নিজস্ব প্রতিবেদক:
বৈশ্বিক বাজারের সংকোচন এবং অভ্যন্তরীণ নানা সীমাবদ্ধতার কারণে দেশের সামগ্রিক রপ্তানি আয়ে বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে, যার প্রধান উৎস তৈরি পোশাকের চালান কমে যাওয়া। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত মে মাসে দেশের সামগ্রিক রপ্তানি আয় আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৭ শতাংশ হ্রাস পেয়ে ৪ দশমিক ৪০ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছিল। এই পতনের মূল কারণ মে মাসে তৈরি পোশাক রপ্তানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৮ দশমিক ২৯ শতাংশ কমে ৩ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়ায়। সামগ্রিক চিত্রটি আরও স্পষ্ট হয় ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে মে পর্যন্ত ১১ মাসের হিসাবে, যেখানে দেশের মোট রপ্তানি আয় ২ দশমিক ৫৫ শতাংশ কমেছে এবং তৈরি পোশাক রপ্তানি ৩৬ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন ডলার থেকে ৩ দশমিক ৪১ শতাংশ কমে ৩৫ দশমিক ৩১ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসে। টানা আট মাস পতনের পর এপ্রিলে কিছুটা ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত মিলেছিল, তবে মে মাসের এই পতন প্রমাণ করে যে বৈশ্বিক বাজারের অস্থিরতা ও অভ্যন্তরীণ সংকট কতটা গভীর, যা জুন মাসেও উদ্যোক্তাদের উদ্বেগের মধ্যে রেখেছে। এই সামগ্রিক মন্দার সবচেয়ে বড় আঘাতটি আসে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের প্রধান গন্তব্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাজারে। ইউরোস্ট্যাটের সামপ্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি-এপ্রিল সময়ে ইইউর সামগ্রিক পোশাক আমদানি যেখানে ১০ দশমিক ৪২ শতাংশ কমেছে, সেখানে বাংলাদেশ থেকে আমদানি কমেছে রেকর্ড ১৯ দশমিক ৩৩ শতাংশ, যা বৈশ্বিক গড় পতনের প্রায় দ্বিগুণ। এই চার মাসে ইইউর বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের আমদানি ৭ দশমিক ৫৪ বিলিয়ন ইউরো থেকে কমে ৬ দশমিক ০৯ বিলিয়ন ইউরোতে নেমে এসেছে। এপ্রিল মাসের একক চিত্রও চরম উদ্বেগজনক, যেখানে ২০২৫ সালের এপ্রিলের তুলনায় ২০২৬ সালের এপ্রিলে বাংলাদেশ থেকে ইইউর আমদানি ১৯ দশমিক ৫৩ শতাংশ কমে ১ দশমিক ৪৯ বিলিয়ন ইউরোতে দাঁড়িয়েছে। অথচ একই বাজারে প্রধান প্রতিযোগী দেশ চীন এপ্রিলে ৮ দশমিক ০৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে এবং চার মাসের হিসাবে তাদের পতন ছিল মাত্র ৪ দশমিক ৭০ শতাংশ, যা বাংলাদেশের তুলনায় চার গুণ কম। শুধু মূল্যের দিক থেকেই নয়, পরিমাণের দিক থেকেও বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়েছে; জানুয়ারি-এপ্রিল সময়ে ইইউ বাংলাদেশ থেকে ৪৩৫ দশমিক ৯৭ মিলিয়ন কেজি পোশাক আমদানি করেছে, যা আগের বছরের চেয়ে ৯ দশমিক ৯১ শতাংশ কম। এর চেয়েও বড় ভয়ের কারণ হলো, বাংলাদেশি পোশাকের গড় ইউনিট মূল্য প্রতি কেজিতে ১৫ দশমিক ৫৯ ইউরো থেকে ১০ দশমিক ৪৫ শতাংশ কমে ১৩ দশমিক ৯৬ ইউরোতে নেমে এসেছে, যেখানে ভিয়েতনামের ইউনিট মূল্য উল্টো ৬ দশমিক ৯০ শতাংশ বেড়েছে। ইউরোপের বাজারের এই বিপর্যয়কর পরিস্থিতির বিপরীতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি তীব্র দ্বিমুখী চাপের