পিতা হিসেবে যেমন ছিলেন নবীজি (স:)

অনলাইন ডেস্ক :

একজন পিতা সন্তানের জীবনের প্রথম শিক্ষক, প্রথম আশ্রয় এবং আদর্শ। আজকের সমাজে পিতার ভূমিকা অনেক ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে শুধু উপার্জনের মধ্যে। সন্তানকে সঠিক ভালোবাসা, নৈতিক দিকনির্দেশনা এবং আদর্শিক অনুপ্রেরণা দেয়ার পরিবর্তে অনেকে হয়ে উঠেছেন কঠোর, দূরত্ব সৃষ্টি করা অভিভাবক। অথচ মানবতার শ্রেষ্ঠ শিক্ষক ও মহান আদর্শ নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন এক অনন্য পিতা, যিনি ভালোবাসা, করুণা ও শিক্ষার মেলবন্ধনে গড়ে তুলেছিলেন আদর্শ পারিবারিক পরিবেশ। তাঁর জীবন আমাদের শেখায়-সন্তানের প্রতি ভালোবাসা মানে কেবল স্নেহ নয়, বরং তাদের আত্মা, চরিত্র ও মানবিকতাকে গঠন করা। নবি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সন্তানদের প্রতি ছিলেন অপার স্নেহময়ী। তিনি তাদের ভীষণ ভালোবাসতেন। আদর করতেন। সন্তানকে একপলক দেখার জন্য দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতেন। আনাস রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, ইবরাহীম রাযিয়াল্লাহু আনহু যখন দুধমাতার কাছে থাকতেন, তখন নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শুধু তাকে দেখার জন্য মাইলের পর মাইল হেঁটে যেতেন। তাকে কোলে তুলে নিতেন এবং চুমু খেতেন। (সহিহ মুসলিম, হাদিস:২৩১৬)

নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ছোট কন্যা ছিল, হজরত ফাতেমা রাযিয়াল্লাহু আনহু। তিনি তাকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসতেন। তিনি ফাতেমাকে ‘আমার দেহের অংশ’ বলে সম্বোধন করতেন। এবং বলতেন, যে ফাতেমাকে কষ্ট দেয়, সে যেন আমাকে কষ্ট দেয়। যখন ফাতেমা আসতেন, তিনি দাঁড়িয়ে তাকে স্বাগত জানাতেন, তার হাত ধরে চুমু দিতেন এবং নিজ আসনে বসাতেন। এই আচরণ আজকের অনেক পিতার কাছে এক বিরল উদাহরণ। বর্তমান সমাজে সন্তানদের প্রতি এমন সম্মান প্রদর্শন প্রায় হারিয়ে গেছে। সন্তানরা আজ ভয় পায় পিতার মুখোমুখি হতে। অথচ নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শিখিয়েছেন, ভালোবাসার মাধ্যমে সন্তানকে কাছে টানাই তার চরিত্র গঠনের প্রথম ধাপ। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সন্তানদের শুধু আদর করেই ক্ষান্ত হননি, বরং তাদের নৈতিকতা ও ঈমানের শিক্ষাও দিয়েছেন। একবার হজরত ফাতেমা রাযিয়াল্লাহু আনহু তার কষ্টের কারণে নবীজির কাছে গোলাম চাইলে নবীজি তাকে বললেন, তুমি আল্লাহকে ভয় কর, আল্লাহর ইবাদত কর এবং নিজের ঘরের কাজ নিজেই কর। আর যখন বিছানায় ঘুমোতে যাবে, তখন ৩৩ বার সুবহানাল্লাহ, ৩৩ বার আলহামদুলিল্লাহ, এবং ৩৪ বার আল্লাহু আকবার পড়বে। এই তাসবীহগুলো তোমার জন্য খাদেম অপেক্ষা উত্তম হবে। (সুনানে আবি দাউদ, হাদিস, ২৯৮৮)

আর যে সব পিতা সন্তানকে এসব শিক্ষা দেয়া থেকে দূরে থাকেন। তিনি তাদের সতর্ক করে বলেন, তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল। তোমাদের প্রত্যেককে তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে। (মুসলিম, হাদীস:১৮২৯)

আর যে তার দায়িত্ব আদায় না করে মৃত্যুবরণ করবে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাতকে হারাম করে দেন। (মুসলিম, হাদীস:২২৭)

