নিজস্ব প্রতিবেদক:
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বর্তমান অবস্থা নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন। দায়িত্ব নেওয়ার প্রায় চার মাস পরও মন্ত্রণালয়ের নানা জটিলতার শেষ খুঁজে পাচ্ছেন না বলে মন্তব্য করেছেন তিনি। একই সঙ্গে শিক্ষা খাতে দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক অচলাবস্থা, মামলা জট এবং শিক্ষক সংকটের বিষয়ও তুলে ধরেছেন।
মঙ্গলবার (২৩ জুন) চট্টগ্রাম কলেজ অডিটোরিয়ামে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা উপলক্ষে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ড, মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় এসব কথা বলেন শিক্ষামন্ত্রী। সভায় ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন এবং স্থানীয় সংসদ সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
মন্ত্রণালয়ের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, “শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিরুদ্ধে ৩০ হাজারের বেশি মামলা রয়েছে। অচল অবস্থা হয়ে গেছে। ৬৫ হাজার ৫০০ প্রাইমারি স্কুলের মধ্যে ৫০ হাজার স্কুলে প্রধান শিক্ষক নেই। দায়িত্ব নেওয়ার প্রায় চার মাস হয়ে গেলেও কোনো কূল-কিনারা পাচ্ছি না।”
তিনি বলেন, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতি সংক্রান্ত একটি মামলার কারণে দীর্ঘদিন ধরে হাজার হাজার পদ শূন্য পড়ে আছে। ২০১৭ সালে শুরু হওয়া ওই মামলার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, “৩২ হাজার ৫০০ শিক্ষককে হেডমাস্টার বানানোর কথা ছিল। ২৮৭ জনকে নিয়ে জটিলতা তৈরি করে পুরো প্রক্রিয়াই আটকে দেওয়া হয়েছে। ফলে হাজার হাজার স্কুল প্রধান শিক্ষকবিহীন অবস্থায় রয়েছে।”
সভায় বিভিন্ন কলেজে অনার্স কোর্স চালুর প্রবণতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন শিক্ষামন্ত্রী। তাঁর ভাষায়, প্রায় সব জায়গা থেকেই অনার্স চালুর দাবি আসে, কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে একই ধরনের কয়েকটি বিষয়ে কোর্স খোলার আবেদন করা হয়। তিনি বলেন, দেশে বর্তমানে ৫৬টি পাবলিক ও ১১৬টি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। তারপরও একই বিষয়ে বিভিন্ন কলেজে অনার্স চালুর যৌক্তিকতা নিয়ে ভাবতে হবে।
শিক্ষামন্ত্রী আরও বলেন, অনেক জনপ্রতিনিধি নতুন বিশ্ববিদ্যালয়, সরকারি কলেজ বা অনার্স কোর্সের দাবি তুললেও প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়ন নিয়ে খুব কম আলোচনা হয়। “একজনও এসে বলেন না, আমার এলাকার প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর উন্নয়ন দরকার। সবাই বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজ চায়,” বলেন তিনি।
শিক্ষা খাতে জবাবদিহিতার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন মন্ত্রী। এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোতে সরকারের বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয়ের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি বলেন, “একটি স্কুলে মাসে অন্তত চার লাখ টাকা দেয় সরকার। বছরে ৪৮ লাখ টাকা। তারপরও যদি কোনো শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ না নেয় বা শতভাগ ফেল করে, তাহলে সেই অর্থ ব্যয়ের জবাবদিহিতা থাকতে হবে।”
তবে সমালোচনার পাশাপাশি শিক্ষা ব্যবস্থায় পরিবর্তনের রূপরেখাও তুলে ধরেন তিনি। শিক্ষার্থীদের সময় অপচয় কমাতে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার সময়সূচি আগেভাগে প্রকাশ করা হয়েছে বলে জানান। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি প্রক্রিয়া সমন্বয়ের উদ্যোগ নেওয়ার কথাও বলেন।
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, “দেশের শিক্ষাক্ষেত্রে গুণগত পরিবর্তন আনতেই হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের চার বছরের কোর্স চার বছরের মধ্যেই শেষ করতে হবে। শিক্ষার্থীদের একাডেমিক জীবন অযথা দীর্ঘায়িত হওয়ার সুযোগ রাখা যাবে না।”
পরীক্ষায় নকলের নতুন কৌশল নিয়েও সতর্ক করেন তিনি। ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহার করে অসদুপায় অবলম্বনের চেষ্টা বাড়ছে উল্লেখ করে কেন্দ্র সচিব ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আরও সতর্ক থাকার আহ্বান জানান।
শিক্ষকদের উদ্দেশেও বার্তা দেন শিক্ষামন্ত্রী। তিনি বলেন, জাতি গঠনে শিক্ষকদের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তাই দায়িত্বশীলতার পাশাপাশি তাদের নিজেদের পেশাগত মর্যাদা ও সম্মানও অর্জন করে নিতে হবে।











