যুদ্ধবিরতির মাঝেই ইরানে মার্কিন বিমান হামলা

অনলাইন ডেস্ক:

দেড় মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা সাময়িক যুদ্ধবিরতি ভেঙে ইরানের দক্ষিণাঞ্চলে নতুন করে বিমান হামলা চালিয়েছে মার্কিন বিমান বাহিনী। পেন্টাগনের দাবি, পারস্য উপসাগরে মাইন বসানোর চেষ্টায় থাকা ইরানি সামরিক বোট এবং তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করে এই আকস্মিক আক্রমণ চালানো হয়েছে। বিবিসি এক প্রতিবেদনে এই তথ্য নিশ্চিত করেছে।

 

মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, এই অভিযানটি সম্পূর্ণ ‘আত্মরক্ষামূলক’ এবং ইরানি বাহিনীর সম্ভাব্য হুমকি থেকে নিজেদের সেনাদের নিরাপদ রাখতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। সেন্টকমের মুখপাত্র ক্যাপ্টেন টিম হকিন্স বলেন, দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধবিরতি বহাল থাকার পরও মার্কিন সেনারা সর্বোচ্চ সহনশীলতা দেখিয়ে নিজেদের রক্ষা করে চলেছে।

 

নিউইয়র্ক টাইমসের বরাতে জানা গেছে, স্থানীয় সময় সোমবার রাতে ইরানের কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও প্রধান নৌঘাঁটি বন্দর আব্বাসের নিকটবর্তী এলাকায় এই হামলা চালানো হয়, যা হরমুজ প্রণালির প্রবেশদ্বারে অবস্থিত। এদিকে ইরানি সরকারি সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, বন্দর আব্বাসে বিকট বিস্ফোরণের আওয়াজ পাওয়ার পর স্থানীয় প্রশাসন বিষয়টি খতিয়ে দেখছে। তবে এই হামলার বিষয়ে তেহরান এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি।

 

চুক্তি নিয়ে এখনো আশাবাদী ওয়াশিংটন

 

এই আকস্মিক হামলার পর ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে চলমান শান্তি আলোচনা স্থবির হয়ে পড়বে কিনা তা এখনো পরিষ্কার নয়। তবে ভারত সফরে থাকা মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এখনো একটি সমঝোতার ব্যাপারে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, একটি চুক্তি এখনো সম্ভব। একই সাথে তিনি মঙ্গলবার ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও শীর্ষ আলোচকের সাথে কাতারের প্রধানমন্ত্রীর পূর্বনির্ধারিত বৈঠকের দিকে ইঙ্গিত করেন। রুবিও জানান, প্রাথমিক দলিলের নির্দিষ্ট কিছু শব্দ বা ভাষা নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে, তাই চূড়ান্ত রূপ পেতে আরও কয়েক দিন সময় লাগতে পারে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি ভালো চুক্তি করতে আগ্রহী, অন্যথায় তিনি কোনো চুক্তিই করবেন না।

 

ইরানের ওপর নতুন করে হামলার বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেন, যেকোনো মূল্যেই হোক হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত রাখতে হবে। সেখানে ইরানের কর্মকাণ্ড পুরোপুরি বেআইনি, যা বৈশ্বিক বাণিজ্যের জন্য কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

 

এর আগে চলতি মাসের শুরুতে হরমুজ প্রণালিতে দুই দেশের যুদ্ধজাহাজের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছিল, যার জন্য উভয় পক্ষই একে অপরকে দোষারোপ করে। তবে সেই ঘটনার পরও ট্রাম্প দাবি করেছিলেন যে যুদ্ধবিরতি অটুট রয়েছে। গত সপ্তাহে ট্রাম্প দুই পক্ষ চুক্তির খুব কাছাকাছি রয়েছে বলে ইঙ্গিত দিলেও পরে আলোচনাকারীদের তাড়াহুড়ো না করার নির্দেশ দেন। অন্যদিকে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানিয়েছেন, আলোচনায় কিছুটা অগ্রগতি হলেও চুক্তি স্বাক্ষর করার মতো পরিস্থিতি এখনো তৈরি হয়নি।

 

সমঝোতার শর্ত ও পারমাণবিক বিতর্ক

 

বর্তমানে দুই দেশের মধ্যে যে সমঝোতা স্মারক নিয়ে আলোচনা চলছে, তাতে ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি বাড়ানো, হরমুজ প্রণালি পুনরায় সচল করা এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে পরবর্তী আলোচনার রূপরেখা রয়েছে। মার্কিন গণমাধ্যমের তথ্যমতে, এই আলোচনায় নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার বা ইরানের অবরুদ্ধ তহবিল মুক্ত করার মতো জটিল বিষয়গুলোর তাৎক্ষণিক সমাধান হবে না, এগুলো পরের জন্য তোলা থাকবে।

 

তবে মূল জটিলতা তৈরি হয়েছে ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম নিয়ে। ধারণা করা হচ্ছে, যুদ্ধের শুরুতে ইরানের কাছে অস্ত্রের গ্রেডে রূপান্তরযোগ্য প্রায় ৪৪০ কেজি ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ছিল। সোমবার রাতে এক বিবৃতিতে ডোনাল্ড ট্রাম্প কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে জানিয়েছেন, এই সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম হয় অবিলম্বে মার্কিন হেফাজতে হস্তান্তর করতে হবে, না হয় ইরানের মাটিতেই আন্তর্জাতিক সমন্বয়ে ধ্বংস করতে হবে।

 

উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথভাবে ইরানে বড় ধরনের হামলার মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে এই যুদ্ধের সূত্রপাত হয়। এর জবাবে ইরান বিশ্ববাণিজ্যের অন্যতম প্রধান রুট হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম রেকর্ড পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। গত ৮ এপ্রিল থেকে দুই পক্ষ একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি মেনে চললেও হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ও অবরোধ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে।