অনলাইন ডেস্ক:
ফুটবল মাঠের বাইরে চরম এক বিতর্কে জড়িয়ে পড়েছেন ফ্রান্সের তারকা কিলিয়ান এমবাপ্পে। চীনের অবিসংবাদিত সাবেক নেতা মাও সেতুংকে নিয়ে করা এক মন্তব্য নিয়ে দেশটিতে বড় ধরনের ব্যবসায়িক ধাক্কা খেয়েছে ফরাসি এই তারকা। এর জেরে চীনা নাগরিকদের জাতীয় অনুভূতিতে আঘাত লাগার অভিযোগে রিয়াল মাদ্রিদের এই ফরোয়ার্ডের সঙ্গে চুক্তি বাতিল করেছে চীনের দুটি শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান।
চুক্তি বাতিল করা প্রতিষ্ঠান দুটি হলো—চীনের জনপ্রিয় এনার্জি ড্রিংক প্রস্তুতকারক কম্পানি ‘ডংপেং বেভারেজ’ এবং দুগ্ধজাত পণ্যের জায়ান্ট ‘মেংনিউ’।
মঙ্গলবার পৃথক বিবৃতিতে রিয়াল মাদ্রিদের এই ফরোয়ার্ডের সঙ্গে চুক্তি বাতিলের ঘোষণা দেয় প্রতিষ্ঠান দুটি। অনলাইনে একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, যেখানে তাকে সাবেক নেতা মাও সেতুংকে নিয়ে রসিকতা করতে দেখা যায়।
এনার্জি ড্রিংক জায়ান্ট ডংপেং এবং দুগ্ধজাত পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান মেংনিউ জানিয়েছে, চীনা জাতীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার অভিযোগে তারা এমবাপ্পের সঙ্গে তাদের অংশীদারি বাতিল করেছে।
চীনে ১৯৭৬ সালে মারা যাওয়া দেশটির প্রতিষ্ঠাতা নেতা মাওকে নিয়ে রসিকতা করাকে অসম্মানজনক মনে করা হয়। বিষয়টি এখনো দেশটিতে সামাজিকভাবে অত্যন্ত স্পর্শকাতর।
এক বিবৃতিতে ডংপেং জানায়, ‘জাতীয় অনুভূতিতে আঘাত করে এমন যেকোনো আচরণের আমরা কঠোর বিরোধিতা করি এবং এ বিষয়ে আমাদের নীতি একেবারেই শূন্য সহনশীলতার। অবিলম্বে কিলিয়ান এমবাপ্পের সঙ্গে সব ধরনের সহযোগিতা বন্ধ করছি আমরা।’
এবারের ফুটবল বিশ্বকাপ চলাকালে চীনে ডংপেংয়ের স্পোর্টস ড্রিংকের বিজ্ঞাপনে নিয়মিত দেখা গেছে এমবাপ্পেকে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে তৈরি এসব বিজ্ঞাপনে পানীয়টি পান করতে দেখা যায় ফ্রান্স অধিনায়ককে।
এমবাপের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্নের ঘোষণা দিয়েছে মেংনিউও। চীনে বিপুল জনপ্রিয় এই ফরোয়ার্ডের সামাজিক মাধ্যমে অনুসারীর সংখ্যা কয়েক মিলিয়ন।
বিবৃতিতে মেংনিউও প্রতিষ্ঠানটি জানায়, ‘অবিলম্বে কিলিয়ান এমবাপ্পের সঙ্গে আমাদের সব ধরনের সহযোগিতা বন্ধ করা হচ্ছে। চীনা জনগণের অনুভূতিতে আঘাত করে এমন যেকোনো কথা বা কাজের কঠোর বিরোধিতা করে মেংনিউ। এ ধরনের আচরণের ক্ষেত্রে আমাদের নীতি শূন্য সহনশীলতার।’
চীনে এমবাপ্পে এতটাই জনপ্রিয় যে, ভক্তরা তাকে আদর করে ‘গুইগুই’ নামে ডাকেন। চীনা ভাষায় যার অর্থ কচ্ছপ। জনপ্রিয় কার্টুন ও চলচ্চিত্র সিরিজ ‘টিনএজ মিউট্যান্ট নিনজা টার্টলস’-এর একটি মিম থেকে এই ডাকনামের প্রচলন।
তবে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া সাম্প্রতিক একটি ভিডিও ঘিরে সেই জনপ্রিয়তায় ধাক্কা লেগেছে। ভিডিওতে এমবাপ্পেকে বলতে শোনা যায়, ইন্টারনেটে দেখা সবচেয়ে মজার মিমটি ছিল এমন একটি ছবি, যেখানে ডিজিটাল প্রযুক্তির সাহায্যে তার মুখ বসানো হয়েছিল অন্য একজনের মুখের জায়গায়।
‘একজন লোকের ছবিতে আমার মুখ বসানো হয়েছিল। আমার মনে হয়, তিনি চীনের কোনো স্বৈরশাসক।’
