নিজস্ব প্রতিবেদক:
আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম প্রতি এমএমবিটিইউ ২০ ডলারে পৌঁছালে বাংলাদেশকে প্রতি ঘনমিটার গ্যাসে ৬০ টাকারও বেশি ভর্তুকি গুনতে হয়, যা দেশের জ্বালানি খাতে বড় ধরনের আর্থিক চাপ সৃষ্টি করেছে। চলতি বছর সরবরাহ সংকটের কারণে আরও চড়া দামে এলএনজি কিনতে হওয়ায় এই ভর্তুকির পরিমাণ আরও বেড়েছে। এই উচ্চ ব্যয় এবং অর্থায়ন সংকটের মুখে বাংলাদেশসহ এশিয়ার চারটি দেশে এলএনজিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ও ভাসমান টার্মিনাল নির্মাণের অর্ধেকের বেশি প্রকল্প হয় বাতিল হয়েছে, নয়তো সেগুলোর অগ্রগতি থমকে গেছে।
ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের (আইইইএফএ) বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) প্রকাশিত ‘এলএনজি-টু-পাওয়ার ইমার্জিং এশিয়া: আ ফাইভ-ইয়ার রিভিউ অব প্রজেক্ট আউটকামস’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এই উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে। বাংলাদেশ, ফিলিপাইন, ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডের গত পাঁচ বছরের প্রকল্পগুলোর ওপর ভিত্তি করে এই পর্যালোচনা প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, এই চার দেশে ১০ হাজার ৯২০ কোটি ডলার সম্ভাব্য ব্যয়ের ৯২টি এলএনজিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং ২ হাজার ১০০ কোটি ডলারের ৪৪টি আমদানি টার্মিনাল পর্যালোচনা করা হয়েছে। ২০২১ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে ৪৯টি বিদ্যুৎকেন্দ্র ও ২২টি টার্মিনাল বাতিল হয়েছে অথবা সেগুলোর উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি হয়নি। এসব প্রকল্পের সম্মিলিত মূল্য ৬ হাজার ৭৮০ কোটি ডলার। প্রস্তাবিত বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার মাত্র ১১ শতাংশ এবং টার্মিনাল সক্ষমতার ১৫ শতাংশ শেষ পর্যন্ত চালু হয়েছে। বাস্তবায়িত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো উৎপাদনে যেতে গড়ে সাত বছরের বেশি সময় নিয়েছে।
আইইইএফএর বাংলাদেশবিষয়ক প্রধান জ্বালানি বিশ্লেষক শফিকুল আলম বলেন, এলএনজির দামের ওঠানামা বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশের জ্বালানি ব্যয় ও নির্ভরযোগ্য সরবরাহ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। তিনি নিজস্ব গ্যাসসম্পদের ব্যবহার বাড়ানো, জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধি এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্প্রসারণে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, এলএনজির দামের অস্থিরতা, মূলধনি ব্যয় বৃদ্ধি, গ্যাস টারবাইন সরবরাহে দীর্ঘসূত্রতা এবং মুদ্রার অবমূল্যায়নের কারণে প্রকল্পের আর্থিক ঝুঁকি বহুগুণ বেড়েছে। এতে বিদ্যুতের গড় উৎপাদন ব্যয় ২০২১ সালের হিসাবের তুলনায় সর্বোচ্চ ১৩০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। উল্লেখ্য, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে এশিয়ার স্পট মার্কেটে এলএনজির দাম এমএমবিটিইউপ্রতি ২৭ দশমিক ৫ ডলারে পৌঁছেছিল।
বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২১ সালের পর তিনটি এলএনজিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু হলেও জ্বালানি ও বিদ্যুতের উচ্চ ব্যয়ের কারণে ভর্তুকির বোঝা ক্রমাগত ভারী হচ্ছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ধরে রাখতে বিদেশি অর্থায়নের ওপর নির্ভরতাও বেড়েছে। এত বিপুল ব্যয়ের পরও এলএনজি সরবরাহের অনিশ্চয়তার কারণে দেশে গ্যাসসংকট এখনো কাটেনি।
প্রতিবেদনের সহলেখক ক্রিস্টোফার ডোলম্যান জানান, এলএনজিভিত্তিক বিদ্যুতের ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এছাড়া অপর সহলেখক স্যাম রেনল্ডসের মতে, জ্বালানি, যন্ত্রপাতি ও মুদ্রাবাজারের অস্থিরতা প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং অর্থায়ন নিশ্চিত করার প্রক্রিয়াকে অত্যন্ত কঠিন করে তুলেছে।











