অনলাইন ডেস্ক:
বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের মারপ্যাচে পড়ে মারাত্মক চাপে রয়েছে দেশের তৈরি পোশাকশিল্প। গত মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) প্রকাশিত নিউইয়র্কভিত্তিক সাময়িকী টাইম ম্যাগাজিনের একটি প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, গ্যাসের তীব্র ঘাটতি, ঘন ঘন লোডশেডিং এবং ডিজেলের ঊর্ধ্বমূল্যের কারণে কারখানাগুলোর উৎপাদন খরচ হু হু করে বাড়ছে এবং ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক কার্যক্রম। সঠিক সময়ে ক্রেতার হাতে পণ্য পৌঁছাতে না পারলে ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া ও পাকিস্তানের মতো প্রতিদ্বন্দ্বী দেশের কাছে বড় অংকের ক্রয়াদেশ হারানোর আশঙ্কা করছেন রপ্তানিকারকরা।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউক্রেন ও ইরান কেন্দ্রিক যুদ্ধপরিস্থিতি আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহের ভঙ্গুর রূপটি উন্মোচন করে দিয়েছে। রাশিয়ার আগ্রাসনের পর থেকেই কলকারখানায় ব্যবহৃত গ্যাসের দাম বেড়েছে ১৫০ শতাংশ আর ডিজেলের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে প্রায় ৭০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এর ওপর ইরান সংঘাত শুরুর জেরে খোলাবাজারে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) দাম এক লাফে প্রায় তিন গুণ হয়েছে। দীর্ঘদিনের দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ঘাটতি এবং অবকাঠামোগত দুর্বলতার কারণে এই জ্বালানি সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে। উল্লেখ্য, দেশের মোট জ্বালানি চাহিদার প্রায় অর্ধেকই মেটানো হয় মধ্যপ্রাচ্য আমদানির মাধ্যমে। কিন্তু হরমুজ প্রণালির ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা এবং দেশের দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের একটিতে অগ্নিকাণ্ডের মতো অনভিপ্রেত ঘটনায় জুলাই ও আগস্ট মাসে এলএনজি আমদানি এক ধাক্কায় ৮৩ শতাংশ কমে যায়।
টাইম ম্যাগাজিনের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, জ্বালানি সংকটের এই নেতিবাচক প্রভাব রাজধানী ছাড়িয়ে ছড়িয়ে পড়েছে দেশের প্রধান শিল্পাঞ্চলগুলোতেও। দেশজুড়ে বিদ্যুতের ঘাটতি ৩ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যাওয়ায় বাধ্য হয়ে বিদ্যুৎ ব্যবহারে লাগাম টেনেছে সরকার। গ্রামাঞ্চলের অনেক এলাকায় দিনে ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎহীন থাকতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। এই শোচনীয় পরিস্থিতিতে বাধ্য হয়েই শিল্পমালিকদের চড়া মূল্যের ডিজেলচালিত জেনারেটরের ওপর ভরসা করতে হচ্ছে।
এ বিষয়ে হা-মীম গ্রুপের তৈরি পোশাক কারখানার বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও পরিবেশগত টেকসই উন্নয়ন বিভাগের প্রধান তনুল চক্রবর্তী টাইম ম্যাগাজিনকে জানান, দেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ অত্যন্ত অনিয়মিত। গ্যাসের পর ডিজেলই তাদের কাছে এখন সবচেয়ে ভরসার জ্বালানি, যেখানে জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ রয়েছে তালিকার তিন নম্বরে। প্রায় ৯০ হাজার কর্মীর এই প্রতিষ্ঠানে প্রতি মাসে ৯৩ লাখ পোশাক তৈরি হয় এবং গ্যাপ, আমেরিকান ঈগল ও জেসি পেনির মতো শীর্ষ আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলো তাদের ক্রেতা। উৎপাদন খরচ সামলে নিয়ে এবং নির্দিষ্ট সময়ে পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করতে তারা সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন, নতুবা ক্রেতারা যেকোনো মুহূর্তে অন্য দেশের দিকে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারেন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই সংকটের জাল শুধু পোশাক খাতের পরিধিতেই সীমাবদ্ধ নয়। বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশেরও বেশি আসে এই খাত থেকে, যার ওপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নির্ভর করে আছে প্রায় ৪০ লাখ মানুষের জীবিকা। ফলে জ্বালানি সংকট প্রলম্বিত হলে উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়বে। সেই সঙ্গে আন্তর্জাতিক খাদ্যনিরাপত্তা পর্যবেক্ষকরাও সতর্ক করে বলেছেন, এর জেরে দেশের ১ কোটি ৮১ লাখ মানুষ অচিরেই তীব্র খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় পড়তে পারেন।
এই সার্বিক পরিস্থিতি মোকাবেলায় গত মাসেই একটি নতুন জ্বালানি রূপরেখা দিয়েছে সরকার। এই পরিকল্পনার আওতায় সৌরবিদ্যুৎ ও কয়লাভিত্তিক প্রকল্পের মাধ্যমে ১২ হাজার ৯৪০ মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো, বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং দেশীয় গ্যাসের সরবরাহ বাড়াতে ৩০০টি নতুন অনুসন্ধান কূপ খননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ইতোমধ্যে ৩১টি কূপ খনন সম্পন্ন হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম এই পরিকল্পনা নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করে জানান, আগামী তিন থেকে চার বছরের মধ্যে এই বিদ্যুৎ সংকটের স্থায়ী সমাধান হতে পারে। তবে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে আমদানি খরচ ও পণ্য পরিবহনের ব্যয় আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।
ফতুল্লা অ্যাপারেলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফজলে শামীম এহসান বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতি সরকারের নীতিনির্ধারকদের জন্যও বেশ কঠিন। মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি বজায় থাকলে পরিস্থিতি অনেকটাই অনুকূলে থাকত। তাই দেশের অর্থনীতি সচল রাখতে জ্বালানিনিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদন বজায় রাখাটাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। সময়মতো সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা না গেলে দেশের প্রধান এই রপ্তানি খাত বিশ্ববাজারে তার দীর্ঘদিনের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান চিরতরে হারাতে পারে।











