ক্রমাগত হত্যাকাণ্ডে নাজুক হচ্ছে দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি

নিজস্ব প্রতিবেদক:

ক্রমাগত হত্যাকাণ্ডে নাজুক হচ্ছে দেশের আইন-শৃৃঙ্খলা পরিস্থিতি। আধিপত্য বিস্তার, মাদক কারবার, পারিবারিক কলহ ও জমি সংক্রান্ত বিরোধে সাম্প্রতিকে সময়ে দেশে খুনের ঘটনা ঘটছে। একদিনে দেশের ৫ জেলায় ১০টি হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনাও ঘটেছে। নতুন সরকার গঠনের পরে সারাদেশে গত মার্চ মাসেই ৩১৭টি খুনের ঘটনা ঘটেছে। তার মধ্যে রাজধানীতেই ২৪ জন খুন হয়েছে। তবে চট্টগ্রামে সব থেকে বেশি কিলিং হয়েছে। সেখানে মার্চ মাসে খুন হয়েছে রেকর্ড পরিমাণ ৬১ জন। ঢাকায় অপহরণের শিকার হয়েছে ২০ জন। আর সারাদেশে ১০২টি। নারী ও শিশু নিপীড়নের ঘটনা ঘটেছে ১ হাজার ৪৮৫টি। তার মধ্যে ঢাকায় ১১১টি। এছাড়া ২৮৫টি সিঁধেল চুরিসহ, ডাকাতি, ছিনতাই দস্যুতার ঘটনায় ৬৩৭টি মামলা রেকর্ড হয়েছে। অথচ গত ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচনের মাসে ঢাকায় ১৬ খুনসহ সারাদেশে আড়াইশর অধিক হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। ওই মাসে ঢাকায় এক ডজনসহ সারাদেশে ৬৪টি অপহরণের ঘটনা ঘটেছে। নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ছিলো ১ হাজার ১৮১টি। তাছাড়া এক হাজারের বেশি চুরি, ডাকাতি ও দস্যুতার মামলা হয়েছে। তবে থানায় রেকর্ডকৃত মামলার চেয়ে প্রকৃত সংখ্যা আরো বেশি বলে জানা গেছে। । আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

 

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, সারাদেশে গত তিন মাসে খুনের ঘটনা ঘটেছে ৮৫৪টি। তার মধ্যে জানুয়ারিতে ২৮৭টি, ফেব্রুয়ারিতে ২৫০টি ও মার্চে ৩১৭টি খুনের ঘটনা ঘটে। প্রতি মাসে গড়ে ২৮৪টি খুনের ঘটনা ঘটছে। অথচ ২০২৫ সালের প্রথম তিন মাসে ৭৫০টি খুনের ঘটনা ছিল। তার মধ্যে জানুয়ারিতে ছিলো ২৯৪টি, ফেব্রুয়ারিতে ২১৭টি ও মার্চে ২৩৯ জন খুন হয়। গত বছরের প্রথম তিন মাসে গড়ে ২৫০টি হত্যার ঘটনা ঘটে। তাছাড়া ২০২৪ সালের প্রথম তিন মাসে খুনের ঘটনা ঘটেছে ৭১০টি। তার মধ্যে জানুয়ারিতে ২৩১টি, ফেব্রুয়ারিতে ২৪০ ও মার্চে ২৩৯টি। ওই বছরের প্রথম তিন মাসে গড়ে হত্যার ঘটনা ২৩৬টি। গত২০২৫ সালের ফেবব্রুয়ারি ও মার্চে খুনের যেসব মামলা হয়েছে, তার মধ্যে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে হত্যা ও আগের বিভিন্ন সময়ের খুনের মামলাও অন্তর্ভুক্ত। ওই হিসাবে ২০২৫ সালের মার্চে মোট ৩১৬টি হত্যা মামলা হয়েছে। তার মধ্যে ৭৭টি আগের মামলা। তাছাড়া ফেব্রুয়ারিতে দায়ের ৩০০ মামলার মধ্যে আগের ঘটনার ৮৩টি। বিগত ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালের প্রথম তিন মাসে খুনের ঘটনা বেশি ছিল ৪০টি। আর ২০২৫ সালের তুলনায় চলতি বছরের তিন মাসে খুনের ঘটনা ১০৪টি বেশি।

 

