নিজস্ব প্রতিবেদক:
বাংলাদেশ সরকারি ক্রয় ব্যবস্থাপনায় এক বৈপ্লবিক পরিবর্তনের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে। আগামী অর্থবছরের শুরু থেকেই কাগজভিত্তিক দরপত্রের যুগের অবসান ঘটতে যাচ্ছে। চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে শতভাগ ইলেকট্রনিক গভর্নমেন্ট প্রকিউরমেন্ট বা ই‑জিপি ব্যবস্থায় রূপান্তর হবে। এরপর কোনো উন্নয়নমূলক কাজ বা পণ্য ক্রয়ে অফলাইন দরপত্র আহ্বান করার সুযোগ থাকবে না। বিপিপিএ স্পষ্ট করেছে, ৩০ জুনের পর থেকে কোনো অব্যাহতি আবেদনও গ্রহণ করা হবে না। কেবলমাত্র ১ জুলাইয়ের আগে শুরু হওয়া ম্যানুয়াল প্রক্রিয়া শেষ করার সুযোগ থাকবে। এর মাধ্যমে সরকার ক্রয়ের প্রতিটি স্তরে স্বচ্ছতা, দক্ষতা এবং সুস্থ প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করতে শতভাগ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সংশ্লিষ্ট মতে, সরকারি ক্রয় খাত দেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জাতীয় বাজেটের প্রায় ৪৫ শতাংশ এবং এডিপি ব্যয়ের ৮৫ শতাংশই ক্রয়ের মাধ্যমে ব্যয় হয়। জনগণের করের অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করাই উন্নয়নের মূল শর্ত। সামান্যতম অনিয়ম বা অদক্ষতা দেশের অর্থনীতির জন্য বড় ক্ষতির কারণ হতে পারে। এই গুরুত্ব উপলব্ধি করেই সরকার ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট (সংশোধন) অধ্যাদেশ কার্যকর করে এবং ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে জাতীয় সংসদে নতুন আইন পাস করে। একই সঙ্গে পিপিআর‑২০০৮ বাতিল করে ‘পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা ২০২৫’ চালু করা হয়। এর ফলে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে ক্রয় ব্যবস্থায় কাঠামোগত সংস্কার সম্পন্ন হয়েছে। জানা গেছে, ২০১১ সালে পরীক্ষামূলকভাবে ই‑জিপি চালু হওয়ার পর থেকেই ক্রয় প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা এসেছে। নতুন বিধিমালা কার্যকর হওয়ার পর প্রতিযোগিতা বেড়েছে—আগে যেখানে গড়ে ২.২ জন দরদাতা অংশ নিতেন, এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮.৪ জনে। প্রতিদিন নিবন্ধনের আবেদনও বেড়ে ২০০ থেকে ৩০০টিতে পৌঁছেছে। নারী উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণও বেড়েছে; বর্তমানে ৭ হাজারের বেশি নারী দরদাতা নিবন্ধিত আছেন। নতুন বিধিমালায় নারী, ক্ষুদ্র ও নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য ২৫ শতাংশ বাজেট বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এদিকে, ই‑জিপি ব্যবস্থায় সময়সাশ্রয়ও হয়েছে। আগে ম্যানুয়াল প্রক্রিয়ায় কয়েক মাস লাগলেও এখন গড় সময়সীমা ৫৪ দিনে নেমে এসেছে। ৯৯ শতাংশ চুক্তি নির্ধারিত সময়েই সম্পন্ন হচ্ছে। সব ধরনের কার্যাদেশ বা চুক্তির তথ্য শতভাগ অনলাইনে প্রকাশ করা হচ্ছে। তবে চ্যালেঞ্জও আছে—কিছু প্রতিষ্ঠানে কারিগরি দক্ষতার অভাব, দুর্বল চুক্তি ব্যবস্থাপনা এবং প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার অনীহা সংস্কারকে ধীর করে দেয়। এছাড়া, এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বিপিপিএ প্রশিক্ষণ ও সক্ষমতা বৃদ্ধিতে জোর দিচ্ছে। প্রস্তাবিত ‘ইনস্টিটিউট অব পাবলিক প্রকিউরমেন্ট’ জাতীয় পর্যায়ে প্রশিক্ষণ ও গবেষণার উৎকর্ষ কেন্দ্র হবে। প্রকল্প পরিচালক নিয়োগের আগে তাদের জন্য সুনির্দিষ্ট প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে। টেকসই সরকারি ক্রয় বা ‘সাসটেইনেবল পাবলিক প্রকিউরমেন্ট’ প্রবর্তনের মাধ্যমে পরিবেশবান্ধব ও সামাজিক দায়বদ্ধতাসম্পন্ন ক্রয় নিশ্চিত করা হবে। প্রতিটি মন্ত্রণালয়ে আলাদা ক্রয় ইউনিট প্রতিষ্ঠার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। এখানে নারী উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণের প্রসঙ্গ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। নতুন বিধিমালায় নারী ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য বাজেটের নির্দিষ্ট অংশ সংরক্ষিত থাকায় তাদের অংশগ্রহণ বহুগুণ বেড়েছে। এটি কেবল অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তি নয়, সামাজিক ক্ষমতায়নেরও প্রতিফলন। নারী উদ্যোক্তারা এখন সরকারি ক্রয়ের বড় অংশীদার হয়ে উঠছেন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে এই পরিবর্তন বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করবে। দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশ এখনও কাগজভিত্তিক দরপত্রের ওপর নির্ভরশীল। বাংলাদেশ শতভাগ ই‑জিপি বাস্তবায়নের মাধ্যমে অঞ্চলে পথিকৃৎ হয়ে উঠবে। বৈশ্বিক মানদণ্ডে স্বচ্ছতা ও প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করার এই প্রচেষ্টা আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর আস্থা বাড়াবে। ভবিষ্যতের পথচলায় সরকারি ক্রয় ব্যবস্থাপনা কেবল প্রযুক্তিগত নয়, বরং কৌশলগত সুশাসনের হাতিয়ার হয়ে উঠবে। রাষ্ট্রীয় অর্থের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত হবে, দুর্নীতি ও সিন্ডিকেটের সুযোগ কমবে। জনগণও বুঝতে পারবে তাদের করের অর্থ কোথায় ব্যয় হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শতভাগ ই‑জিপি কার্যকর হলে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় ডিজিটাল পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রূপান্তরের পথিকৃৎ দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে। এই পরিবর্তন রাষ্ট্রীয় অর্থের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করবে এবং স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার পথে একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক হয়ে থাকবে। নিয়মিত তদারকি, প্রশিক্ষণ এবং আইনি কঠোরতা বজায় রাখতে পারলে এই ডিজিটাল রূপান্তরই হবে আগামী দিনের উন্নত ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক নিরাপত্তার মূল চাবিকাঠি।











