উত্তর আয়ারল্যান্ডে বিতর্কিত মিছিল ঠেকাতে হাজারো মানুষের সমাবেশ, শান্ত থাকার আহ্বান ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর

অনলাইন ডেস্ক:

উত্তর আয়ারল্যান্ডের একটি শহরে বিতর্কিত ব্রিটিশপন্থী প্রোটেস্ট্যান্ট মিছিল ঠেকাতে রোববার হাজারো মানুষ জড়ো হয়েছে। ২৮ বছর পর প্রথমবারের মতো মূলত ক্যাথলিক ও জাতীয়তাবাদী একটি এলাকার মধ্য দিয়ে মিছিলটি যাওয়ার কথা রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম সব পক্ষকে ‘শান্ত’ থাকার আহ্বান জানিয়েছেন।

 

রোববার ভোররাতে একটি আদালত অরেঞ্জ অর্ডারের মিছিল আয়োজনের অনুমতি দেওয়ার পর উত্তেজনা আরও বেড়ে যায়।

 

যুক্তরাজ্যের পোর্টাডাউন থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর জানিয়েছে।

 

বিতর্কিত শোভাযাত্রা নিয়ন্ত্রণকারী উত্তর আয়ারল্যান্ডের স্বাধীন সংস্থা প্যারেডস কমিশন ৩৫ জন অরেঞ্জম্যানকে রোববার সকাল ৮টা থেকে গারভাঘি রোড দিয়ে নীরবে মিছিল করার অনুমতি দিয়েছে। এ সময় কোনো ব্যান্ড বা সমর্থক থাকবে না।

 

বার্নহাম সব পক্ষকে ‘শান্ত থাকার’ আহ্বান জানান। বিবিসি টেলিভিশনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, উত্তর আয়ারল্যান্ডে ‘বড় ধরণের অগ্রগতি’ হয়েছে। ‘আমরা চাই না পরিস্থিতি আবার পেছনের দিকে ফিরে যাক।’

 

প্রধানত ক্যাথলিক ও আয়ারল্যান্ডপন্থী রিপাবলিকান এবং প্রোটেস্ট্যান্ট ও যুক্তরাজ্যপন্থী ইউনিয়নপন্থীদের মধ্যে উত্তর আয়ারল্যান্ডে তিন দশক ধরে সংঘাত চলেছে। ১৯৯০-এর দশকের শেষ দিকে গারভাঘি রোড এ সংঘাতের অন্যতম প্রধান উত্তেজনাকেন্দ্রে পরিণত হয়।

 

রোববার ভোরে বেলফাস্টের ২৫ মাইল দক্ষিণ-পশ্চিমে পোর্টাডাউনের গারভাঘি রোড এলাকায় প্রায় ২ হাজার মানুষ হেঁটে সমাবেশ করেন। অরেঞ্জ অর্ডারের মিছিল ঠেকাতেই তারা পাল্টা প্রতিবাদে অংশ নেন।

 

এ সময় সেখানে বিপুলসংখ্যক নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন ছিল। এএফপির এক সংবাদদাতা জানান, পুলিশ একটি গির্জা হলে অরেঞ্জ অর্ডারের সমাবেশ আটকে রাখে।

 

আইরিশ রিপাবলিকান দল সিন ফেইনের নেত্রী ও উত্তর আয়ারল্যান্ডের ফার্স্ট মিনিস্টার মিশেল ও’নিল গভীর রাতে দেওয়া আদালতের রায়ের নিন্দা জানান। ওই রায়ে মিছিলের অনুমতি দেওয়া হয়।

 

ও’নিল বলেন, ‘আজ রাতে আমাদের বার্তা স্পষ্ট। আর পেছনে ফেরার সুযোগ নেই। আগামীকালও নয়। কখনোই নয়।’

 

তিনি বলেন, ‘অনাকাঙ্ক্ষিত এই সাম্প্রদায়িক মিছিলের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার গারভাঘি রোডের বাসিন্দাদের অধিকারকে’ তিনি সমর্থন করেন।

 

পাল্টা প্রতিবাদকারীদের সঙ্গে হাঁটার সময় সিন ফেইনের প্রেসিডেন্ট মেরি লু ম্যাকডোনাল্ড সাংবাদিকদের বলেন, ‘সাম্প্রদায়িক হয়রানি থেকে মুক্ত হয়ে বেঁচে থাকার অধিকার রক্ষায় বাসিন্দা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠী রাস্তায় নেমেছে।’

 

