নিজস্ব প্রতিবেদক:
দেশের ভঙ্গুর ও বিপর্যস্ত স্বাস্থ্য খাতকে নতুন করে টেনে তুলতে এবং সর্বসাধারণের দোরগোড়ায় উন্নত চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দিতে এক মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছে সরকার। তৃণমূল থেকে শুরু করে জেলা ও বিভাগীয় পর্যায় পর্যন্ত চিকিৎসা ব্যবস্থার খোলনলচে বদলে ফেলে একটি টেকসই ও আধুনিক ‘জাতীয় স্বাস্থ্য ব্যবস্থা’ গড়ে তোলার রূপরেখা তৈরি করা হয়েছে। এই মহাপরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেশের সব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ১০১ শয্যায় উন্নীত করা হচ্ছে এবং স্বাস্থ্য খাতে এক অভাবনীয় কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে ১ লাখ নতুন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। জানা গেছে, তৃণমূল পর্যায়ের সাধারণ মানুষের চিকিৎসাপ্রাপ্তি সুগম করতে সবচেয়ে বড় কাঠামোগত পরিবর্তনটি আসছে উপজেলা স্তরে। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের প্রধান ভরসাস্থল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোকে ১০১ শয্যায় উন্নীত করার প্রক্রিয়াটি ইতিমধ্যে দাপ্তরিকভাবে শুরু হয়েছে। গত ৩ জুন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রশাসন বিভাগের পরিচালক অধ্যাপক ডা. জালাল উদ্দিন মোহাম্মদ রুমীর স্বাক্ষরে এ সংক্রান্ত একটি জরুরি অফিস আদেশ জারি করা হয়েছে। আদেশে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার আলোকে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে দেশের সব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের শয্যা সংখ্যা বাড়িয়ে ১০১টি করার নীতিগত সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়েছে। বর্তমানে দেশের অধিকাংশ উপজেলা হাসপাতালে শয্যা সংকট থাকায় রোগীদের মেঝেতে থেকে চিকিৎসা নিতে হয় কিংবা ভর্তি হতে না পেরে ফিরে যেতে হয়। এই শয্যা সংখ্যা বৃদ্ধির ফলে স্থানীয় পর্যায়েই বিপুল সংখ্যক মানুষের ইনডোর বা ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে, যা পরোক্ষভাবে জেলা সদর হাসপাতালগুলোর ওপর রোগীর উপচে পড়া চাপকে অনেকাংশে কমিয়ে আনবে। এই সিদ্ধান্ত দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য গণপূর্ত অধিদপ্তর, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি বিশেষ পরিদর্শন দল গঠন করা হয়েছে, যারা দেশের প্রতিটি উপজেলা হাসপাতাল সরেজমিনে পরিদর্শন করে এর অবকাঠামোগত সক্ষমতা, নতুন ভবন সমপ্রসারণের সম্ভাবনা এবং অতিরিক্ত শয্যা স্থাপনের উপযোগিতা যাচাই করবেন। মাঠপর্যায়ের এই পরিদর্শন কার্যক্রম নির্বিঘ্ন করতে সব উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তাকে (ইউএইচএফপিও) প্রয়োজনীয় নথিপত্র ও স্থানীয় ব্যবস্থাপনার তথ্য দিয়ে সার্বিক সহযোগিতা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এদিকে, উপজেলা পর্যায়ের এই উন্নয়ন কেবল শয্যা সংখ্যার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না, বরং সেখানে সেবার মানোন্নয়নে বিশেষায়িত চিকিৎসকের পদ সৃষ্টি করা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর জানান, তৃণমূলের এই হাসপাতালগুলোতে এমনভাবে পরিবর্তন আনা হচ্ছে যাতে শয্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি গুণগত সেবার পরিধি বাড়ে। নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রতিটি উপজেলায় ধারাবাহিকভাবে সার্বক্ষণিক চিকিৎসকের উপস্থিতি নিশ্চিত করা হবে এবং বিশেষ করে শিশুদের জন্য শিশু বিশেষজ্ঞ, নারীদের জন্য গাইনি বিশেষজ্ঞ এবং আধুনিক