মতামতের ভিত্তিতে বিধিমালা সংস্কার করছে ইসি

নিজস্ব প্রতিবেদক:

স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে একটি যুগান্তকারী পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন (ইসি)। তাদের লক্ষ্য হলো এক বছরের মধ্যে ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ ও সিটি করপোরেশনসহ সব স্তরের স্থানীয় নির্বাচন সম্পন্ন করা এবং তা হবে সম্পূর্ণ নির্দলীয়, কোনো দলীয় প্রতীক ছাড়াই। কমিশনের শীর্ষ পর্যায় এটিকে তাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হিসেবে ঘোষণা করেছে। কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার স্পষ্ট করেছেন, এক বছরের মধ্যে সব স্থানীয় নির্বাচন শেষ করাই তাদের মূল লক্ষ্য। একই সময়ে স্থানীয় সরকার মন্ত্রীও জেলা প্রশাসক সম্মেলনে একই প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, সারা দেশের সব স্তরের স্থানীয় সরকার নির্বাচন শেষ করতে সাধারণত ১০ মাস থেকে এক বছর সময় লাগে। যেহেতু এই নির্বাচনগুলো ধাপে ধাপে অনুষ্ঠিত হয়, তাই পুরো প্রক্রিয়াটি সফল করতে দীর্ঘ প্রস্তুতি ও প্রশাসনিক সমন্বয়ের প্রয়োজন হয়। এবারের স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর সম্পূর্ণ নির্দলীয় রূপ। কোনো দলীয় প্রতীক বা রাজনৈতিক পরিচয় থাকবে না। এই পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে বিধিমালা সংস্কার। নির্বাচন কমিশন বিদ্যমান আইন ও বিধি পর্যালোচনা করে দলীয় প্রতীক বাদ দিয়ে নতুন খসড়া তৈরি করেছে। তবে তারা কেবল নিজেদের সিদ্ধান্তে থেমে নেই; রাজনৈতিক দলগুলোর মতামত, সাধারণ নাগরিকদের পরামর্শ এবং গণমাধ্যমে বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে সংশোধনী প্রস্তাব গ্রহণের পরিকল্পনা করছে। কমিশন চাইছে একটি সর্বজনগ্রাহ্য ও বিতর্কহীন নির্বাচনী পরিবেশ তৈরি করতে। জানা গেছে, খসড়া বিধিমালা অনুমোদনের জন্য শিগগিরই কমিশন সভা আহ্বান করা হবে। অনুমোদন পেলে আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে আইনি যাচাইয়ের জন্য। ইউনিয়ন পরিষদের জন্য তৈরি করা আচরণবিধি হবে মূল কাঠামো, যার ওপর ভিত্তি করে অন্যান্য স্থানীয় সরকার নির্বাচনের বিধিমালা নির্ধারিত হবে। পুরো প্রক্রিয়া শেষ করতে তিন থেকে চার মাস সময় লাগতে পারে। পাশাপাশি প্রার্থীদের জামানতের পরিমাণ বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা চলছে, যা নির্বাচনী শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সহায়ক হবে। তবে এই বিশাল পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। জাতীয় বাজেট ঘোষণা, বর্ষা মৌসুম ও মাঠ প্রশাসনের প্রস্তুতি- সবকিছু মিলিয়ে সময়সূচি নির্ধারণে সতর্কতা অবলম্বন করতে হচ্ছে। বর্ষাকালে ভোট গ্রহণ দুরূহ হয়ে পড়ে, তাই প্রাকৃতিক বাস্তবতা মাথায় রেখে ধাপে ধাপে নির্বাচন আয়োজন করা হবে। কমিশন জানিয়েছে, তারা কোনো তাড়াহুড়ো করবে না; সব দিক বিচার-বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নেবে। এদিকে, রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার বিষয় হলো, দলীয় নেতাকর্মীরা কীভাবে অংশ নেবেন। কমিশন বলছে, আইনগতভাবে যাদের ওপর কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই তারা অংশ নিতে পারবেন। তবে গুরুতর