মাথাপিছু ঋণের বোঝা বাড়ছে: ২০২৭ সাল নাগাদ প্রতিটি নাগরিকের ঘাড়ে দেড় লাখ টাকা

অনলাইন ডেস্ক:

সরকারের ক্রমবর্ধমান ঋণের বোঝা দেশের অর্থনীতির জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অর্থ বিভাগের প্রাক্কলন অনুযায়ী, বর্তমান ধারায় ঋণ নেওয়া অব্যাহত থাকলে ২০২৬-২৭ অর্থবছর শেষে দেশের প্রতিটি নাগরিকের মাথাপিছু সরকারি ঋণের পরিমাণ দাঁড়াবে প্রায় দেড় লাখ টাকা। ২০২৭ সালের জুন নাগাদ সরকারের মোট ঋণের স্থিতি ২৬ লাখ ৩৩ হাজার ১০০ কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

পরিসংখ্যান বলছে, গত জুন মাস পর্যন্ত দেশের মোট বিদেশি ঋণের পরিমাণ রেকর্ড ১১৪ দশমিক ৯৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। একদিকে বিদেশি ঋণের নতুন অর্থছাড়ের হার আশঙ্কাজনকভাবে কমছে, অন্যদিকে পুরোনো ঋণের সুদ ও আসল পরিশোধের চাপ বাড়ছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে বিদেশি সহায়তার অর্থছাড় আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৬১ শতাংশ কমেছে। বিপরীতে, ঋণ পরিশোধে ব্যয় হয়েছে নতুন অর্থছাড়ের প্রায় ২ দশমিক ৪ গুণ বেশি অর্থ।

অভ্যন্তরীণ উৎস থেকেও সরকারের ঋণ নেওয়ার প্রবণতা ঊর্ধ্বমুখী। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে ব্যাংক খাত থেকে সরকারের নিট ঋণের পরিমাণ প্রায় ২৪ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। সরকারের এই ঋণ গ্রহণের ফলে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ ও ঋণপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

অর্থমন্ত্রী জাতীয় সংসদে জানিয়েছেন, ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত মাথাপিছু ঋণের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ২৯ হাজার ২৩৯ টাকা। অর্থ বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, আগামী দুই বছরে এই অঙ্ক আরও ২১ হাজার টাকা বাড়তে পারে। তবে এটি কোনো ব্যক্তিগত ঋণ নয়, বরং সরকারের মোট ঋণকে জনসংখ্যা দিয়ে ভাগ করে পাওয়া একটি গড় হিসাব মাত্র।

ঋণ বাড়ার এই প্রবণতা আগামী বছরগুলোতেও অব্যাহত থাকার পূর্বাভাস রয়েছে। অর্থ বিভাগের প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০২৭-২৮ অর্থবছর শেষে ঋণের স্থিতি ২৯ লাখ ৫৬ হাজার ৭০০ কোটি টাকা এবং ২০২৮-২৯ অর্থবছর শেষে তা ৩৩ লাখ ৭৭ হাজার ৬০০ কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে। ইতিমধ্যে সরকার তার ঋণঝুঁকিকে ‘নিম্ন’ পর্যায় থেকে ‘মাঝারি’ পর্যায়ে উন্নীত করেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঋণ নেওয়া দোষের কিছু নয়, যদি তা উৎপাদনশীল খাতে ব্যবহৃত হয়। তবে প্রকল্পের দুর্বল পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন বিলম্ব এবং অপচয়ের কারণে ঋণের সুফল পাওয়া নিয়ে সংশয় রয়েছে। এছাড়া টাকার অবমূল্যায়ন ও সুদ পরিশোধের ক্রমবর্ধমান চাপ বাজেটের ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে। চলতি অর্থবছরের বাজেটের প্রায় ১৪ শতাংশই ব্যয় করতে হচ্ছে কেবল ঋণের সুদ পরিশোধে।

পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি এবং ঋণ ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা আনার ওপর জোর দিচ্ছে। অপ্রয়োজনীয় ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমে ঋণ গ্রহণ কমানোর পরিকল্পনা থাকলেও, ক্রমবর্ধমান খেলাপি ঋণ ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে এই লক্ষ্য অর্জন বড় পরীক্ষার মুখে পড়েছে।