নিজস্ব প্রতিবেদক:
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা ও যুদ্ধ পরিস্থিতির সরাসরি প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বাংলাদেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থান খাতে। চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে মার্কিন‑ইসরায়েলি হামলার মাধ্যমে যে সামরিক সংঘাতের সূত্রপাত হয়েছিল, তা পুরো মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানিতে এক ধরনের স্থবিরতা ও ধীরগতি নেমে এসেছে। প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সামপ্রতিক তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ থেকে মে- এই তিন মাসে বিদেশে কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে যাওয়া বাংলাদেশি কর্মীর সংখ্যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রবাসী শ্রমিক প্রেরণের এই পতন কেবল একটি বড় সংকটের শুরু মাত্র; যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে আগামী মাসগুলোতে জনশক্তি রপ্তানি খাত আরও বড় ধাক্কার মুখে পড়তে পারে। তবে নতুন কর্মী পাঠানোর হার কমলেও বৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্স প্রবাহে উল্টো ইতিবাচক চিত্র দেখা গেছে। সংঘাতময় পরিস্থিতির কারণে প্রবাসীরা ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিয়ে আশঙ্কায় দ্রুত দেশে টাকা পাঠাচ্ছেন, ফলে রেমিট্যান্সে সাময়িক প্রবৃদ্ধি ঘটেছে। পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৬ সালের মার্চ থেকে মে পর্যন্ত তিন মাসে মাত্র ১ লাখ ২৩ হাজার ৬৩৬ জন বাংলাদেশি কর্মী বিদেশে গেছেন। অথচ ২০২৫ সালের একই সময়ে এই সংখ্যা ছিল ২ লাখ ৬০ হাজার ৪৩৮ জন। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে বিদেশগামী নতুন কর্মীর সংখ্যা কমেছে প্রায় ৪১ শতাংশ। বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিজ (বায়রা) জানিয়েছে, বর্তমানে যে সংখ্যক কর্মী যাচ্ছেন তা মূলত যুদ্ধ শুরুর আগে অনুমোদিত চাহিদা ও সম্পন্ন হওয়া ভিসার ওপর নির্ভর করছে। নতুন করে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে জনশক্তির চাহিদা আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ায় এর প্রকৃত নেতিবাচক প্রভাব আগামী মাসগুলোতে আরও স্পষ্ট হবে। বায়রার মতে, বর্তমানে সৌদি আরব ছাড়া বড় কোনো শ্রমবাজার বাংলাদেশের জন্য উন্মুক্ত নেই। সংযুক্ত আরব আমিরাতে নিয়োগ সীমিত, কাতার ও কুয়েতে নামমাত্র কর্মী যাচ্ছেন এবং মালয়েশিয়ার বিশাল বাজার এখনও বন্ধ। ইউরোপের কিছু দেশে নতুন সুযোগ তৈরি হলেও কনস্যুলার জটিলতা ও দীর্ঘ ভিসা প্রক্রিয়ার কারণে সাধারণ কর্মীরা তা কাজে লাগাতে পারছেন না। রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো মনে করছে, যুদ্ধ পরিস্থিতির পাশাপাশি মৌসুমী মন্দার প্রভাবও কাজ করছে। সাধারণত রমজান থেকে হজ মৌসুম পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যে নিয়োগ ধীর থাকে। এ বছর হজ ইতোমধ্যেই শেষ হয়েছে, ফলে মৌসুমী স্থবিরতা কাটতে শুরু করেছে। এখন যদি আঞ্চলিক সংঘাত আরও না বাড়ে, তবে আসন্ন মাসগুলোতে নতুন করে শ্রমের চাহিদা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে আসন্ন বিশ্বকাপ এবং বিভিন্ন বৃহৎ উন্নয়ন প্রকল্পকে কেন্দ্র করে অবকাঠামো, হোটেল, স্টেডিয়াম সংস্কার ও সেবাখাতে বিপুল সংখ্যক শ্রমিকের প্রয়োজন হবে। এই খাতগুলোতে বাংলাদেশিদের জন্য নতুন নিয়োগের সুযোগ তৈরি হতে পারে। এদিকে, জনশক্তি রপ্তানির এই মন্দার মধ্যেও প্রবাসী আয়ের ধারাবহিকতা অব্যাহত রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ১ জুলাই, ২০২৫ থেকে ৩ জুন, ২০২৬ পর্যন্ত বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে দেশে এসেছে মোট ৩৩.২৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স। আগের অর্থবছরের একই সময়ে রেমিট্যান্সের পরিমাণ ছিল ২৮.১১ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ১৮.২৫ শতাংশ। অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, যুদ্ধের কারণে প্রবাসীদের সঞ্চয় দেশে পাঠানোর প্রবণতা, বৈধ পথে অর্থ প্রেরণে সরকারের প্রণোদনা এবং হুন্ডি প্রতিরোধে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কঠোর নজরদারি- সব মিলেই এই প্রবৃদ্ধি ঘটিয়েছে। তবে নতুন কর্মী যাওয়ার হার কমতে থাকলে দীর্ঘমেয়াদে রেমিট্যান্সের এই ইতিবাচক ধারা বজায় রাখা কঠিন হবে। এই সংকটের মাঝেই সরকার বৈদেশিক কর্মসংস্থান খাতকে পুনরুজ্জীবিত করতে নতুন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। সম্প্রতি জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনে প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর জানিয়েছেন, আগামী অর্থবছরে প্রায় ১৪ লাখ বাংলাদেশি কর্মীকে বিদেশে পাঠানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তিনি সংসদকে অবহিত করেন, ২০২৫ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৬ সালের ৩১ মে পর্যন্ত ১১ মাসে মোট ৯ লাখ ৩৩ হাজার ৮১৫ জন কর্মী বিদেশে গেছেন। সরকার দক্ষ ও পেশাদার কর্মী পাঠানোর মাধ্যমে বৈদেশিক কর্মসংস্থানের সুযোগ সমপ্রসারণে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। মালয়েশিয়া, ওমান, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বাজারগুলো পুনরায় উন্মুক্ত করতে কূটনৈতিক আলোচনা ও দ্বিপাক্ষিক যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। সরকারের এই উদ্যোগ এবং রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির নেতিবাচক প্রভাব কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।