সূত্র জানায়, বর্তমানে বিভিন্ন ঘটনায় সাধারণ মানুষের পাশাপাশি পুলিশও হামলার শিকার হচ্ছে। চলতি বছরে মার্চে ৬৩টি, ফেব্রুয়ারিতে ৪২টি ও জানুয়ারিতে ৪২টি পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলার ঘটনা। প্রথম তিন মাসে মোট ঘটনা ১৪৭টি। আর ২০২৫ সালের একই সময়ে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় ১৭১ জন এবং ২০২৪ সালের প্রথম তিন মাসে ১২৩ জন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছে। দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে ২০২৫ সালে দেশের বিভিন্ন এলাকায় মবের শিকার হয় পুলিশ সদস্যরা। তাছাড়া প্রায়ই দেশের বিভিন্ন স্থানে ছিনতাই, ডাকাতি, দস্যুতা ও চুরির ঘটনা ঘটছে। তাতেও হতাহতের ঘটনা ঘটছে। চলতি বছরের তিন মাসে ডাকাতি হয়েছে ১৩৩টি, ছিনতাই ৪৩৯টি ও চুরির ঘটনা ২ হাজার ৩১৮টি। ২০২৫ সালের একই সময়ে ডাকাতির ঘটনা ছিল ২০৫টি, ছিনতাই ৪৯৫টি ও চুরির ঘটনা ২ হাজার ৩৩৬টি। তার আগের বছরের প্রথম তিন মাসে ডাকাতির ঘটনা ছিল ৮৭টি, ছিনতাই ৩৭৩ ও চুরির ঘটনা ২ হাজার ৪৩৪টি। আর চলতি বছরের তিন মাসের তুলনায় গত বছরের একই সময়ে ৭২টি ডাকাতি ও ৫৬টি ছিনতাই বেশি ঘটেছে। যদিও চুরি-ছিনতাইয়ের ঘটনায় অনেকে থানায় অভিযোগ দিতে যায় না। তাই অনেক অপরাধেরই রেকর্ড নেই।

 

সূত্র আরো জানায়, সারাদেশে বিগত ২০২৪ সালের প্রথম তিন মাসে ১৪৫টি অপহরণের ঘটনা ঘটেছিলো। কিন্তু ২০২৫ সালে একই সময়ে ছিরো ২৬৬টি। আর চলতি বছরে তিন মাসে অপহরণের শিকার হয়েছেন ২৫৩ জন। তাছাড়া চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত ৩ হাজার ৯৪৭টি নারী ও শিশু ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। তার আগের বছরের একই সময়ে ধর্ষণের ঘটনা ছিল ৪ হাজার ৯২৪টি এবং ২০২৪ সালের প্রথম তিন মাসে ৩ হাজার ৯২৩টি। সাধারণত খুন, ডাকাতি, ছিনতাই, চুরি, ধর্ষণ, নারী ও শিশু নির্যাতনের মতো ঘটনাই সমাজের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবস্থান নির্দেশ করে।

 

এদিকে বিগত ২০২৪ সালে দেশে রাজনৈতিক পটপরিবতৃনের পর সারাদেশে বিভিন্ন থানা ও পুলিশের স্থাপনা থেকে লুট হয়েছে ৫ হাজার ৭৬৩টি আগ্নেয়াস্ত্র ও ৬ লাখ ৫২ হাজার আট রাউন্ড গুলি। এখন পর্যন্ত এক হাজার ৩২৩টি অস্ত্র উদ্ধার হয়নি। আর দুই লাখ ৫৭ হাজার ১৪৪ রাউন্ড গুলি উদ্ধার হয়নি। পুলিশের লুণ্ঠিত সব অস্ত্র-গুলি উদ্ধার না হওয়ায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির ঝুঁকি বাড়ছে। যদিও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে অন্তর্বর্তী সরকার দেশব্যাপী একাধিক দফায় যৌথ অভিযান চালিয়েছে। তাছাড়া এখনো বেহাত কারাগার থেকে লুট হওয়া বেশ কিছু অস্ত্র ও গুলি।

 

অন্যদিকে অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশ বাহিনীর সমন্বয়ের অনেক ঘাটতি রয়েছে। ২০২৪ এর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সমাজের ভেতরের চলমান কাঠামো ভেঙে পড়েছে। বর্তমান সরকার যদি ন্যায্যতার ভিত্তিতে অপরাধীদের বিচার নিশ্চিত করতে না পারে তাহলে অদূর ভবিষ্যতে এই ধরনের ঘটনা আরো বহু গুণে বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা আরো শক্তিশালী করতে কোর কমিটি পুনর্গঠন করেছে সরকার। ইতিমধ্যে এ সংক্রান্ত একটি প্রজ্ঞাপন জারি করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

 

এ প্রসঙ্গে ডিএমপির মুখপাত্র (ডিসি) এনএম নাসিরুদ্দিন জানান, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় সার্বক্ষণিক পুলিশের টহল, বিশেষ অভিযান, ব্লক রেইড দেয়া হচ্ছে। বিশেষ বিশেষ জায়গায় নজরদারি বাড়ানো হচ্ছে। অপরাধমূলক যে সব ঘটনা ঘটছে, সেসব ঘটনার ভিত্তিতে ও মামলার প্রেক্ষিতে তদন্ত কার্যক্রম চলছে। আসামিরাও গ্রেফতার হচ্ছে। পুলিশের দিক থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালানো হচ্ছে।