তাইওয়ানের জলসীমার আশেপাশে শনাক্ত অর্ধশতাধিক চীনা যুদ্ধজাহাজ

অনলাইন ডেস্ক:

জাপানের দক্ষিণাঞ্চল থেকে শুরু করে তাইওয়ান হয়ে ফিলিপাইনের কাছাকাছি বিস্তৃত বিশাল সমুদ্রসীমায় চীনের ৫০টিরও বেশি নৌবাহিনী ও সরকারি জাহাজের উপস্থিতি শনাক্ত করেছে তাইওয়ান। এসব জাহাজের এই গতিবিধি শুধু নিজেদের নয়, বরং জাপান ও ফিলিপাইনের নিরাপত্তার জন্যও বড় ধরনের উদ্বেগজনক বিষয় হিসেবে দেখছে তাইপে। এমন পরিস্থিতিতে চীনা যুদ্ধজাহাজ ও কোস্টগার্ডের সব ধরনের গতিবিধি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি সেগুলোর অবস্থান মানচিত্রের মাধ্যমে প্রকাশ্যে নিয়ে এসেছে তাইওয়ান।

গত বুধবার (২৮ অক্টোবর) তাইওয়ানের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের মহাসচিব জোসেফ উ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে একটি মানচিত্র প্রকাশ করেন, যেখানে মোট ৫৩টি চীনা জাহাজের সুনির্দিষ্ট অবস্থান চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩৪টি ছিল দেশটির নৌবাহিনীর নিজস্ব যুদ্ধজাহাজ, যার তালিকায় চীনের বহুল আলোচিত বিমানবাহী রণতরি লিয়াওনিংও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

জোসেফ উ আরও জানান যে, চীনা জাহাজগুলোর প্রতিটি কার্যক্রম তাইওয়ান অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করে চলেছে। তার মূল্যায়ন অনুযায়ী, একই সময়ে তাইওয়ান, জাপান এবং ফিলিপাইনের মতো দেশগুলোর জন্য এ ধরনের সামরিক তৎপরতা স্পষ্ট ও সরাসরি নিরাপত্তা হুমকি তৈরি করছে।

প্রকাশিত মানচিত্রটিতে পরিষ্কার দেখা যায় যে, লিয়াওনিংয়ের নেতৃত্বাধীন শক্তিশালী যুদ্ধজাহাজের বহরটি তখন ফিলিপাইনের পূর্বদিকে অবস্থান করছিল। পাশাপাশি, আরও কয়েকটি চীনা জাহাজ তাইওয়ানের পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলের অত্যন্ত কাছাকাছি অবস্থান করছিল। এমনকি জাপানের দক্ষিণ উপকূলের কাছাকাছি অঞ্চলেও তিনটি জাহাজের উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়েছিল, যা এর আগে গত মে মাসেও একই ধরনের মানচিত্র প্রকাশের স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়।

তবে চীনের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে, তাদের এই সমস্ত সামরিক তৎপরতা মূলত নিয়মিত প্রশিক্ষণের একটি অংশ মাত্র। গত বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ঝাং শিয়াওগাং সাংবাদিকদের জানান যে, পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে লিয়াওনিংয়ের এই মহড়া সম্পূর্ণ স্বাভাবিক একটি সামরিক কার্যক্রম। দূরবর্তী সমুদ্র এলাকায় দীর্ঘ সময় ধরে সামরিক অভিযান পরিচালনার সক্ষমতা যাচাই করাই এর মূল উদ্দেশ্য এবং কোনো নির্দিষ্ট দেশকে সুনির্দিষ্টভাবে লক্ষ্য করে এই মহড়া চালানো হচ্ছে না।

এদিকে জাপানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় থেকেও জানানো হয়েছে যে, গত মঙ্গলবার তিনটি চীনা যুদ্ধজাহাজ এবং একটি কোস্টগার্ড জাহাজের গতিবিধি তারা সফলভাবে শনাক্ত করেছে। এই জাহাজগুলো পরবর্তীতে জাপানের কিউশু দ্বীপের কাছাকাছি অবস্থিত ওসুমি প্রণালি সাফল্যের সঙ্গে অতিক্রম করে প্রশান্ত মহাসাগরের উন্মুক্ত জলরাশির দিকে চলে যায়।

