সর্বজনীন পেনশনে স্থবিরতা, গতি বাড়াতে নতুন উদ্যোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক:

সর্বজনীন পেনশন কর্মসূচি চালুর পর প্রথম দিকে ব্যাপক সাড়া পাওয়া গেলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর গতি আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। জানা গেছে, গত এক বছরে নতুন নিবন্ধন হয়েছে মাত্র চার হাজারের মতো, যা কর্মসূচির সম্ভাবনা ও লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় হতাশাজনক। জনসচেতনতার ঘাটতি, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে প্রচারণার অভাবকে এর প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। এই স্থবিরতা কাটাতে সরকার সমপ্রতি জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের নতুন নেতৃত্ব নিয়োগ দিয়েছে। নির্বাহী চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন ড. মো. সুরাতুজ্জামান এবং সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন শেখ কামরুল হাসান। দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই তারা কর্মসূচিকে পুনরুজ্জীবিত করতে বেশ কিছু উদ্যোগ হাতে নিয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে শেয়ারভিত্তিক পেনশন স্কিম চালু, মনোনীত ব্যক্তির জন্য আজীবন পেনশন সুবিধা, আউটসোর্সিং কর্মীদের অন্তর্ভুক্তি এবং বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়ে কর্মশালা ও সেমিনার আয়োজন। একই সঙ্গে ইসলামিক সংস্করণ চালুর বিষয়েও আলোচনা চলছে, যাতে আরও বিস্তৃত জনগোষ্ঠীকে অন্তর্ভুক্ত করা যায়। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী দেখা যাচ্ছে, সর্বজনীন পেনশন স্কিমে নিবন্ধন সম্পন্ন করেছেন মোট ৩ লাখ ৭৮ হাজার ২৯ জন। তাদের জমা দেওয়া চাঁদার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৬৩ কোটি টাকার বেশি। বিপরীতে সরকারি ট্রেজারি বন্ড ও বিলে বিনিয়োগ করা হয়েছে ২৮৬ কোটি টাকার বেশি, যার বর্তমান মূল্য বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৮৮ কোটি টাকা। অর্থাৎ জমা হওয়া চাঁদার চেয়ে বিনিয়োগ বেশি হয়েছে, কারণ মুনাফা পুনরায় বিনিয়োগ করা হয়েছে। এদিকে, স্কিমভিত্তিক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দরিদ্র মানুষের জন্য চালু করা সমতা স্কিমে নিবন্ধনকারীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি- ২ লাখ ৮৬ হাজারের বেশি। মাসিক চাঁদা ১ হাজার টাকা, এর মধ্যে ৫০০ টাকা সরকার বহন করে। মোট নিবন্ধনকারীর ৭৬ শতাংশই এই স্কিমে যুক্ত। বেসরকারি চাকরিজীবীদের জন্য চালু করা প্রগতি স্কিমে নিবন্ধন করেছেন প্রায় ২৫ হাজার জন, যেখানে জমা পড়া চাঁদার পরিমাণ ১২২ কোটি টাকার বেশি। কৃষক, শ্রমিক, রিকশাচালকসহ অনানুষ্ঠানিক খাতের কর্মীদের জন্য চালু করা সুরক্ষা স্কিমে নিবন্ধন করেছেন প্রায় ৬৫ হাজার জন, তাদের জমা দেওয়া চাঁদার পরিমাণ প্রায় ৭৫ কোটি টাকা। বিদেশে অবস্থানরত প্রবাসীদের জন্য চালু করা প্রবাস স্কিমে নিবন্ধন করেছেন মাত্র ১ হাজারের বেশি মানুষ, জমা পড়া চাঁদার পরিমাণ ৭ কোটি টাকার বেশি। এদিকে, গতি কমে যাওয়ার পেছনে রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাবও স্পষ্ট। ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে ছাত্র আন্দোলন শুরু হওয়ার পর থেকে নিবন্ধনের গতি কমতে থাকে। শেখ হাসিনার সরকার পতনের পর মানুষের মধ্যে সন্দেহ দেখা দেয় যে স্কিমটি চালু থাকবে কি না। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে প্রচারণা কম থাকায় নিবন্ধন আরও কমে যায়। ফলে এক সময় যে কর্মসূচি নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ দেখা দিয়েছিল, তা কার্যত স্থবির অবস্থায় চলে যায়। এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে সরকার ব্যাংক খাতকে অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে। গত ৩ জুন অর্থ মন্ত্রণালয়ের বৈঠকে বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রগতি স্কিমে অন্তর্ভুক্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক বলেন, রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকের সব শাখায় পেনশন ডেস্ক স্থাপন করতে হবে এবং বেসরকারি ব্যাংকের কর্মীদেরও অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান ড. সুরাতুজ্জামান বলেন, দেশে প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ বেসরকারি শ্রমিক ও কর্মচারী অবসর-পরবর্তী কোনো নিরাপত্তা পান না। প্রগতি স্কিম তাদের জন্য কার্যকর সমাধান হতে পারে। জানা গেছে, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় সরকারের লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের প্রায় ৪ কোটি পরিবারের অন্তত একজন সদস্যকে সর্বজনীন পেনশনের আওতায় আনা। এ জন্য প্রচারণা জোরদার, নতুন সুবিধা যুক্ত করা এবং ইসলামিক সংস্করণ চালুর পরিকল্পনা চলছে। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়ে কর্মশালা ও সেমিনার আয়োজনের মাধ্যমে জনগণকে সচেতন করা হবে। একই সঙ্গে প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক ও অন্যান্য গণমাধ্যমে বিজ্ঞাপন প্রচারের মাধ্যমে প্রচারণা চালানো হবে। তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, সর্বজনীন পেনশন স্কিম বর্তমানে স্থবিরতার মুখে পড়লেও নতুন নেতৃত্ব ও সরকারের উদ্যোগে আবারও গতি ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জনসচেতনতা বৃদ্ধি, বেসরকারি খাতকে কার্যকরভাবে অন্তর্ভুক্ত করা এবং মাঠপর্যায়ে প্রচারণা জোরদার ছাড়া এই কর্মসূচি সফল হবে না। সরকারের নতুন উদ্যোগগুলো বাস্তবায়িত হলে দেশের সামাজিক নিরাপত্তা কাঠামোতে সর্বজনীন পেনশন একটি টেকসই ও কার্যকর ব্যবস্থা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে বলে মত বিশেষজ্ঞদের।