অর্থাৎ একজন পিতা কেবল অর্থ উপার্জনকারী নয়, বরং সন্তানের আত্মিক পথপ্রদর্শক। আজকের অনেক পিতা সন্তানকে নামীদামি স্কুলে ভর্তি করান, আধুনিক জীবনযাপনের সুযোগ দেন, কিন্তু নৈতিকতা শেখাতে ভুলে যান। ফলে সন্তান ধীরে ধীরে হয়ে উঠে, ইসলাম বিদ্বেষী। অথচ নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শিখিয়েছেন, সন্তানের হৃদয়ে আল্লাহভীতি ও মানবতার বীজ রোপণ করতে হবে। তিনি সন্তানদের ধৈর্য, দয়া, সত্যবাদিতা, ও নম্রতা শেখাতেন। সমাজে আজ যে নৈতিক অবক্ষয় দেখা যাচ্ছে, তা মূলত পিতৃত্বের এই দায়িত্ব ভুলে যাওয়ার ফল। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সন্তানদের সংশোধনের উদ্দেশ্যে, কখনো কখনো তাদের শাসন করতেন। সিরাতের বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য গ্রন্থে আছে-একদিন হযরত রুকাইয়া রাযিআল্লাহু আনহু, হযরত ওসমান রাযিয়াল্লাহু আনহুর প্রতি অসন্তুষ্ট হয়ে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট নালিশ করতে আসেন, নবীজি তাকে বললেন, মহিলারা তাদের স্বামীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করবে এটা আমি মোটেই পছন্দ করি না। যাও নিজ বাড়িতে ফিরে যাও। (আওজাযুস সিয়ার বরাতে সিরাতে খাতামুল আম্বিয়া, পৃষ্ঠা:২৮)

এই হাদিস আজকের পিতাদের জন্য অনুসরণীয় ও পালনীয়। আজকের সমাজের কিছু পিতা যারা তাদের মেয়েদের থেকে তার স্বামীর বিরুদ্ধে সাধারণ থেকে সাধারণ অভিযোগ শুনে ক্ষুব্ধ হন। এবং কোনো কিছু না ভেবেই স্বামীর সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন। ফলে এটাকে কেন্দ্র করে তাদের মাঝে ফাটল সৃষ্টি হয়। এবং এক পর্যায়ে তা ডিভোর্সে রূপ নেয়। হয়তো পিতা এভাবে তাদের মাঝে হস্তক্ষেপ না করলে সম্পর্কটি অটুট থাকতো। ছিন্ন হতো না। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন, ন্যায়বিচারে অটল। তিনি কখনও সন্তানদের মধ্যে পক্ষপাত করেননি। তাঁর কন্যাদের তিনি সমান ভালোবাসতেন, সমান সম্মান দিতেন। সমাজে আজও পুত্রসন্তানকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়, কন্যাকে অবহেলা করা হয়। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই ধারণা ভেঙে দিয়ে দেখিয়েছেন-কন্যাও পিতার জন্য সম্মানের ও জান্নাতের পথ। তিনি বলেছেন, যে ব্যক্তি দু’জন কন্যা সন্তানকে প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়া পর্যন্ত লালন করবে কেয়ামত দিবসে আমি এবং সে এমন ভাবে থাকবো। কথাটি বলে মহানবী নিজ আঙ্গুল কে মিলিয়ে একত্রিত করে দেখান (সহিহ মুসলিম)

এই দৃষ্টান্ত বর্তমান সমাজের জন্য গভীর বার্তা বহন করে। আজকের পিতারা যদি নবীজির মতো কন্যাকে মর্যাদা দেন, তবে সমাজে নারী অবমাননা, যৌতুক, এবং লিঙ্গ বৈষম্যের মতো কুপ্রথা অনেকাংশে দূর হবে। আজকের সমাজে প্রযুক্তি ও ব্যস্ততার ভিড়ে পিতা-সন্তান সম্পর্ক দূরত্বে ঠেকে গেছে। সন্তান পায় না পিতার সময়, পিতাও সন্তানের অন্তর্দুনিয়া বোঝার চেষ্টা করেন না। ফলে সন্তান মানসিকভাবে একাকী হয়ে পড়ছে, ভুল পথে যাচ্ছে। এই সংকটের সমাধান একমাত্র নবীজীর আদর্শ। সব শেষে বলি, নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জীবন পিতৃত্বের এক পরিপূর্ণ দৃষ্টান্ত। তিনি ছিলেন এমন এক পিতা যিনি সন্তানকে শুধু ভালোবাসেননি, বরং তাদের মাধ্যমে সমাজ ও মানবতার আদর্শ স্থাপন করেছেন। আজকের পিতাদের জন্য তার জীবন এক আলোকবর্তিকা। যদি আমরা নবীজির পিতৃত্বের শিক্ষা গ্রহণ করি, ভালোবাসা, ধৈর্য, ন্যায় ও নৈতিকতার চর্চা করিতবে পরিবার হবে স্নেহ ও শান্তির আশ্রয়স্থল, সমাজও ফিরে পাবে মানবতার আলো। নবীজির মতো পিতা হতে পারলেই প্রকৃত অর্থে আমরা গড়ে তুলতে পারব, একটি আদর্শ প্রজন্ম। যারা পৃথিবীতে আল্লাহর প্রতিনিধি হিসেবে সত্য, ন্যায় ও ভালোবাসার বার্তা ছড়াবে।