বেইজিংয়ে আজ তারেক-লি বৈঠক, সই হতে পারে ১৫টির বেশি চুক্তি

নিজস্ব প্রতিবেদক:

বাংলাদেশ ও চীনের সম্পর্কের নতুন দিকচিহ্ন নির্ধারণে বেইজিংয়ে বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) মুখোমুখি বসছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং। গ্রেট হল অব দ্য পিপলে অনুষ্ঠিত এই দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে দুই দেশের মধ্যে অন্তত ১৫টি সমঝোতা স্মারক ও চুক্তি সই হতে পারে। আলোচনার টেবিলে থাকছে চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল, মোংলা বন্দরের সম্প্রসারণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা প্রকল্পসহ একাধিক কৌশলগত বিষয়।

 

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, বৈঠকে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুই উঠে আসবে। এর মধ্যে রয়েছে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়ানো, বড় অবকাঠামো প্রকল্পে চীনের অর্থায়ন, স্বাস্থ্য খাতে সহযোগিতা, এমনকি আঞ্চলিক অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক প্ল্যাটফর্মে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের প্রশ্নও। ঢাকা চীনের কাছে নবায়নযোগ্য জ্বালানি সহযোগিতা বাড়ানোর পাশাপাশি রিজিওনাল কমপ্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ, ব্রিকস ও সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশনে যোগদানের বিষয়ে সমর্থন চাইতে পারে বলেও জানা গেছে।

 

এটি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তারেক রহমানের প্রথম চীন সফর। মালয়েশিয়ায় দুই দিনের সফর শেষে তিনি সোমবার (২২ জুন) চীনের দালিয়ানে পৌঁছান। মঙ্গলবার (২৩ জুন) ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ১৭তম বার্ষিক সভা ‘নিউ চ্যাম্পিয়নস ২০২৬’-এ অংশ নেন। এরপর বুধবার (২৪ জুন) সন্ধ্যায় দালিয়ান থেকে বুলেট ট্রেনে বেইজিং পৌঁছান তিনি। বেইজিংয়ের চাউমিং রেলওয়ে স্টেশনে তাকে স্বাগত জানান চীনের জেনারেল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব কাস্টমসের মন্ত্রী ও চীনের কমিউনিস্ট পার্টির কমিটির সেক্রেটারি সুন মেইজুন। সেখানে প্রধানমন্ত্রী ও তার সহধর্মিণীকে লাল গালিচা সংবর্ধনা ও গার্ড অব অনারও দেওয়া হয়।

 

বৃহস্পতিবারের বৈঠকে সই হতে যাওয়া চুক্তিগুলোর মধ্যে চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল, মোংলা বন্দরের সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়ন, পরিবেশবান্ধব জ্বালানি সহযোগিতা, স্বাস্থ্য খাতে প্রকল্প বাস্তবায়নসহ বেশ কিছু বিষয় রয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা প্রকল্প এবং চীনের গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভে বাংলাদেশের যোগ দেওয়ার বিষয়েও আলোচনা হতে পারে। একই সঙ্গে পদ্মা ব্যারাজ, তিস্তা ব্যারাজ এবং চীনা অর্থায়নে বাংলাদেশে নির্মাণাধীন বিশেষায়িত হাসপাতালগুলোর অগ্রগতিও আলোচনায় আসতে পারে।

 

প্রধানমন্ত্রীর দিনসূচিতে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক দুই ধরনের কর্মসূচিই রাখা হয়েছে। বৃহস্পতিবার তিনি ‘বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ফোরাম’-এ অংশ নেবেন। সেখানে চীনা বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে বিনিয়োগের আহ্বান জানাবেন তিনি। বিনিয়োগ সম্মেলনে বাংলাদেশের বিনিয়োগ সম্ভাবনা, অগ্রাধিকার খাত এবং নতুন বাজেটে ঘোষিত বিনিয়োগবান্ধব নীতিমালা তুলে ধরা হবে। চীনের শীর্ষ শিল্পগোষ্ঠী, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, আর্থিক খাতের প্রতিনিধিসহ শতাধিক বিনিয়োগকারী এতে অংশ নেবেন বলে আশা করা হচ্ছে।

 

এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলাদাভাবে সাক্ষাৎ করবেন চায়না ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট কো-অপারেশন এজেন্সির চেয়ারম্যান, চায়না এক্সিম ব্যাংকের চেয়ারম্যান, চীনের কমিউনিস্ট পার্টির আন্তর্জাতিক বিভাগের প্রধান এবং চীনের পানিসম্পদমন্ত্রী। চেরি গ্রুপ, হান্ডা গ্রুপ ও চায়নাটেক্স করপোরেশনের শীর্ষ কর্মকর্তারাও তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক করবেন। দিনশেষে তার সম্মানে ভোজসভার আয়োজন করবেন চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং।

 

সফরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় নির্ধারিত আছে শুক্রবার (২৬ জুন)। এদিন ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেসের স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান ঝাও লেজির সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন প্রধানমন্ত্রী। পরে গ্রেট হল অব দ্য পিপলে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে তার দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের পাশাপাশি আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বিভিন্ন ইস্যুও উঠে আসতে পারে। দেশে ফেরার আগে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির জাদুঘর পরিদর্শনের কথাও রয়েছে তার সফরসূচিতে।

 

চীনে অবস্থানকালে কূটনৈতিক যোগাযোগের পাশাপাশি আঞ্চলিক অংশীদারদের সঙ্গেও সম্পর্ক জোরদারের চেষ্টা চালাচ্ছেন তারেক রহমান। দালিয়ানে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের সম্মেলনের ফাঁকে কাজাখস্তানের প্রধানমন্ত্রী ওলজাস বেকতেনভের সঙ্গে বৈঠক করেন তিনি। সেখানে দুই দেশ ঢাকা ও আস্তানায় স্থায়ী কূটনৈতিক মিশন স্থাপনের বিষয়ে নীতিগতভাবে একমত হয়। বাংলাদেশ থেকে কাজাখস্তানে দক্ষ শ্রমিক পাঠানো, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, ডিজিটাল অবকাঠামো, প্রযুক্তি, কৃষি ব্যবসা ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতে সহযোগিতার বিষয়েও আলোচনা হয়।

 

বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন তারেক রহমানের এই সফরকে ‘ঐতিহাসিক তাৎপর্যপূর্ণ’ বলে উল্লেখ করেছেন। এক নিবন্ধে তিনি লিখেছেন, “অতীত অর্জনের ওপর ভিত্তি করে ভবিষ্যতের পথরেখা নির্ধারণে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম চীন সফর ঐতিহাসিক তাৎপর্য বহন করে।” তার ভাষায়, এই সফর চীন-বাংলাদেশ সম্পর্কের উন্নয়নে নতুন গতি আনবে এবং দুই দেশের “ব্যাপক ও কৌশলগত সহযোগিতার সম্পর্ককে আরও অর্থবহ ও গুণগত মানে উন্নীত করবে।”

 

সব মিলিয়ে, বেইজিংয়ে বৃহস্পতিবারের তারেক-লি বৈঠক কেবল আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সাক্ষাৎ নয়, বরং বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের পরবর্তী ধাপের ভিত্তি গড়ে দেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হিসেবেই দেখা হচ্ছে। সই হতে যাওয়া চুক্তিগুলোর পরিসর ও আলোচ্যসূচি দেখে স্পষ্ট, অর্থনীতি, অবকাঠামো, বিনিয়োগ, জ্বালানি ও আঞ্চলিক কৌশলগত সহযোগিতাকে সামনে রেখেই এই সফর সাজানো হয়েছে।