অনলাইন ডেস্ক:
ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার ও নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ভোট কারচুপির গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী। রোববার (১ নভেম্বর) দিল্লির রামলীলা ময়দানে বিরোধী জোটের আয়োজিত এক সমাবেশে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারসহ নরেন্দ্র মোদি ও অমিত শাহকে সরাসরি আক্রমণ করেন তিনি। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনসহ একাধিক নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ এনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার জোরালো দাবি জানান কংগ্রেস নেতা। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে সতর্ক করে তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, নিজেদের যতই শক্তিশালী মনে করুন না কেন, তারা দেশের সংবিধানের ঊর্ধ্বে নন।
রাজধানীর রামলীলা ময়দানে বিরোধী জোটের পূর্বঘোষিত এই বিশাল সমাবেশে বক্তব্য রাখতে গিয়ে রাহুল গান্ধী ঘোষণা দেন যে, প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে পদ থেকে অপসারণ করার পরই তাদের মূল টার্গেট হবেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। সমাবেশে উপস্থিত হাজার হাজার নেতাকর্মীর সামনে দেশের শীর্ষ এই দুই রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের ক্ষমতার উৎস নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি।
বক্তব্যে রাহুল গান্ধীর সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছিল, নির্বাচন কমিশনের সরাসরি সহযোগিতা ও মদদ ছাড়া নরেন্দ্র মোদির পক্ষে প্রধানমন্ত্রী এবং অমিত শাহের পক্ষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হওয়া একেবারেই সম্ভব হতো না। অত্যন্ত সুকৌশলে নির্বাচনি প্রক্রিয়ায় গুরুতর অনিয়মের পথ তৈরি করে বর্তমান সরকার নিজেদের ক্ষমতায় থাকার সুযোগ নিশ্চিত করেছে বলেও জোরালো দাবি করেন এই শীর্ষ বিরোধী নেতা।
দিল্লির ওই সমাবেশে ভোটার তালিকা থেকে সুপরিকল্পিতভাবে বিপুলসংখ্যক সাধারণ মানুষের নাম কেটে বাদ দেওয়ার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেন রাহুল। তার চাঞ্চল্যকর দাবি অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন রাজ্যে ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে প্রায় ১৫ শতাংশ ভোটারের নাম ভোটার তালিকা থেকে সম্পূর্ণ মুছে ফেলা হয়েছে। এই ধরনের ঘটনাকে সাধারণ বা স্বাভাবিক কোনো অনিয়ম হিসেবে দেখতে নারাজ তিনি। তার মতে, এ ধরনের ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড সরাসরি রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল এবং এটি একটি অত্যন্ত গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ।
সমাবেশের বক্তব্যে রাহুল গান্ধী কেবল একক কোনো নির্বাচনকে নয়, বরং ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের পাশাপাশি মধ্যপ্রদেশ, হরিয়ানা, ছত্তিশগড়, মহারাষ্ট্র ও কর্ণাটকের মতো গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যগুলোর বিধানসভা নির্বাচনেও অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে ব্যাপক ভোট কারচুপি করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন। দেশজুড়ে চলা এসব চাঞ্চল্যকর অভিযোগের বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের নিজস্ব ব্যাখ্যা ও অবস্থানও যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, সে কথাও তিনি তার বক্তব্যে স্মরণ করিয়ে দেন।
কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের সাম্প্রতিক একটি মন্তব্যের ধরে ধরে তার তীব্র জবাব দিয়ে রাহুল বলেন, নরেন্দ্র মোদি কোথাও যাচ্ছেন না বলে অমিত শাহ সম্প্রতি যে দাবি করেছেন, তার উপযুক্ত জবাব দেশের সাধারণ জনগণই উপযুক্ত সময়ে দেবে। নিজের রাজনৈতিক কর্মসূচির রূপরেখা টেনে তিনি জানান, প্রক্রিয়া অনুযায়ী প্রথমে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে পদ থেকে সরিয়ে তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। এরপরই মূলত নরেন্দ্র মোদি ও অমিত শাহের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার চূড়ান্ত বিষয়টি সামনে চলে আসবে।
নির্বাচনি প্রক্রিয়ায় অনিয়মের নানা অভিযোগের পাশাপাশি দেশের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক বৈষম্য, ভঙ্গুর শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থা নিয়েও অত্যন্ত জোরালোভাবে কথা বলেন কংগ্রেস নেতা। দেশের প্রভাবশালী শিল্পপতি গৌতম আদানির প্রসঙ্গ টেনে তিনি তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, দেশের যাবতীয় সম্পদ ও নিয়ন্ত্রণ গুটিকয়েক শিল্পপতির কুক্ষিগত হাতে চলে যাওয়া কোনোভাবেই উচিত নয়। দেশের সাধারণ কৃষক যেন তাদের হাড়ভাঙা পরিশ্রমের সম্পূর্ণ ন্যায্য মূল্য পান এবং প্রতিটি শিক্ষার্থী যেন নিজেদের যোগ্যতার ভিত্তিতে প্রকৃত সুযোগ পায়, এমন একটি বৈষম্যহীন ভারত গড়ার দৃঢ় পক্ষে নিজের অবস্থান ব্যক্ত করেন তিনি।
রাহুল গান্ধী আরও বলেন, দেশের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থা যদি ধীরে ধীরে নির্দিষ্ট কয়েকজন বিত্তশালী শিল্পপতির পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে চলে যায়, তবে দিনশেষে সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হবে। একটি কল্যাণ রাষ্ট্রে দেশের প্রত্যেক নাগরিকের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করার আবশ্যিকতার ওপরও তিনি বিশেষভাবে জোর দেন।
রামলীলা ময়দানের এই মহাসমাবেশের একেবারে শেষ পর্যায়ে নিজের মূল রাজনৈতিক দর্শন ও অবস্থান তুলে ধরে রাহুল বলেন, দেশের সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের কণ্ঠস্বরই তার রাজনৈতিক জীবনের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিরোধী জোট ঘৃণা, বিভাজন ও সহিংসতার রাজনীতিতে কখনোই বিশ্বাস করে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, তবে দেশের পবিত্র সংবিধান রক্ষার প্রশ্নটি এলে সেখানে বিন্দুমাত্র আপস করা হবে না।
দিল্লির রামলীলা ময়দানে অনুষ্ঠিত এই বিশাল সমাবেশে বিরোধী জোটের অন্যান্য শীর্ষস্থানীয় নেতারাও উপস্থিত ছিলেন। সমাবেশে তারা সকলেই নির্বাচন কমিশনের চরম পক্ষপাতিত্ব, ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়ায় অনিয়ম এবং সামগ্রিক নির্বাচনি ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের তীব্র সমালোচনা করেন। বিরোধী জোটের এই হাই-ভোল্টেজ সমাবেশকে কেন্দ্র করে সমগ্র দিল্লি জুড়ে পুলিশ ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে ব্যাপক ও কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছিল।