১৯৯৮ সালের গুড ফ্রাইডে শান্তি চুক্তির পর উত্তর আয়ারল্যান্ডে ‘দ্য ট্রাবলস’ নামে পরিচিত সংঘাতের অবসান ঘটে। এরপর থেকে ‘অনেক অগ্রগতি হয়েছে। এটি ছিল বৈপ্লবিক পরিবর্তন। মানুষের জীবন মৌলিকভাবে বদলে গেছে’ বলে মন্তব্য করেন ম্যাকডোনাল্ড। তিনি বলেন, ‘আমরা আর পেছনে ফিরছি না।’

 

মিছিলটি শেষ মুহূর্তের একাধিক আইনি চ্যালেঞ্জও পার করেছে।

 

শনিবার বেলফাস্ট হাইকোর্টের এক বিচারক সাময়িকভাবে মিছিলটি বন্ধ করে দেন। দীর্ঘদিনের এ বিরোধ উত্তর আয়ারল্যান্ডজুড়ে ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে সতর্ক করে তিনি সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে ‘অতল গহ্বরের কিনারা থেকে সরে আসার’ আহ্বান জানান।

 

তবে মধ্যরাতের কিছুক্ষণ আগে তিন বিচারকের একটি আপিল আদালত ওই নিষেধাজ্ঞা বাতিল করে দেন। আদালত বলেন, হাইকোর্টের বিচারক আইনের ভুল ব্যাখ্যা করেছিলেন।

 

মূল আইনি চ্যালেঞ্জটি আবার হাইকোর্টে পাঠানো হয়েছে। তবে আপিল আদালতের রায়ের ফলে রোববার সকাল ৮টায় মিছিলটি শুরু করার আর কোনো বাধা থাকল না।

 

ব্রিটিশপন্থী ডেমোক্রেটিক ইউনিয়নিস্ট পার্টির স্থানীয় এমপি কার্লা লকহার্ট আপিল আদালতের রায় বাতিলকে ‘ভূমিকম্পসম’ ঘটনা বলে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, বাসিন্দাদের ভয় পাওয়ার কিছু নেই।

 

তিনি বলেন, ‘৩৫ জন মানুষ কোনো ব্যান্ড ছাড়াই নীরবে এবং সুশৃঙ্খলভাবে একটি রাস্তা দিয়ে হাঁটবে। এতে ভয় পাওয়ার কিছু নেই।’

 

মিছিলকারীরা যে গির্জায় যাতায়াত করেন, সেই গির্জার নাম অনুসারে এ সংঘাত ‘ড্রামক্রি বিরোধ’ নামে পরিচিত। ১৯৯০-এর দশকের শেষ দিকে এটি বড় ধরণের উত্তেজনাকেন্দ্রে পরিণত হয়।

 

মিছিলটি জোর করে আয়োজনের চেষ্টা কিংবা তা ঠেকানোর উদ্যোগ বারবার গুরুতর বিশৃঙ্খলার জন্ম দিয়েছে।

১৯৯৮ সালে প্যারেডস কমিশন প্রতিষ্ঠিত হয়। ওই বছরই গুড ফ্রাইডে চুক্তির মাধ্যমে ব্রিটিশ শাসন নিয়ে তিন দশক ধরে চলা ‘দ্য ট্রাবলস’ নামে পরিচিত সংঘাতের মূলত অবসান ঘটে।

 

ওই বছর কমিশন অরেঞ্জ অর্ডারকে নির্ধারিত পথের শেষ পর্যন্ত মিছিল করতে বাধা দেয়। এরপর থেকে সংগঠনটির পরবর্তী সব আবেদনও ধারাবাহিকভাবে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে।

 

আগস্টে বিষয়টি আবার সামনে আসে। সে সময় প্রক্রিয়াগত ত্রুটির কারণে হাইকোর্ট কমিশনের সর্বশেষ নিষেধাজ্ঞা বাতিল করেন। তবে আদালত গারভাঘি রোড দিয়ে মিছিল করার অরেঞ্জ অর্ডারের অধিকার রয়েছে—এমন কোনো রায় দেননি।

 

এরপর অরেঞ্জ অর্ডার নতুন করে আবেদন করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে শুক্রবার সীমিত পরিসরে মিছিলের অনুমতি দেওয়া হয়।

 

অরেঞ্জ অর্ডার একটি ব্রিটিশপন্থী সংগঠন। ১৬৮৯ সালে ক্যাথলিক রাজা দ্বিতীয় জেমসের কাছ থেকে ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড ও আয়ারল্যান্ডের সিংহাসন দখল করা প্রোটেস্ট্যান্ট ডাচ রাজা উইলিয়াম অব অরেঞ্জের নাম অনুসারে সংগঠনটির নামকরণ করা হয়েছে।