ঢাকা রবিবার, ০৮ নভেম্বর ২০২৬
বিজ্ঞাপন 📢 Google AdSense — 728 × 90 Leaderboard Placement

ধানের কাঙ্ক্ষিত দাম পাওয়া না গেলেও বাজারে ঊর্ধ্বমুখী চালের দাম

প্রকাশিত: 21 June 2026, 1:39 pm
ফন্ট:

নিজস্ব প্রতিবেদক:

ভরা বোরো মৌসুমে মাঠজুড়ে ধানের বাম্পার ফলন হলেও দেশের চালের বাজারে এর কোনো ইতিবাচক প্রভাব পড়েনি। উল্টো বাজার ব্যবস্থাপনায় দেখা দিয়েছে এক অদ্ভুত বৈপরীত্য- প্রান্তিক চাষিরা ধানের কাঙ্ক্ষিত মূল্য না পেয়ে চরম লোকসান গুনছেন, অথচ পাইকারি ও খুচরা বাজারে চালের দাম ক্রমাগত বাড়ছে। উত্তরবঙ্গের রংপুর, লালমনিরহাট, জয়পুরহাট ও দিনাজপুরের বাজার পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, মিলার, ফড়িয়া ও বড় মজুতদারদের সিন্ডিকেটের কারণে কৃষক ও সাধারণ ভোক্তা- উভয় পক্ষই বিপাকে পড়েছেন। এদিকে, লালমনিরহাটসহ পুরো রংপুর অঞ্চলে মৌসুমের শুরুতে চাষিদের জ্বালানি তেল, সার, বীজ ও শ্রমিক বাবদ অতিরিক্ত খরচ গুনতে হয়েছে। ফলে প্রতি মণ ধান উৎপাদনে কৃষকের খরচ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৯৫০ থেকে ১,০০০ টাকা। অথচ বর্তমানে খোলা বাজারে প্রতি মণ ধান বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৬০০ থেকে ৭০০ টাকায়। কৃষকদের অভিযোগ, পাইকাররা সঠিক দাম দিচ্ছেন না, যার ফলে প্রতি মণে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা লোকসান দিয়ে তারা ধান বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। এর আগে আলু চাষে বড় ধাক্কা খাওয়ার পর বোরো ধানের দরপতনে অনেক প্রান্তিক চাষি এখন দিশেহারা। নীলফামারী, গাইবান্ধা ও রংপুরের চিত্রও একই রকম। এসব জেলায় ধানের ফলন ভালো হলেও পাইকারদের সিন্ডিকেটের কারণে দাম তলানিতে ঠেকেছে। লালমনিরহাটের এক জানান, ভ্যান ভাড়া, তেল খরচ ও ট্রাক্টর খরচ মিলিয়ে এক মণ ধানের পেছনে যেখানে ১,২০০ টাকা ব্যয় হয়েছে, সেখানে বাজারে পাইকাররা দাম হাঁকাচ্ছেন মাত্র ৭২০ টাকা। নীলফামারীর জলঢাকা ও রংপুরের গঙ্গাচড়া এলাকার কৃষকদের মতে, সার, বীজ ও শ্রমিকের দাম বাড়লেও ধানের দাম না বাড়ায় সারা বছরের পরিশ্রম মাটি হয়ে যাচ্ছে। কৃষি সমপ্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে রংপুর অঞ্চলের পাঁচ জেলায় মোট ৫ লাখ ৯ হাজার ৯৫ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। অনুকূল আবহাওয়ার কারণে ফলন তুলনামূলকভাবে বেশি হলেও বাজার মূল্যের ধস কৃষকদের সোনালি স্বপ্নকে গলার কাঁটায় পরিণত করেছে। সরকার অভ্যন্তরীণ বোরো ধান সংগ্রহ কার্যক্রম শুরু করেছে এবং প্রতি কেজি ধান ৩৬ টাকা দরে কেনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। তবে কৃষকদের অভিযোগ, সরকারি গুদামে নানা জটিলতার কারণে তারা সরাসরি ধান দিতে পারছেন না। ফলে মাঠ পর্যায়ের সুবিধা লুটে নিচ্ছে ফড়িয়া ও মধ্যস্বত্বভোগীরা। জয়পুরহাটেও একই সংকট। আলু চাষে ক্ষতির পর বোরো ধান চাষ করে লোকসানের মুখে পড়েছেন কৃষকরা। রোপণ, সেচ, আগাছা পরিষ্কার, কীটনাশক প্রয়োগ এবং ধান কাটার সময় শ্রমিক সংকটের কারণে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। কৃষকরা জানান, অসময়ের বৃষ্টি ও শ্রমিক সংকটের কারণে এক বিঘা জমির ধান কাটতে খরচ হয়েছে ৫ থেকে ৮ হাজার টাকা, আর মাড়াইয়ে খরচ পড়েছে আরও ১,০০০ থেকে ১,২০০ টাকা। বিঘাপ্রতি উৎপাদন খরচ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩০ হাজার টাকা, অথচ বিক্রি করে সর্বোচ্চ মিলছে ২৮ হাজার টাকা। ফলে প্রতি বিঘায় কমপক্ষে ২ হাজার টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে। জেলা