জ্বালানির দাম বাড়তেই বাসভাড়া বাড়ানোর দাবি

নিজস্ব প্রতিবেদক:

জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ার   পর বাসভাড়া সমন্বয়ের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) বিকেলে রাজধানীর বনানীতে সংস্থাটির কার্যালয়ে ভাড়া সমন্বয় কমিটির বৈঠকে সিটি সার্ভিসের বাসে কিলোমিটারপ্রতি ১৮ পয়সা এবং দূরপাল্লার বাসে ২০ পয়সা ভাড়া বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে। তবে এর মধ্যেই ঢাকা থেকে খুলনাসহ দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন রুটে চলাচলকারী বাস মালিকেরা যাত্রীপ্রতি ৫০ টাকা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

 

বিআরটিএর ভাড়া সমন্বয় কমিটির বৈঠক শুরু হয় বিকেল ৩টায়, শেষ হয় ৫টার দিকে। এতে বাস মালিক-শ্রমিকসহ পরিবহন খাতের সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর প্রতিনিধিরা অংশ নেন। বৈঠকে জ্বালানি তেলের নতুন দামের কারণে বাস পরিচালনার ব্যয় কতটা বেড়েছে এবং সে অনুযায়ী ভাড়া কী হারে সমন্বয় করা হবে, তা নিয়ে আলোচনা হয়।

 

কমিটির এক সদস্যের ভাষ্য অনুযায়ী, সিটি সার্ভিসে কিলোমিটারপ্রতি ১৮ পয়সা এবং দূরপাল্লার বাসে ২০ পয়সা বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে সর্বনিম্ন ভাড়া আগের মতো রাখার প্রস্তাব রয়েছে। অর্থাৎ বাসের সর্বনিম্ন ভাড়া ১০ টাকা এবং মিনিবাসের সর্বনিম্ন ভাড়া ৮ টাকা অপরিবর্তিত রাখার সুপারিশ করা হয়েছে।

 

তবে পরিবহন মালিকদের দাবি ছিল আরও বেশি। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, মালিকপক্ষ কিলোমিটারপ্রতি অন্তত ৪০ পয়সা ভাড়া বাড়ানোর দাবি জানিয়েছে। আলোচনার পর এর চেয়ে কম হারে ভাড়া বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে।

 

বিআরটিএর পক্ষ থেকে এখন এ প্রস্তাব সরকারের কাছে পাঠানো হবে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, এ বিষয়ে মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) এর মধ্যে প্রজ্ঞাপন জারি হতে পারে।

 

দক্ষিণাঞ্চলের রুটে ৫০ টাকা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত

সরকারি পর্যায়ে নতুন ভাড়া চূড়ান্ত হওয়ার আগেই ঢাকা থেকে খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট ও পিরোজপুরসহ দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন রুটে চলাচলকারী বাস মালিকেরা যাত্রীপ্রতি ৫০ টাকা ভাড়া বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

 

সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) সকালে সংশ্লিষ্ট রুটের বাস মালিকেরা বৈঠক করে এ সিদ্ধান্ত নেন। তাদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, যাত্রী যেখানেই নামুন না কেন, বর্তমান ভাড়ার চেয়ে ৫০ টাকা বেশি দিতে হবে।

 

ঢাকা থেকে দক্ষিণাঞ্চলের একটি রুটে চলাচলকারী বাস কোম্পানির এক মালিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ঢাকার গুলিস্তানের ফুলবাড়িয়া থেকে খুলনা গিয়ে একটি বাস আবার ঢাকায় ফিরতে প্রায় ১৪০ লিটার জ্বালানি তেল লাগে। বিআরটিএর হিসাবে প্রতি ট্রিপে গড়ে ২৮ জন যাত্রী ধরা হয়। জ্বালানি তেলের বাড়তি খরচ সমন্বয়ের জন্যই যাত্রীপ্রতি ৫০ টাকা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে তিনি জানান।

 

তার ভাষ্য, জ্বালানি তেলের দাম যে পরিমাণ বেড়েছে, তাতে বিআরটিএ নতুন ভাড়া নির্ধারণ করবে। এ সিদ্ধান্ত নিতে এক থেকে দুই দিন সময় লাগতে পারে। কিন্তু এরই মধ্যে পরিবহন মালিকদের বাড়তি খরচ শুরু হয়েছে। তাই সরকারি সিদ্ধান্ত আসার আগেই ভাড়া বাড়ানোর প্রয়োজন দেখছেন তারা।