এর আগে চলতি মাসেই চীন আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছিল যে, লিয়াওনিং একটি নিয়মিত সামরিক প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে অংশ নিচ্ছে। বেইজিংয়ের পক্ষ থেকে দৃঢ়ভাবে দাবি করা হয় যে, এই মহড়ার সঙ্গে অন্য কোনো নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা জড়িত নেই।

সাম্প্রতিক সময়ে জাপান এবং ফিলিপাইনের সঙ্গে চীনের কূটনৈতিক ও সামরিক উত্তেজনা লক্ষণীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে, তাইওয়ানের প্রতি জাপানের ক্রমবর্ধমান সমর্থন নিয়ে বেইজিং তীব্র অসন্তুষ্ট। অন্যদিকে, দক্ষিণ চীন সাগরের বিভিন্ন কৌশলগত এলাকা নিয়ে ফিলিপাইনের সঙ্গেও চীনের বিরোধ দিন দিন আরও বেশি জটিল আকার ধারণ করছে।

গত বৃহস্পতিবার তাইপেতে পার্লামেন্টের বাইরে উপস্থিত সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তাইওয়ানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ওয়েলিংটন কু স্পষ্ট ভাষায় জানান যে, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের শান্তি ও স্থিতিশীলতা যেকোনো উপায়ে বিঘ্নিত করতে পারে, এমন কোনো শক্তি প্রদর্শন তারা দেখতে চান না।

তাইওয়ানের একজন জ্যেষ্ঠ নিরাপত্তা কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন যে, ফিলিপাইন সাগরে নিজেদের নির্ধারিত প্রশিক্ষণ সফলভাবে শেষ করে লিয়াওনিংয়ের নেতৃত্বাধীন এই বিশাল বহরটি উত্তর দিকে জাপানের দিকে অগ্রসর হয় কি না, তা তারা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছেন। তিনি আরও যোগ করেন যে, এই বহরটি যদি শেষ পর্যন্ত উত্তরমুখী হয়, তবে তা জাপানের সামগ্রিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর বাড়তি ও বড় ধরনের চাপ তৈরির একটি সুনির্দিষ্ট কৌশল হতে পারে।

চীন সবসময়ই তাইওয়ানকে নিজেদের অবিচ্ছেদ্য ভূখণ্ডের অংশ বলে দাবি করে আসছে এবং দ্বীপটির স্বাধীনতাকে বেইজিং কখনোই স্বীকৃতি দেয় না। তবে এর বিপরীতে তাইওয়ান সরকারের সুনির্দিষ্ট অবস্থান হলো, এই দ্বীপটির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করার পূর্ণ ও একমাত্র অধিকার কেবল সেখানকার সাধারণ জনগণেরই রয়েছে। তাইওয়ানের জোর দাবি, তাদের নিজস্ব এই ভূখণ্ডের ওপর বেইজিংয়ের কোনো ধরনের সার্বভৌমত্বের বৈধ অধিকার নেই।

এদিকে, আসন্ন বছর অর্থাৎ আগামী বছরই চীন তাইওয়ানের বিরুদ্ধে কোনো বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালাতে পারে—এমন প্রবল আশঙ্কা মাথায় রেখে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে নিজেদের সামরিক প্রস্তুতি ব্যাপকহারে জোরদার করে চলেছে মার্কিন সেনাবাহিনী। গত মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) হাওয়াইয়ে আয়োজিত এক বিশেষ ফোরামে ঠিক এই কথাটিই অত্যন্ত জোরালোভাবে তুলে ধরেন প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সেনাবাহিনীর কমান্ডার রোনাল্ড ক্লার্ক।

মার্কিন সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে আসা এমন বার্তার তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়ে তাইওয়ানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ওয়েলিংটন কু বলেন যে, যেকোনো সম্ভাব্য হুমকি সফলভাবে মোকাবিলা করার জন্য তার দেশ নিজস্ব প্রতিরক্ষা এবং প্রতিরোধ সক্ষমতা আরও অনেক বেশি শক্তিশালী করার কাজ নিরলসভাবে চালিয়ে যাচ্ছে। তিনি আবারও স্মরণ করিয়ে দেন যে, তাইওয়ানকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনতে সামরিক শক্তি প্রয়োগের বিকল্প পথটি চীন কখনোই পুরোপুরি বা চিরতরে বাদ দেয়নি।