চিকিৎসার অংশ হিসেবে ফিজিওথেরাপির জন্য স্বতন্ত্র চিকিৎসক ও সেবার ব্যবস্থা রাখা হবে। এর ফলে মাতৃস্বাস্থ্য, শিশুস্বাস্থ্য, জরুরি চিকিৎসা ও সার্জারির মতো জটিল বিষয়েও গ্রামের মানুষকে আর দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে জেলা বা বিভাগীয় শহরের বড় হাসপাতালে ছুটতে হবে না। উপজেলা স্তরের এই উন্নয়নের পাশাপাশি জেলা হাসপাতালগুলোর চিকিৎসাসেবাতেও বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হচ্ছে। মানুষের জীবনযাত্রার পরিবর্তনের কারণে বর্তমানে সংক্রামক রোগের চেয়ে অসংক্রামক ও জীবনযাত্রাজনিত দীর্ঘমেয়াদী রোগ (লাইফস্টাইল ডিজিজ) অনেক বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। এই পরিবর্তিত পরিস্থিতির সাথে খাপ খাইয়ে নিতে প্রতিটি জেলা হাসপাতালে হৃদরোগীদের জন্য জরুরি ‘করোনারি কেয়ার ইউনিট’ (সিসিইউ) এবং কিডনি রোগীদের জীবন রক্ষাকারী ‘কিডনি ডায়ালিসিস ইউনিট’ স্থাপন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার, যা সাধারণ মানুষের চিকিৎসা ব্যয় বহুগুণ কমিয়ে আনবে। এদিকে, এই বিশাল অবকাঠামোগত ও সেবামূলক রূপান্তরকে মাঠপর্যায়ে সফলভাবে সচল রাখতে মানবসম্পদ খাতে এক বিশাল নিয়োগ ও কাঠামোগত সংস্কারের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য খাতের আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে সরকার খুব শীঘ্রই ১ লাখ নতুন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ করতে যাচ্ছে, যার পাশাপাশি ব্যাপকহারে ডাক্তার ও নার্সও নিয়োগ করা হবে। জানা গেছে, বর্তমানে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর এবং কমিউনিটি ক্লিনিকের অধীনে প্রায় ৪০ হাজার স্বাস্থ্যকর্মী দেশের বিভিন্ন প্রান্তে তিন-চারটি পৃথক ভাগে বিভক্ত হয়ে মাঠপর্যায়ে কাজ করছেন। সরকারের নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই বিদ্যমান ৪০ হাজার কর্মীর সাথে নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত ১ লাখ কর্মীকে যুক্ত করে মোট ১ লাখ ৪০ হাজার স্বাস্থ্যকর্মীকে একটি একক ও সমন্বিত কাঠামোর অধীনে আনা হবে। এর ফলে মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবায় দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা বিশৃঙ্খলা ও সমন্বয়হীনতার অবসান ঘটবে। এখন থেকে সব কর্মীর জন্য একই ধরনের সুনির্দিষ্ট ‘জব ডেসক্রিপশন’ এবং ‘অ্যাসেনশিয়াল সার্ভিস প্যাকেজ’ নির্ধারণ করা হবে, যা সারা দেশে স্বাস্থ্যসেবার মানকে একরূপ বা অভিন্ন করতে সাহায্য করবে। এদিকে, সরকারি এই বিশাল স্বাস্থ্য সংস্কার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অর্থের চেয়েও বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক অদক্ষতা এবং সময়মতো প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে না পারার মানসিকতা। এই সংকট কাটিয়ে উঠতে সরকার স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতকে রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকারে শীর্ষে রেখে পর্যায়ক্রমে স্বাস্থ্য বাজেটের আকার বাড়ানোর রোডম্যাপ তৈরি করেছে। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে মাঠপর্যায় থেকে ‘রিয়েল টাইম ডেটা’ বা তাৎক্ষণিক তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হচ্ছে, যাতে কোনো নির্দিষ্ট এলাকার রোগের প্রাদুর্ভাব দেখে স্থানীয় পর্যায় থেকেই কার্যকর স্বাস্থ্য পরিকল্পনা গ্রহণ করা যায়। এই সামগ্রিক সংস্কার প্রক্রিয়া এবং প্রকল্প ব্যবস্থাপনাকে গতিশীল করতে একটি স্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হচ্ছে।