 

তবে বিআরটিএ নতুন ভাড়া নির্ধারণ করলে সরকার নির্ধারিত কিলোমিটারপ্রতি হারের ভিত্তিতে পরবর্তী সময়ে ভাড়া ঠিক করা হবে বলে ওই বাস মালিক জানান।

 

তিনি আরও বলেন, বিআরটিএ দ্রুত সিদ্ধান্ত দিলে পরিবহন মালিক ও যাত্রী উভয় পক্ষের জন্যই ভালো হবে। কারণ সরকারি সিদ্ধান্ত ছাড়া যাত্রীরা বাড়তি ভাড়া দিতে সব সময় আগ্রহী হন না। এতে বিভিন্ন স্থানে যাত্রী ও বাসের কন্ডাক্টরের মধ্যে বিরোধের আশঙ্কা থাকে।

 

জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে ২০ টাকা

এর আগে রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) রাতে সরকার চার ধরনের জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা করে বাড়ানোর ঘোষণা দেয়। নতুন দরে ডিজেলের দাম ১১৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৩৫ থেকে ১৫৫ টাকা, অকটেন ১৪৫ থেকে ১৬৫ টাকা এবং পেট্রল ১৪০ থেকে ১৬০ টাকা হয়েছে। নতুন দাম রোববার দিবাগত মধ্যরাত থেকে কার্যকর হয়েছে।

 

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর পরই বাসভাড়া পুনর্নির্ধারণ নিয়ে বিআরটিএতে জরুরি বৈঠক বসে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক কাজী জুবায়ের মাসুদ বলেন, তেলের দাম বাড়ার কারণে বিআরটিএতে জরুরি বৈঠক চলছে। পরিবহন পরিচালনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পণ্য ও সেবার দামও বাড়ছে। সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে বাসভাড়া পুনর্নির্ধারণ করা হবে বলে তারা আশা করছেন।

 

বিআরটিএর এক কর্মকর্তা বলেন, পরিবহন খাতের সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করেই ভাড়া বাড়ানোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে এবং মালিকপক্ষ থেকে ভাড়া বাড়ানোর দাবি জানানো হয়েছে।

 

এর আগেও জ্বালানির দাম বাড়ায় ভাড়া সমন্বয়

এর আগে চলতি বছরের এপ্রিলেও জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর বাসভাড়া সমন্বয় করা হয়েছিল। তখন ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ১৫ টাকা বেড়ে ১১৫ টাকা হয়। ২৩ এপ্রিলের প্রজ্ঞাপনে দূরপাল্লার বাসের ভাড়া কিলোমিটারপ্রতি ২ টাকা ১২ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ২ টাকা ২৩ পয়সা করা হয়।

 

একই সময়ে ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরের বাসের ভাড়া কিলোমিটারপ্রতি ২ টাকা ৪২ পয়সা থেকে ২ টাকা ৫৩ পয়সা এবং ডিটিসিএ এলাকার মিনিবাসের ভাড়া ২ টাকা ৩২ পয়সা থেকে ২ টাকা ৪৩ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছিল।

 

এরও আগে ২০২২ সালের আগস্টে ডিজেলের দাম ৮০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১১৪ টাকা করা হয়। তখন দূরপাল্লার বাসের ভাড়া কিলোমিটারপ্রতি ৪০ পয়সা এবং মহানগরের বাসে ৩৫ পয়সা বাড়ানো হয়েছিল। পরে ডিজেলের দাম ৫ টাকা কমানো হলে ওই বছরের ৩১ আগস্ট দূরপাল্লার বাসের ভাড়া ২ টাকা ২০ পয়সা থেকে কমিয়ে ২ টাকা ১৫ পয়সা এবং ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরের বাসের ভাড়া ২ টাকা ৫০ পয়সা থেকে কমিয়ে ২ টাকা ৪৫ পয়সা করা হয়।

 

২০২৪ সালের এপ্রিলে ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ৩ টাকা কমার পরও বাসভাড়া সমন্বয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তখন দূরপাল্লা ও মহানগরের ডিজেলচালিত বাসের ভাড়া কিলোমিটারপ্রতি ৩ পয়সা কমানোর সুপারিশ করেছিল বিআরটিএ।