কড়া নিরাপত্তায় রূপপুরে পৌঁছাল ইউরেনিয়ামের আরও এক চালান

নিজস্ব প্রতিবেদক:

পাবনার ঈশ্বরদীতে নির্মাণাধীন রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দ্বিতীয় ইউনিটের জন্য ৪১ টন পারমাণবিক জ্বালানির তৃতীয় চালান প্রকল্প এলাকায় এসে পৌঁছেছে। মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) সকাল ৮টার দিকে সেনাবাহিনীর কঠোর নিরাপত্তার বলয়ের মধ্য দিয়ে জ্বালানিবাহী গাড়িগুলো নির্ধারিত কেন্দ্রে প্রবেশ করে।

এর আগে সোমবার (২৬ অক্টোবর) সকালে রাশিয়া থেকে বিশেষ ফ্লাইটে জ্বালানিবাহী বিমানটি ভারতের দিল্লি হয়ে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। ওই চালানে ১২টি টিপিএসে মোট ৪১ টন পারমাণবিক জ্বালানি আনা হয়েছে।

মঙ্গলবার ভোরে বিমানবন্দর থেকে তিনটি লরিতে করে জ্বালানি রূপপুরের উদ্দেশে রওনা হয়। সেনাবাহিনীর কঠোর নিরাপত্তায় গাড়িগুলো বঙ্গবন্ধু সেতু পার হয়ে নাটোরের বনপাড়া ও পাবনার ঈশ্বরদীর দাশুড়িয়া হয়ে নিরাপদে প্রকল্প এলাকায় পৌঁছায়। যাত্রাপথে মহাসড়কের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে পুলিশ সদস্যদের দায়িত্ব পালন করতে দেখা যায়। সেনাবাহিনীর পাশাপাশি এসআরবি ও গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরাও এই সার্বিক নিরাপত্তায় নিয়োজিত ছিলেন।

পুলিশ ও প্রকল্পসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বিশেষ এই নিরাপত্তাব্যবস্থার মাধ্যমেই মূলত ঢাকা থেকে সড়কপথে জ্বালানি পরিবহন করা হয়। এই সময়ে সম্ভাব্য যানজট এড়াতে মহাসড়কে সাময়িকভাবে ভারী যানবাহন চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছিল।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, রূপপুরের দ্বিতীয় ইউনিটের জন্য মোট সাতটি কার্গোতে ১৬৩টি ইউরেনিয়াম অ্যাসেম্বলি আনার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি প্রথম ইউনিটে জ্বালানি পুনঃস্থাপনের জন্য দুটি কার্গোতে আরও ৪৮টি ইউরেনিয়াম অ্যাসেম্বলি দেশে আনার কথা রয়েছে। দ্বিতীয় ইউনিটের এই তৃতীয় চালানটি মূলত সেই সামগ্রিক সরবরাহ কার্যক্রমেরই একটি অংশ।

আসন্ন নভেম্বর ও ডিসেম্বরের মধ্যে রাশিয়া থেকে আরও সাতটি ফ্লাইটে জ্বালানি দেশে আনার পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত পরিকল্পনা অনুযায়ী এসব চালান কাজাখস্তান, তুর্কমেনিস্তান, পাকিস্তান, আফগানিস্তান ও ভারত হয়ে বাংলাদেশে এসে পৌঁছানোর কথা রয়েছে।

রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক শক্তি করপোরেশন রসাটমের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে জ্বালানি সরবরাহের পুরো প্রক্রিয়া সফলভাবে শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

এর আগে ২০২৩ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের জ্বালানি প্রথম দেশে এসে পৌঁছায়। ওই বছরের অক্টোবর ও নভেম্বর মাসে আরও চারটি চালানের মাধ্যমে অতিরিক্ত জ্বালানি প্রকল্প এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে চলতি বছরের মে মাসে প্রথম ইউনিটের পারমাণবিক চুল্লিতে জ্বালানি স্থাপনের কাজ সম্পন্ন হয়।

প্রায় দেড় বছর পর প্রথম ইউনিটের ব্যবহৃত জ্বালানির এক-চতুর্থাংশ পরিবর্তন করতে হবে। সেই লক্ষ্যকে সামনে রেখেই গত ৩ অক্টোবর প্রথম ইউনিটের জন্য অতিরিক্ত জ্বালানির একটি চালান রূপপুরে আনা হয়। এরপর গত ২১ অক্টোবর সকালে দ্বিতীয় ইউনিটের দ্বিতীয় চালানের জ্বালানিও প্রকল্প এলাকায় এসে পৌঁছেছিল।

চুক্তি অনুযায়ী, প্রথম তিন বছর রাশিয়া এই কেন্দ্রটির জন্য জ্বালানি সরবরাহ করবে। তবে পরবর্তী সময়ে নির্ধারিত বিরতিতে জ্বালানি পরিবর্তনের জন্য বাংলাদেশকে নিয়ম অনুযায়ী তা আমদানি করতে হবে।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দুটি ইউনিটের মোট উৎপাদনক্ষমতা হচ্ছে ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট। প্রথম ইউনিটে জ্বালানি স্থাপনের কাজ শেষ হলেও বিভিন্ন জটিলতার কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদনের নির্ধারিত সময়সূচি কিছুটা পিছিয়েছে। চলতি মাসেই এই ইউনিটটি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরুর পরিকল্পনা থাকলেও স্বয়ংক্রিয় চাপ প্রশমনব্যবস্থার নিরাপত্তা ভালভে ত্রুটি দেখা দেওয়ায় তা তৎক্ষণাৎ সম্ভব হয়নি। তবে গত ৩০ সেপ্টেম্বর ভালভটির তৃতীয় দফার পরীক্ষামূলক কার্যক্রম সফলভাবে সম্পন্ন হয়। পরবর্তীতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রয়োজনীয় অনুমোদনের পর গত ১১ অক্টোবর প্রকল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা পারমাণবিক বিক্রিয়া শুরু করেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, চলতি সপ্তাহে প্রথম ইউনিটে বি-২ ধাপের ফিজিক্স টেস্টসহ প্রয়োজনীয় সব পরীক্ষা ও কার্যক্রম সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। এসব পরীক্ষার বিস্তারিত প্রতিবেদন ইতিমধ্যে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (বায়েরা) কাছে জমা দেওয়া হয়েছে। সংস্থাটির চূড়ান্ত অনুমোদন পেলে এই ইউনিটটি বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রস্তুতিমূলক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধাপ ‘স্টেজ-সি’ বা ‘পাওয়ার স্টার্টআপে’ প্রবেশ করবে। এই পর্যায়ে ধারাবাহিক নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে কেন্দ্রের বিভিন্ন ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিখুঁতভাবে যাচাই করা হবে।