নিজস্ব প্রতিবেদক:
উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ডলার সংকট আর বিনিয়োগের স্থবিরতায় দেশের অর্থনীতি যখন এক জটিল সন্ধিক্ষণ পার করছে, তখন নতুন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগে। প্রতি বছর লাখ লাখ শিক্ষিত ও দক্ষ তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করলেও সেই অনুপাতে কাঙ্ক্ষিত চাকরি না মেলায় দেশের শিক্ষিত যুবকদের মধ্যে বেকারত্বের হার উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বিশাল বাজেটের মূল লক্ষ্য বেসরকারি খাতকে পুনরুজ্জীবিত করে কর্মসংস্থানের চাকা সচল করা। এই মহাপরিকল্পনার অংশ হিসেবে সরকার আগামী অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৩১ দশমিক ৪ শতাংশ বিনিয়োগে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, যার মধ্যে বেসরকারি খাতে ২৪ দশমিক ৯ শতাংশ এবং সরকারি খাতে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ বিনিয়োগ আনার পরিকল্পনা রয়েছে। একই সাথে দেশের থমকে যাওয়া উৎপাদনশীল খাতকে টেনে তুলতে এবং বন্ধ শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো পুনরায় চালু করে প্রায় ২৫ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে ৬০ হাজার কোটি টাকার একটি বিশেষ প্রণোদনা কর্মসূচি ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এই তহবিলের আওতায় বন্ধ শিল্প ও সেবা প্রতিষ্ঠানকে উৎপাদনে ফেরাতে ২০ হাজার কোটি টাকার একটি প্রাক-অর্থায়ন স্কিম গঠন করা হয়েছে, যেখানে ক্ষুদ্র ও শ্রমঘন শিল্পের উদ্যোক্তারা মাত্র ৪ শতাংশ স্বল্প সুদে ঋণ সুবিধা পাবেন। তবে কাগজে-কলমে সরকারের এত বড় পরিকল্পনা, আর্থিক প্রণোদনা আর নীতিগত ঘোষণা থাকার পরও মাঠপর্যায়ে বেকারত্বের হার না কমার পেছনে গভীর এক কাঠামোগত সংকট কাজ করছে। জানা যায়, দেশে স্নাতক বা গ্র্যাজুয়েট সম্পন্ন করা তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার বর্তমানে ১৩.৫ শতাংশে গিয়ে পৌঁছেছে, যা দেশের সামগ্রিক জাতীয় বেকারত্বের হারের তুলনায় প্রায় তিনগুণ বেশি। পরিসংখ্যান বলছে, ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সি যুবকদের মধ্যে সার্বিক বেকারত্বের হার যেখানে প্রায় ১০ শতাংশ, সেখানে দেশের সামগ্রিক সাধারণ বেকারত্বের হার ৫ শতাংশেরও কম। সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য হলো, বাংলাদেশের প্রায় ৩০ শতাংশ যুবক-যুবতী বর্তমানে ‘নিট’ (ঘঊঊঞ) শ্রেণীভুক্ত, অর্থাৎ তারা এই মুহূর্তে কোনো ধরনের শিক্ষা, কর্মসংস্থান কিংবা কোনো পেশাদার প্রশিক্ষণের সঙ্গেই যুক্ত নন। এই বিশালসংখ্যক তরুণ জনশক্তিকে উৎপাদনশীল খাতে যুক্ত করতে না পারার এই ধারাবাহিক ব্যর্থতা দেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে বড় ধরনের ঝুঁকিতে ফেলে দিচ্ছে। অর্থনীতিবিদ ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, বাংলাদেশে দীর্ঘ দিন ধরে চলা এই ‘কর্মসংস্থানহীন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি’ মূলত সামগ্রিক অর্থনৈতিক নীতির ব্যর্থতারই ফসল, এটিকে শুধুমাত্র শিক্ষার অভাব বা ব্যক্তিগত দক্ষতার ঘাটতি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)-এর তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রতি বছর দেশের শ্রমবাজারে প্রায় ২২ লক্ষ নতুন চাকরিপ্রার্থী প্রবেশ করছেন, কিন্তু সেই তুলনায় দেশীয় অর্থনীতিতে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হচ্ছে মাত্র ১৪ লক্ষের মতো। ফলে প্রতি বছরই এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি অর্থাৎ প্রায় ৮ লাখের মতো নতুন চাকরিপ্রার্থী যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও সম্পূর্ণ কর্মহীন থেকে যাচ্ছেন। গত দুই দশকে বাংলাদেশে যুবসমাজের দক্ষতা উন্নয়ন ও নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) এবং বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে এক ডজনেরও বেশি মেগা প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। এসব প্রকল্পের সুবাদে দেশজুড়ে প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণের সুযোগ ও পরিধি উল্লেখযোগ্য হারে বাড়লেও শিক্ষিত বেকারত্ব কমানো সম্ভব হয়নি, উল্টো বাজার চাহিদার সাথে শিক্ষার প্রাতিষ্ঠানিক দূরত্বের কারণে ‘স্কিল মিসম্যাচ’ বা দক্ষতার অমিলজনিত সংকট আরও প্রকট আকার ধারণ করেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের মতো নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলিতে সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বল ভিত্তির ওপর অতিরিক্ত কারিগরি প্রশিক্ষণের চাপ আদতে কোনো টেকসই সমাধান আনে না। যেহেতু বর্তমানের আধুনিক কর্মক্ষেত্র অত্যন্ত দ্রুত পরিবর্তনশীল, তাই তরুণদের কোনো নির্দিষ্ট মেকানিক্যাল কাজের ফ্রেমে বন্দি না করে এমনভাবে প্রস্তুত করতে হবে যাতে তারা পরিবর্তিত সময়ের সাথে সাথে যেকোনো নতুন প্রযুক্তি ও দক্ষতা সহজে আয়ত্ত করতে পারে এবং নিজেদের কাজের উপযোগী করে পুনর্গঠিত করার মানসিকতা অর্জন করে। সুতরাং, ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করার যে দীর্ঘমেয়াদি স্বপ্ন সরকার দেখছে, তার সফল বাস্তবায়ন সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করছে এই বিশাল শিক্ষিত ও বেকার যুবসমাজকে কার্যকরভাবে কাজে লাগানোর ওপর। কিন্তু বর্তমানের ১ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাওয়া বিশাল রাজস্ব ঘাটতি এবং মেগা প্রকল্পের খরচ মেটাতে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের অতিরিক্ত ঋণ গ্রহণের ফলে বেসরকারি খাতের ঋণ পাওয়ার সক্ষমতা সংকুচিত হচ্ছে। ডলার সংকটের কারণে কাঁচামাল আমদানি বাধাগ্রস্ত হওয়া এবং ক্রমবর্ধমান উৎপাদন খরচের চাপে বড় উদ্যোক্তারা যেখানে নতুন কর্মী নিয়োগ স্থগিত রেখেছেন, সেখানে কেবল প্রণোদনা প্যাকেজের ওপর নির্ভর করে বেকারত্ব দূর করা যাবে না। বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী দিনের বাজেটের আসল সফলতা কাগজের উন্নয়ন বা ব্যয়ের অঙ্কে নয়, বরং বাস্তবে কত লাখ বেকার তরুণের হাতে নতুন চাকরির নিয়োগপত্র পৌঁছাল—তার ওপরই নির্ধারিত হবে; অন্যথায় এই পুঞ্জীভূত বেকারত্বের সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপ দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারকে বড় ধরনের অগ্নিপরীক্ষার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেবে।











