বাবার বাড়ি থেকে নাস্তা কম আসায় অন্তঃসত্ত্বা গৃহবধূকে নির্যাতন, আইসিইউতে ৯ দিন লড়াইয়ের পর মৃত্যু

অনলাইন ডেস্ক:

চট্টগ্রামের পটিয়ায় বাবার বাড়ি থেকে আনা নাস্তা কম দেওয়ার অজুহাতে শ্বশুরবাড়িতে অমানুষিক নির্যাতনের শিকার তিন মাসের অন্তঃসত্ত্বা গৃহবধূ সিফাতুন নূর অবশেষে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। গত ১৪ অক্টোবর গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে (আইসিইউ) ভর্তি করা হয় এবং টানা ৯ দিন সেখানে লড়াইয়ের পর গতকাল শুক্রবার তার মৃত্যু হয়।

নিহতের স্বজনদের জোরালো দাবি, সিফাতুন নূর তিন মাসের অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় এই নিষ্ঠুরতার শিকার হন। তাদের পৈতৃক নিবাস চট্টগ্রামের চন্দনাইশ পৌরসভা এলাকায়। প্রায় চার মাস আগে পারিবারিকভাবে পটিয়ার পূর্ব কুসুমপুরা গ্রামের দুবাইপ্রবাসী তারেকের সঙ্গে সিফাতুনের বিয়ে হয়েছিল।

পরিবারের অভিযোগ, বিয়ের পর থেকেই যৌতুকের দাবিতে সিফাতুনকে নিয়মিত নির্যাতন করা হতো। ঘটনার দিন খাবার বা নাস্তা কম দেওয়ার অভিযোগ তুলে প্রথমে তার মা এবং শাশুড়ির মধ্যে বাক্‌বিতণ্ডা শুরু হয়, যা মুহূর্তের মধ্যে শারীরিক নির্যাতনে রূপ নেয় বলে দাবি তাদের। এই মর্মান্তিক ঘটনায় নিহতের বাবা বাদী হয়ে মামলা দায়ের করার পর পুলিশ অভিযুক্ত শাশুড়ি রিজিয়া বেগমকে আটক করেছে, তবে মারধরের অভিযোগে জড়িত অন্যান্য আসামিরা এখনও পলাতক রয়েছেন।

গত ১৪ অক্টোবর রাত ৯টার দিকে সিফাতুন নূর ও তার মায়ের সঙ্গে শাশুড়ির ধস্তাধস্তির একটি দৃশ্য বাড়ির সিসিটিভি ক্যামেরায় ধরা পড়ে। ওই ভিডিও ফুটেজে ঘটনার সময়কার উত্তপ্ত পরিস্থিতি স্পষ্ট দেখা গেছে বলে জানিয়েছে পরিবার। এছাড়া, ক্যামেরার ফুটেজ ধারণের কিছুক্ষণ পরই নিজের মেয়েকে মেরে ফেলা হয়েছে মর্মে মায়ের বুকফাটা আর্তনাদ ও বিলাপ করতে শোনা যায়।

ঘটনার প্রায় এক ঘণ্টা পর অত্যন্ত গুরুতর ও সংকটাপন্ন অবস্থায় সিফাতুনকে শ্বশুরবাড়ি থেকে দ্রুত বের করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। পরবর্তীতে তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি করা হয় এবং সেখানে একটানা ৯ দিন মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ার পর তার মৃত্যু ঘটে।

নিহতের পরিবারের ভাষ্যমতে, ঘটনার রাতে সিফাতুনের জন্য নাস্তা নিয়ে তার মা মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে গিয়েছিলেন। কিন্তু নাস্তা পরিমাণে কম আনা হয়েছে—এমন অজুহাত তুলে শাশুড়ি তর্কে জড়িয়ে পড়েন এবং পরিস্থিতি মুহূর্তেই জটিল করে তোলেন, যার পরিণতিতে এই পৈশাচিক মারধরের ঘটনা ঘটে বলে দাবি স্বজনদের।

নিহতের এক স্বজন অভিযোগের সুর চড়িয়ে জানান, শ্বশুরবাড়ির লোকজনের চাহিদার কোনো অন্ত ছিল না এবং তারা বিভিন্ন সময় নানা জিনিসপত্র দাবি করত। তিনি বলেন, “দুইটা কলসি দিছি, কয় আরেকটা কলসি। ফার্নিচার দিছি, কয় আরেকটা আলমারি দিতে কয়। এই ধরনের চাওয়ার কোনো শেষ নাই। ৪০০ নাস্তা নিয়াও তাদের মন ভরে নাই।”

ওই স্বজনের আরও গুরুতর অভিযোগ, ঘটনার রাতে মুঠোফোনে পূর্বপরিকল্পিত আলোচনার মাধ্যমে তার মেয়েকে নির্যাতন করা হয়েছে। যদিও এসব চাঞ্চল্যকর অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্তদের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।

সিফাতুনের মর্মান্তিক মৃত্যুর পর তার স্বামীর পক্ষ থেকে এটি আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্বজনেরা। স্বামীর এহেন দাবি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়ে তারা জোরালো প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের মতে, সিফাতুন যদি নিজে নিজেই আত্মহত্যা করতেন, তবে তাকে এভাবে হাসপাতালে ৯ দিন আইসিইউতে চিকিৎসাধীন রাখার কোনো প্রয়োজনই হতো না।

নিহতের একজন স্বজন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “মেয়ের জামাই বলতেছে, উনি নিজে নিজে সুইসাইড করছে। মেয়ে যদি নিজে নিজে সুইসাইড করতো, তাহলে এতগুলা করার দরকার নাই, উনি ফাঁসিতে ঝুলে মরে যাইতো। উনি ১০ দিন কীভাবে বেঁচে থাকল আইসিইউতে? উনাকে ঝুলানো হয়েছে, এটা একটা নাটক সাজানো হচ্ছে।”

এই সার্বিক বিষয়ে পটিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জিয়াউল হক টেলিফোনে গণমাধ্যমকে জানান, তাদের পারিবারিক পর্যায়ে মনোমালিন্য ছিল। একটি সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ গতকাল পুলিশের হাতে এসেছে। ঘটনার আগে বা পরে গৃহবধূকে আঘাত করা হয়েছিল কিনা, তা সম্পূর্ণভাবে চিকিৎসকদের ময়নাতদন্ত ও অন্যান্য প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পরই নিশ্চিত করে বলা সম্ভব হবে। পাশাপাশি তিনি জানান যে, এই ঘটনায় প্রচলিত আইনগত প্রক্রিয়া অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।