ধারণা করা হচ্ছে, এমবাপ্পে মাও সে তুংয়ের ছবিতে নিজের মুখ বসানো একটি মিমের কথা বলছিলেন। সামাজিক মাধ্যমে এমন আরও বেশ কিছু ছবি ছড়িয়েছে, যেখানে বিভিন্ন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের ছবিতে এমবাপ্পের মুখ বসানো হয়েছে।
ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর চীনের সামাজিক মাধ্যম ওয়েইবোতে শুরু হয় তীব্র সমালোচনা। ‘এমবাপ্পের সঙ্গে সহযোগিতা বন্ধ করল ডংপেং বেভারেজ’ শীর্ষক বিষয়টি প্ল্যাটফর্মটির সবচেয়ে আলোচিত বিষয়ে পরিণত হয়।
এক ব্যবহারকারী লিখেন, এমবাপ্পের ‘অত্যন্ত গুরুতর ভুল মন্তব্য সীমা অতিক্রম করেছে। এটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।’
অনেকে ডংপেংয়ের এনার্জি ড্রিংকের বোতল থেকে এমবাপ্পের ছবি সরিয়ে ফেলার দাবিও জানান।
চীনের অন্যতম বড় অনলাইন ফুটবল সংবাদমাধ্যম ডংকিউদি সোমবার সন্ধ্যায় এক বিবৃতিতে এমবাপ্পের মন্তব্যের নিন্দা জানায়।
প্রতিষ্ঠানটির দাবি, তার বক্তব্য ‘চীন ও চীনা জনগণের প্রতি অবমাননাকর’ এবং ‘চীনা ফুটবল সমর্থকসহ দেশটির মানুষের অনুভূতিতে আঘাত করেছে’।
এর আগে গত সেপ্টেম্বরে ফরাসি ক্রীড়া দৈনিক লেকিপকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নিজের ছবি ব্যবহার করে সামরিক স্বৈরশাসকের আদলে তৈরি মিম নিয়ে কথা বলেছিলেন এমবাপ্পে।
সেখানে এসব ছবির কিছু অংশ মজার হলেও ঐতিহাসিকভাবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কর্মকাণ্ডের কারণে অন্য দিকটি মোটেও হাস্যকর নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
‘এর কিছু অংশ মজার। বোঝা যায়, অনেকেই নিছক আনন্দের জন্য এসব করেন। তবে এর আরেকটি দিক ততটা মজার নয়। কারণ, ইতিহাসজুড়ে ওই ব্যক্তিরা যে ক্ষতি করেছেন, তা আমরা জানি।’
‘যারা মানুষ হত্যা করেছেন কিংবা লাখ লাখ মানুষের জীবনে দুর্দশা ডেকে এনেছেন, তাদের সঙ্গে আমার তুলনা করা হচ্ছে। অথচ আমার মনে হয় না, জীবনে কখনো এমন কিছু করেছি।’
ব্যালন ডি’অর পুরস্কার হাতছাড়া হওয়ার এক দিন পরই চীনে এই বিতর্কে জড়ালেন ২৭ বছর বয়সি এমবাপ্পে। সোমবার ফুটবলের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ব্যক্তিগত পুরস্কারের লড়াইয়ে হ্যারি কেইনের পেছনে দ্বিতীয় হন তিনি।
তবে স্পর্শকাতর রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে মন্তব্যের জেরে চীনে আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনের তারকাদের বিতর্কে জড়ানোর ঘটনা এবারই প্রথম নয়।
২০২৩ সালে একটি ভিডিওতে তাইওয়ানকে দেশ হিসেবে উল্লেখ করে চীনের সামাজিক মাধ্যমে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন এনবিএর সাবেক তারকা ডোয়াইট হাওয়ার্ড। ওই ভিডিওতে তার সঙ্গে ছিলেন তাইওয়ানের তৎকালীন ভাইস প্রেসিডেন্ট ও বর্তমান প্রেসিডেন্ট লাই চিং-তে।
চীন তাইওয়ানকে নিজেদের ভূখণ্ড বলে দাবি করে। দ্বীপটির নিয়ন্ত্রণ নিতে প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগের হুমকিও দিয়ে রেখেছে বেইজিং।
এর আগে ২০১৯ সালে হংকংয়ের বিক্ষোভকারীদের সমর্থনে সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট দিয়ে বিতর্কে জড়ান হিউস্টন রকেটসের তৎকালীন জেনারেল ম্যানেজার ড্যারিল মোরি।
ওই ঘটনার পর এনবিএর সঙ্গে পৃষ্ঠপোষকতা চুক্তি স্থগিত করে চীনের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। দেশটির টেলিভিশনে এক বছরের জন্য বন্ধ রাখা হয় এনবিএর ম্যাচ সম্প্রচারও।