মুখোমুখি হলেও তুলনামূলকভাবে কিছুটা শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পেরেছিল। ২০২৬ সালের প্রথম চার মাসে (জানুয়ারি-এপ্রিল) যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশ ২ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি করে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১১ দশমিক ২৪ শতাংশ কম। যদিও এটি একটি নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি, তবে স্বস্তির বিষয় হলো এই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের মোট পোশাক আমদানি বাজার যেখানে ১২ শতাংশ সংকুচিত হয়েছে, সেখানে বাংলাদেশের পতন বাজারের গড় সংকোচনের চেয়ে কিছুটা কম। ওটেক্সার তথ্য অনুযায়ী, কঠিন বৈশ্বিক পরিস্থিতির মধ্যেও সোর্সিং বাজারে বাংলাদেশ ভিয়েতনামের পরেই দ্বিতীয় অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। তবে এই বাজারেও দুর্বলতার লক্ষণগুলো স্পষ্ট, কারণ পরিমাণগতভাবে রপ্তানি কমেছে ৯ দশমিক ০১ শতাংশ এবং তীব্র প্রতিযোগিতার কারণে ইউনিট মূল্য কমেছে ২ দশমিক ৪৫ শতাংশ। ভিয়েতনাম যেখানে মাত্র ১ দশমিক ৩৫ শতাংশ মূল্য হ্রাসের মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছে এবং চীন তাদের বাজার টিকিয়ে রাখতে ১৯ দশমিক ৬৯ শতাংশের বিশাল মূল্যপতন ঘটিয়েছে, সেখানে বাংলাদেশ মাঝামাঝি অবস্থানে থেকে স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে যে আমাদের সরবরাহ সক্ষমতা থাকলেও পণ্যের মূল্য বা মুনাফার মার্জিন ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারের এই দ্বিমুখী চাপের প্রভাব সরাসরি পড়েছে তৈরি পোশাক খাতের প্রকৃত আয় বা অভ্যন্তরীণ মূল্য সংযোজনের (ঠধষঁব অফফরঃরড়হ) ওপর। বাংলাদেশ ব্যাংকের ত্রৈমাসিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, টানা দুই প্রান্তিকে বৃদ্ধির পর ২০২৫-২৬ অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) তৈরি পোশাকের মূল্য সংযোজন কমে ৬১ দশমিক ৩৫ শতাংশে নেমে আসে, যা আগের অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকে ছিল প্রায় ৬৪ শতাংশ। এই প্রান্তিকে মোট ৯১৯ কোটি ৭৮ লাখ ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানির বিপরীতে কাঁচামাল আমদানি করতেই ব্যয় হয়েছে ৩৫৫ কোটি ৫১ লাখ ডলার। দ্বিতীয় প্রান্তিকের তুলনায় এই তিন মাসে পোশাক রপ্তানি ৫৫ কোটি ডলার কমেছে, অথচ কাঁচামাল আমদানি উল্টো ৬ কোটি ৭৩ লাখ ডলার বৃদ্ধি পেয়েছে। অতীতে ইপিবির তথ্য বিভ্রাটের কারণে মূল্য সংযোজন কৃত্রিমভাবে ৭০ থেকে ৭২ শতাংশ দেখানোর যে ভুল ছিল, তা সংশোধনের পর দেখা যাচ্ছে যে গত দুই অর্থবছরে প্রকৃত মূল্য সংযোজন ৬০ ও ৫৯ শতাংশের ঘরেই ঘুরপাক খাচ্ছিল, যা ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে গড়ে ৬২ শতাংশে দাঁড়ায়। কাঁচামালের আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং তৈরি পোশাকের রপ্তানি মূল্য কমে যাওয়ার এই প্রবণতা প্রমাণ করে যে স্থানীয়ভাবে শিল্পের প্রকৃত মুনাফা ধরে রাখার সক্ষমতা ক্রমান্বয়ে হ্রাস পাচ্ছে। এই বহুমাত্রিক সংকটের পেছনে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক চার ধরনের প্রধান কাজ করছে বলে মনে করছেন খাত সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। প্রথমত, পুরো ইউরোপ ও আমেরিকায় চলমান অর্থনৈতিক মন্দা ও উচ্চ মূল্যস্ফীতি ভোক্তাদের পোশাক কেনার সাধারণ বাজেট কমিয়ে দিয়েছে, যা বৈশ্বিক আমদানিকে সংকুচিত করেছে। দ্বিতীয়ত, প্রধান প্রতিযোগী দেশ চীনের সুউন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, অত্যন্ত কম ‘লিড টাইম’ বা দ্রুত পণ্য পৌঁছানোর ক্ষমতা এবং আগ্রাসী বাজার নীতির কারণে আন্তর্জাতিক বায়াররা বাংলাদেশের চেয়ে চীনের দিকে বেশি ঝুঁকছেন। তৃতীয়ত, স্বল্পোন্নত দেশ বা এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন নিয়ে বায়ারদের মনে এক ধরনের ভবিষ্যৎ শুল্ক নীতি সংক্রান্ত ধোঁয়াশা ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, যার ফলে তারা ঝুঁকি এড়াতে বিকল্প দেশের দিকে ক্রয়াদেশ সরিয়ে নিচ্ছেন। চতুর্থত এবং সবচেয়ে বড় কারণ হলো বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ অবকাঠামোগত প্রতিবন্ধকতা। তীব্র গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট, ডলারের বিনিময় হারের অস্থিরতা, ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদহার এবং কাঁচামাল আমদানিতে এলসি খোলার জটিলতার কারণে অনেক কারখানা বাধ্য হয়ে লোকসান দিয়ে কম দামে অর্ডার নিচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে এই শিল্পের স্থায়িত্বকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে। তবে এই ঘন কালো মেঘের মধ্যেও দেশের রপ্তানি খাতে কিছু আশার আলো এবং নতুন সম্ভাবনার দুয়ার উন্মোচিত হচ্ছে। তৈরি পোশাকের বাইরে ওষুধ, প্লাস্টিক, চামড়া, পাটজাত পণ্য এবং হোম টেক্সটাইল খাতে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেশের রপ্তানি বহুমুখীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। একই সাথে স্পেন, নেদারল্যান্ডস, পোল্যান্ড, কানাডা, চীন ও সৌদি আরবের মতো বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি বৃদ্ধি পেয়েছে। সবচেয়ে বড় আশার খবর হলো, আসিয়ান (অঝঊঅঘ) বাজারে বাংলাদেশের পোশাক খাতের জন্য এক নতুন দুয়ার খুলছে। জুনের ২৫ থেকে ২৭ তারিখ পর্যন্ত মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক অ্যাপারেল অ্যান্ড টেক্সটাইল এক্সিবিশন (এটেক্স) ২০২৬-এ প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ অংশ নেয়, যেখানে দেশের বিশ্বমানের নিটওয়্যার, পরিবেশবান্ধব ও গ্রিন ফ্যাক্টরির সক্ষমতা আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সামনে সফলভাবে তুলে ধরা হয়। মালয়েশিয়ায় বর্তমানে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি বার্ষিক প্রায় ২০০ মিলিয়ন ডলার হলেও এই অঞ্চলের বাজার সমপ্রসারণের বিশাল সুযোগ রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শুধু কম দামের গতানুগতিক সুতি কাপড়ের প্রতিযোগিতায় আটকে না থেকে যদি কৃত্রিম তন্তু বা ম্যান-মেড ফাইবারের পোশাক উৎপাদন বাড়ানো যায়, প্রযুক্তি ও ডিজাইনে বিনিয়োগ করা হয় এবং নতুন সরকারের নীতি সহায়তায় অভ্যন্তরীণ গ্যাস-বিদ্যুৎ ও ব্যাংকিং খাতের জটিলতা দূর করা যায়, তবে বাংলাদেশ অবশ্যই এই বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ সংকট কাটিয়ে আবারও টেকসই ইতিবাচক প্রবৃদ্ধির ধারায় ফিরে আসবে।