কৃষি সমপ্রসারণ অধিদপ্তরের মতে, অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে মাঠে পানি জমে থাকায় কম্বাইন হারভেস্টার দিয়ে ধান কাটা যাচ্ছে না, যা মজুরি খরচ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। অন্যদিকে দিনাজপুরে দেখা যাচ্ছে সম্পূর্ণ উল্টো চিত্র। ইরি-বোরো মৌসুমে সাধারণত চালের বাজারে স্বস্তি ফেরার কথা থাকলেও ভরা মৌসুমেও এখানকার চালের দাম ঊর্ধ্বমুখী। ঈদের এক সপ্তাহ পেরোনোর পর পরই ৫০ কেজির বস্তায় ১৫০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত দাম বেড়ে যায়। মিনিকেট চালের বস্তা ৩ হাজার ১০০ টাকা থেকে বেড়ে ৩ হাজার ৩০০ টাকা, আঠাশ জাতের চাল ২ হাজার ৭০০ টাকা থেকে বেড়ে ২ হাজার ৮৫০ টাকা, উনত্রিশ জাতের চাল ২ হাজার ৫০০ টাকা থেকে বেড়ে ২ হাজার ৬০০ টাকা, সুমন স্বর্ণা চাল ২ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বেড়ে ২ হাজার ৫০০ টাকা এবং চিনিগুড়া চাল ৭ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ৭ হাজার ৪০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ব্যবসায়ীদের দাবি, বাজারে ধানের সরবরাহ কমে গেছে এবং বড় অংশই বড় মজুতকারীদের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। মিলগেট থেকে বেশি দামে চাল কিনতে হচ্ছে, পরিবহন ব্যয়ও বেড়েছে, ফলে খুচরা বাজারে দাম বাড়ানো ছাড়া উপায় নেই। চালকল মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দিনাজপুরের প্রায় দুই হাজার চালকলের মধ্যে প্রায় ৩০০টি অটোরাইস মিল রয়েছে। মৌসুমে এসব মিল থেকে প্রতিদিন যেখানে ৭ থেকে ৮ হাজার মেট্রিক টন চাল উৎপাদন হতো, বর্তমানে তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৩ থেকে ৪ হাজার মেট্রিক টনে। মিল মালিকদের দাবি, উৎপাদন ব্যয়ের বড় অংশই বিদ্যুৎ ও জ্বালানিনির্ভর। একটি অটোরাইস মিলে উৎপাদন ব্যয়ের প্রায় ১৫ শতাংশই বিদ্যুৎ খাতে ব্যয় হয়। কিন্তু ঘনঘন লোডশেডিংয়ের কারণে উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে এবং যন্ত্রপাতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, যার অতিরিক্ত খরচও যুক্ত হচ্ছে চালের উৎপাদন মূল্যে। বাংলাদেশ অটো, মেজর ও হাস্কিং মিল মালিক সমিতির মতে, লোডশেডিং ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির কারণে উৎপাদন খরচ প্রায় ২০ শতাংশ বেড়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে চালের বাজারে। মিলগেটে দাম বেড়ে যাওয়ায় ব্যবসায়ীরাও বাড়তি দামে বিক্রি করছেন, যার ফলে খুচরা বাজারে চালের বিক্রি কমে গেছে। সাধারণ মানুষ এখন প্রয়োজন ছাড়া অতিরিক্ত চাল কিনছেন না। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মাঠপর্যায়ে ধানের দাম কমে যাওয়া এবং বাজারে চালের দাম বেড়ে যাওয়ার এই বৈপরীত্য দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও বাজার নিয়ন্ত্রণের দুর্বলতাকে স্পষ্ট করে তুলেছে। একদিকে কৃষক তার ফসল বিক্রি করে মূলধন তুলতে পারছেন না, অন্যদিকে সাধারণ ভোক্তারা চাল কিনতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন। সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, সরকারি গুদামে ফড়িয়া ও মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য বন্ধ করে সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে ধান কেনার ব্যবস্থা চালু করা এবং মিলগেট ও পাইকারি আড়তগুলোতে কঠোর নজরদারি না চালালে আগামী দিনে চালের বাজার আরও অস্থির হয়ে উঠতে পারে।

মন্তব্য করুন