মামলাজটে ব্যাহত হচ্ছে সারাদেশে শিক্ষা প্রশাসনের স্বাভাবিক কার্যক্রম

নিজস্ব প্রতিবেদক:

মামলাজটে ব্যাহত হচ্ছে সারাদেশে শিক্ষা প্রশাসনের স্বাভাবিক কার্যক্রম। বর্তমানে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন ৩টি বিভাগ, ১৬টি দপ্তর, ১১টি শিক্ষা বোর্ড এবং সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় মিলিয়ে দেশের বিভিন্ন আদালতে ১৩ হাজার ৭৮টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। তার মধ্যে ১০ হাজার ১৫২টি শিক্ষা মন্ত্রণালয়-সংশ্লিষ্ট মামলা। আর মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের বিরুদ্ধে ৮ হাজার ৮৯৩টি এবং কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের বিরুদ্ধে এক হাজার ১৫৯টি মামলা রয়েছে। ওসব মামলায় ব্যাহত হচ্ছে শিক্ষক নিয়োগ, পদোন্নতি, এমপিও, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটি গঠন, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম। তবে চলমান মামলার প্রায় ৩০ শতাংশ বিগত ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর হয়েছে। আর ওই অধিকাংশ মামলাই স্কুল-কলেজের অ্যাডহক কমিটি বাতিল বা নতুন কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে হয়েছে। মামলার কারণে বর্তমানে শত শত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তৈরি হয়েছে প্রশাসনিক অচলাবস্থা। কোথাও একাধিক কমিটি, কোথাও নিয়মিত প্রতিষ্ঠানপ্রধান না থাকায় সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্থবিরতা বিরাজ করছে। বর্তমানে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়-সংশ্লিষ্ট ৩ হাজার ৪২৬টি মামলার মধ্যে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের (ডিপিই) বিরুদ্ধেই ৩ হাজার ২৮২টি মামলা রয়েছে। ওসব মামলার কারণে বিলম্বিত হচ্ছে বহু প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগ, পদোন্নতি, এমপিও, কমিটি অনুমোদন, এমনকি নিয়মিত বেতন-ভাতা প্রদানের কাজ। শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

 

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, শিক্ষা প্রশাসনে শিক্ষক নিয়োগ, পদোন্নতি, জ্যেষ্ঠতা, গ্রেডেশন, এমপিও, বেতন-ভাতা, বিভাগীয় শাস্তি, চাকরিচ্যুতি, জাতীয়করণ, কোটা, ভর্তি, পেনশন, অডিট আপত্তি, শিক্ষা বোর্ড ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সিদ্ধান্ত এবং পাবলিক পরীক্ষা-সংক্রান্ত বিষয়ে সবচেয়ে বেশি মামলা হচ্ছে। শুধু নিয়োগ প্রক্রিয়াতেই ১২ ধরনের ত্রুটি নিয়ে মামলা হচ্ছে। আর স্কুল-কলেজের পরিচালনা কমিটি নিয়ে ১৮ ধরনের মামলা রয়েছে। শিক্ষা প্রশাসনে মোট ১০৮টি বিষয়ে মামলা হচ্ছে। তার মধ্যে ২৫ থেকে ৩০ ধরনের বিষয়ে মামলার কারণে নিয়মিত আদালতে যেতে হচ্ছে। মামলার কারণে প্রায় ৬ বছর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সাড়ে ৩২ হাজার শিক্ষকের পদোন্নতি আটকে ছিলো। তবে সমপ্রতি তার নিষ্পত্তি হলেও অন্য নিয়োগ-সংশ্লিষ্ট মামলার কারণে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শিক্ষক সংকট তীব্র হচ্ছে। পাশাপাশি অচল হয়ে পড়ছে প্রশাসনিক কাঠামো।

 

