কাল পবিত্র আশুরা, রাজধানীতে বের হবে ৬৩ তাজিয়া মিছিল

নিজস্ব প্রতিবেদক:

কারবালার শোকগাথা স্মরণে শুক্রবার (২৬ জুন) পালিত হবে পবিত্র আশুরা। দিনটি ঘিরে রাজধানী ঢাকায় ৬৩টি তাজিয়া মিছিলের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। পুরান ঢাকার হোসেনী দালানসহ বিভিন্ন ইমামবাড়ায় এরই মধ্যে ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে তাজিয়া মিছিল ও সংশ্লিষ্ট কর্মসূচি ঘিরে বহুমাত্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশ, ডিএমপি।

 

মুসলিম বিশ্বের কাছে ১০ মহররম ত্যাগ, শোক ও সত্যের পক্ষে অবিচল থাকার প্রতীক। ৬৮০ খ্রিস্টাব্দে ইরাকের কারবালার প্রান্তরে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর দৌহিত্র হযরত ইমাম হোসাইন (রা.) এবং তাঁর পরিবারের সদস্যরা ইয়াজিদের বাহিনীর বিরুদ্ধে অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গিয়ে শাহাদত বরণ করেন। সেই স্মৃতিকে ধারণ করেই প্রতি বছর বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পবিত্র আশুরা পালিত হয়।

 

রাজধানীতে এ উপলক্ষে সবচেয়ে বড় আয়োজনের কেন্দ্র পুরান ঢাকার হোসেনী দালান। সেখানে শিয়া সম্প্রদায়ের অনুসারী, ভক্ত ও দর্শনার্থীদের উপস্থিতি ইতোমধ্যে বেড়েছে। কেউ নামাজ ও ইবাদতে সময় কাটাচ্ছেন, কেউ কারবালার শোকস্মৃতি স্মরণ করে আবেগাপ্লুত হচ্ছেন। অনেকের ভাষায়, আশুরা শুধু শোকের দিন নয়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানোরও এক অনন্য শিক্ষা।

 

এক দর্শনার্থী বলেন, “এখানে এলেই মনটা ভারী হয়ে যায়। কারবালার ঘটনা মনে হলে কষ্টে বুক ভরে ওঠে।” আরেকজনের ভাষায়, “ইমাম হোসাইন আহলে বাইতের সদস্য। তাঁর আত্মত্যাগ মুসলিমদের জন্য বড় শিক্ষা। ১০ মহররম আমাদের জন্য গভীর শোকের দিন।”

 

হোসেনী দালান ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের তত্ত্বাবধায়ক মোহাম্মদ ফিরোজ হোসেন জানিয়েছেন, এবার আশুরার সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। তিনি বলেন, “প্রশাসনের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস পেয়েছি। সার্বিক নিরাপত্তা থাকবে। ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মধ্যেই আমরা কর্মসূচিগুলো সম্পন্ন করতে চাই।” তাঁর ভাষায়, কারবালার শিক্ষা হলো সত্যের পথে অবিচল থাকা।

 

পবিত্র আশুরাকে ঘিরে নিরাপত্তা জোরদার করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ। ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, রাজধানীর ২৮টি ইমামবাড়ার উদ্যোগে ১ থেকে ১০ মহররম পর্যন্ত মোট ৬৩টি তাজিয়া মিছিল অনুষ্ঠিত হবে। প্রতিটি মিছিলের জন্য আলাদা রুট ও নিরাপত্তা পরিকল্পনা করা হয়েছে। তিনি বলেন, “আমরা সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় আছি। যেকোনো ধরনের নাশকতা বা অপ্রীতিকর ঘটনা প্রতিরোধে সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন রয়েছে।”

 

ডিএমপির তথ্য অনুযায়ী, তাজিয়া মিছিল ও ধর্মীয় সমাবেশে ড্রোন, সিসিটিভি, আর্চওয়ে গেট, মেটাল ডিটেক্টর ও ম্যানুয়াল চেকিংয়ের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। পাশাপাশি সোয়াট, বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট, ডগ স্কোয়াড, ডিবি ও অন্যান্য বিশেষায়িত ইউনিটকে স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। হোসেনী দালান, আঞ্জুমান হায়দারী, বড় কাটারা ইমামবাড়া, শিয়া মসজিদ, বিবিকা রওজা, মিরপুর ও মোহাম্মদপুরের বিহারি ক্যাম্পসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলো থাকবে বিশেষ নজরদারিতে।

 

ডিএমপি কমিশনার আরও জানান, মিছিলে ব্যবহৃত নিশানের উচ্চতা ১২ ফুটের বেশি হতে পারবে না। কোনো ধরনের ধারালো অস্ত্র, ধাতব বস্তু, দাহ্য পদার্থ, ছুরি, চাকু, লাঠি, তরবারি, বল্লম, ব্যাগ, সুটকেস বা পোটলা নিয়ে অংশ নেওয়া যাবে না। উচ্চশব্দের যন্ত্র, পিএ সিস্টেম, ঢাকঢোল ও আতশবাজিও নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

 

জানা গেছে, শুক্রবার (২৬ জুন) সকাল ১০টায় হোসেনী দালান থেকে প্রধান তাজিয়া মিছিল বের হবে। বকশীবাজার, আজিমপুর, নীলক্ষেত, সায়েন্স ল্যাবরেটরি ও ধানমন্ডি হয়ে তা কারবালায় গিয়ে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। এছাড়া রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে দিনভর আরও তাজিয়া মিছিল বের হবে।

 

ধর্মীয় শোকানুষ্ঠান, ঐতিহাসিক স্মরণ আর কড়া নিরাপত্তার এই সমন্বয়ে রাজধানী ঢাকায় এবারও পালিত হতে যাচ্ছে পবিত্র আশুরা।