মামলার আসামি বা বিশেষ আইনে অভিযুক্তদের ক্ষেত্রে আলাদা ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কমিশন স্পষ্ট করেছে, আইনের চোখে সবাই সমান এবং কোনো রাজনৈতিক দলের অফিস বেয়ারার হলেও যদি তার বিরুদ্ধে গুরুতর মামলা থাকে তবে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কমিশন সবশেষে বার্তা দিয়েছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলো যেন অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ এবং আন্তর্জাতিক মানের হয়। জাতীয় নির্বাচনের মতোই উচ্চ মান বজায় রাখা হবে। প্রযুক্তির ব্যবহার, আইনি কঠোরতা ও প্রশাসনিক সমন্বয়ের মাধ্যমে তারা একটি শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে ভোট আয়োজন করতে চায়। দলীয় প্রতীক না থাকায় এবার ভোটে রাজনৈতিক দাপট কমবে এবং জনগণ তাদের স্থানীয় নেতৃত্ব বেছে নিতে আরও স্বাধীনতা পাবে। কমিশন বিশ্বাস করে, দলীয় প্রতীক বাদ দিলে স্থানীয় নির্বাচনে প্রতিযোগিতা হবে ব্যক্তিগত যোগ্যতা ও জনপ্রিয়তার ভিত্তিতে, যা গণতন্ত্রকে তৃণমূল স্তরে আরও সুসংহত করবে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এই সুবিশাল নির্বাচনী মহাযজ্ঞের চূড়ান্ত বাস্তবায়ন নির্ভর করছে স্থানীয় সরকার বিভাগ এবং নির্বাচন কমিশনের মধ্যকার আনুষ্ঠানিক যোগাযোগের ওপর। আইন অনুযায়ী, নির্বাচনের চূড়ান্ত তারিখ নির্ধারিত হওয়ার অন্তত ৪৫ দিন আগে নির্বাচন কমিশন আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনী তফসিল ঘোষণা করে থাকে। এই তফসিল ঘোষণার পুরো বিষয়টি স্থানীয় সরকার বিভাগের আনুষ্ঠানিক চিঠির ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। স্থানীয় সরকার মন্ত্রী ইতিপূর্বে অক্টোবর মাসে নির্বাচন প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, তবে নির্বাচন কমিশনের টেবিলে এখনো এই সংক্রান্ত কোনো আনুষ্ঠানিক চিঠি এসে পৌঁছায়নি। ইসি সচিবের মতে, মন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী যদি অক্টোবর মাসকেই লক্ষ্য ধরা হয়, তবে কমিশনের প্রশাসনিক বা প্রস্তুতিমূলক কোনো খামতি থাকবে না। তারা নিজস্ব গতিতে আইন সংশোধন, ভোটার তালিকা ও ভোটকেন্দ্রের প্রস্তুতি গুছিয়ে নিচ্ছেন। আনুষ্ঠানিক চিঠি পাওয়ার সাথে সাথেই কমিশন তাদের চূড়ান্ত রোডম্যাপ প্রকাশ করবে এবং কোন তারিখে কোন অঞ্চলের মানুষ তাদের স্থানীয় নেতৃত্ব বেছে নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন তা স্পষ্ট হবে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই পুরো প্রক্রিয়া বাংলাদেশের গণতন্ত্রে একটি নতুন অধ্যায় সূচনা করতে পারে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে নির্দলীয় করার মাধ্যমে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রভাব কমবে এবং জনগণ তাদের প্রতিনিধিকে বেছে নিতে আরও স্বাধীনতা পাবে। একই সঙ্গে নির্বাচনী শৃঙ্খলা বজায় রাখতে জামানত বৃদ্ধি, আচরণবিধি কঠোর করা এবং প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো হলে নির্বাচন আরও স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য হবে। কমিশন আশাবাদী যে, এই উদ্যোগ দেশের নির্বাচন ব্যবস্থাকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করবে এবং গণতন্ত্রকে তৃণমূল স্তরে আরও শক্তিশালী করবে।