সূত্র জানায়, আদালতে মামলার কারণে মাধ্যমিক স্তরে বিজ্ঞান ও কারিগরি শিক্ষা সমপ্রসারণে পরিচালিত সেসিপ প্রকল্পের কয়েকশ শিক্ষক কাজ চালাতে পারছে না দীর্ঘন। বিগত ২০০৭ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত নিয়োগ পাওয়া ওই শিক্ষকদের চাকরি স্থায়ীকরণ ও নিয়োগ বৈধতা নিয়ে মামলা থাকায় অনেককেই বিদ্যালয়ে পাঠানো যাচ্ছে না। ফলে ব্যবহার হচ্ছে না দেশের শত শত বিদ্যালয়ে কোটি কোটি টাকার বিজ্ঞানাগারের যন্ত্রপাতি। আর ওসব যন্ত্রপাতি পড়ে রয়েছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তালাবদ্ধ অবস্থায়। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের অধীন মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) সংশ্লিষ্ট সবচেয়ে বেশি ৫ হাজার ৮৩১টি মামলা রয়েছে। যা ওই বিভাগের মোট মামলার প্রায় ৬৮ শতাংশ। ওসব মামলার বেশির ভাগ শিক্ষক নিয়োগ, পদোন্নতি, এমপিও, ইনসিটু, ওএসডি, গভর্নিং বডি গঠন, বেতন বিল, জাল কাগজে এমপিও এবং শিক্ষার্থী ভর্তি-সংক্রান্ত। তাছাড়া দেশের ১১টি শিক্ষা বোর্ড-সংশ্লিষ্ট এক হাজার ৬৬৩টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। তার মধ্যে ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে এক হাজার ৫৫২টি, আর কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডে ১১১টি মামলা রয়েছে। মামলার দিক দিয়ে সবচেয়ে এগিয়ে ঢাকা শিক্ষা বোর্ড। মামলার সংখ্যা ২৭৩টি। আর ২৬৩টি মামলা নিয়ে তার পরের অবস্থানে রয়েছে কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ড। তাছাড়া রাজশাহী ২০৯টি, দিনাজপুর ১৮৩টি, ময়মনসিংহ ১৬৩টি ও সিলেট শিক্ষা বোর্ডে ৬৯টি মামলা রয়েছে। শিক্ষা বোর্ডগুলোর প্রায় ৭১ শতাংশ মামলা ব্যবস্থাপনা কমিটি, পরীক্ষার ফল পুননির্রীক্ষণ, গভর্নিং বডি ও বিভিন্ন প্রশাসনিক সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে হয়েছে।

 

সূত্র আরো জানায়, দেশের বিভিন্ন শিক্ষা বোর্ড নিম্ন মাধ্যমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডি ও ম্যানেজিং কমিটি প্রবিধানমালা-২০২৪ -এর সংশোধনী আনে গত বছর। সংশোধনীতে কমিটির সভাপতি মনোনয়ন-সংক্রান্ত ১৩(১) বিধি এবং যোগ্যতা-সংক্রান্ত বিধিতে সংশোধনী আনা হয়। ইতিপূবে স্কুল-কলেজের ম্যানেজিং কমিটিকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখতে জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন সুপারিশ করেছিল। কিন্তু ওই সুপারিশে ম্যানেজিং কমিটিতে সরকারি চাকরিজীবীদের রাখার কথা বলা হয়। তখন সরকার বিধিমালায় সংশোধন এনে সিদ্ধান্ত দেয়, সরকারি, আধাসরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান কর্মরত নবম গ্রেডের নিচে নন এমন কর্মকর্তা এবং অবসরপ্রাপ্ত হলে পঞ্চম গ্রেডের কর্মকর্তা সভাপতি হতে পারবেন। ওই সংশোধিত বিধি চ্যালেঞ্জ করে চারটি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অ্যাডহক কমিটির সভাপতি উচ্চ আদালতে রিট মামলা করেছেন।

 

এদিকে মামলার জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরগুলো প্যানেল আইনজীবী নিয়োগ দিলেও সরকারের নির্ধারিত ফি কম হওয়ায় দক্ষ ও অভিজ্ঞ আইনজীবীরা আগ্রহী হয় না। বর্তমানে ফি কাঠামো অনুযায়ী আরজি বা জবাব প্রস্তুতের জন্য ২০ হাজার টাকা, চূড়ান্ত শুনানির জন্য ২০ হাজার টাকা এবং আইনি মতামতের জন্য ৩ হাজার টাকা দেয়া হয়। আইনজীবীদের মতে, সরকারি মামলায় যে পারিশ্রমিক দেয়া হয়, তা অত্যন্ত কম। অথচ প্রায় প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও মামলা হচ্ছে। অথচ নিষ্পত্তির গতি কম।

 

এদিকে এ প্রসঙ্গে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন জানান, দেশের বিভিন্ন আদালতে শিক্ষার দুই মন্ত্রণালয়-সংশ্লিষ্ট প্রায় সাড়ে ১৩ হাজার মামলা বিচারাধীন রয়েছে। ওসব মামলার কারণে ব্যাহত হচ্ছে নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত থেকে শুরু করে দৈনন্দিন প্রশাসনিক কাজ। মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য সরকারের পক্ষ থেকে প্রচেষ্টা চলছে।