ঢাকা রবিবার, ০৮ নভেম্বর ২০২৬
বিজ্ঞাপন 📢 Google AdSense — 728 × 90 Leaderboard Placement

নির্বাচনে ভরাডুবি ও নেতানিয়াহুর চাপ: কোন পথে হাঁটবেন ট্রাম্প?

প্রকাশিত: 7 November 2026, 2:45 pm
ফন্ট:

অনলাইন ডেস্ক:

যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির নজিরবিহীন ভরাডুবি এবং মধ্যপ্রাচ্যনীতি নিয়ে ওয়াশিংটনের রাজনীতিতে শুরু হয়েছে নতুন এক ঝড়। নির্বাচনে পরাজয়ের ধাক্কা সামলাতে না সামলাতেই গত রাতে পেন্টাগনের শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে জরুরি বৈঠকে বসেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এ বিষয়ে ‘জাতীয় নিরাপত্তা দলের সঙ্গে বৈঠক করেছেন ট্রাম্প; ইরান যুদ্ধ নিয়ে শিগগিরই সিদ্ধান্ত আসছে’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, ট্রাম্প আসলে কী সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছেন? নির্বাচনে ভরাডুবির পর ইরানে নতুন করে সামরিক হামলা চালিয়ে নিজেকে ‘বিজয়ী’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইবেন, নাকি নিজের রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে তাকে হিমশিম খেতে হবে?

নোবেলজয়ী সাংবাদিক ও ভূরাজনীতি বিশ্লেষক অ্যালাইজা ম্যাগনেইর সম্প্রতি একটি অনুষ্ঠানে এসে একটি তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করেছেন। তার ভাষায়, ‘ট্রাম্পের হাতে আর কোনো বিকল্প অবশিষ্ট নেই।’

ম্যাগনেইরের এই বক্তব্যের পেছনের ভূরাজনৈতিক হিসাবটি বেশ স্পষ্ট। তার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ট্রাম্প যদি এখন ইরানে হামলা না করেন, তাহলে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর পক্ষে ক্ষমতায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে উঠবে। ইসরাইলি সংবাদমাধ্যমগুলোর সাম্প্রতিক খবর অনুযায়ী, দেশটির আরব দলগুলো গাদি আইজেনকটের জোটকে সমর্থন দিলেও সরাসরি সরকারে যোগ দেবে না। অর্থাৎ, আইজেনকট চাইলে বিকল্প সরকার গঠনের উদ্যোগ নিতে পারেন, যা নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎকে আরও অনিশ্চিত করে তুলতে পারে।

যদিও প্রবীণ সাংবাদিক ও বামপন্থি লেখক গিডিয়ন লেভি বলেছেন, ‘এই দলগুলোর কাউকেই বিশ্বাস করবেন না। তারা সবাই একই রকম।’

ভূরাজনীতির শিক্ষক ও এশীয় অধ্যয়নবিষয়ক গবেষক হিসেবে গিডিয়ন লেভির এই পর্যবেক্ষণকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ মনে করা হচ্ছে। গত এক দশক ধরে তাকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। ইসরাইলের মতো একটি চরমপন্থি রাষ্ট্রে দাঁড়িয়েও গিডিয়ন লেভির মতো মানুষ এখনো প্রচলিত রাজনৈতিক স্রোতের বিপরীতে অবস্থান নিয়ে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি অনাস্থা থাকলেও বর্তমান সমীকরণ বলছে, শেষ পর্যন্ত তারা জোটবদ্ধ হতে পারে। আর তেমনটি হলে নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ বড় ধরনের সংকটে পড়বে।

সম্প্রতি মার্কিন ভূরাজনীতি বিশ্লেষক অ্যান্থনি, এক অধ্যাপক সাহেবের অনুষ্ঠানে এসে মন্তব্য করেছেন, আগামী দুই সপ্তাহে ট্রাম্পকে যেকোনো মূল্যে রাজি করাতে নিজের সর্বশক্তি প্রয়োগ করবেন নেতানিয়াহু।

বাস্তবতার সমীকরণও সেদিকেই ইঙ্গিত করছে। নেতানিয়াহু যদি ট্রাম্পকে রাজি করাতে ব্যর্থ হন, তাহলে ট্রাম্প হয়তো আইনি লড়াইয়ে নিজেকে টিকিয়ে রাখতে পারবেন; কিন্তু নেতানিয়াহুর সামনে অপেক্ষা করতে পারে কারাগারের পথ। অন্যদিকে, ট্রাম্পের নিজের রাজনৈতিক অবস্থাও এখন গভীর সংকটে। কংগ্রেসে ক্ষমতা হারানোর পর তার বিরুদ্ধে অভিশংসন এবং প্রেসিডেন্সি হারানোর ঝুঁকি আরও বেড়ে যেতে পারে।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন সম্প্রতি একটি বিশ্লেষণধর্মী নিবন্ধ প্রকাশ করেছে। সেখানে জেডি ভ্যান্স, মার্কো রুবিওসহ ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির সম্ভাব্য প্রার্থীদের অবস্থান তুলে ধরা হয়েছে। লক্ষণীয় বিষয় হলো, নির্বাচনে পরাজয়ের পর দলের শীর্ষ নেতাদের অনেকেই ট্রাম্পের কাছ থেকে দূরত্ব বজায় রাখছেন এবং প্রকাশ্যে তার সমালোচনা করছেন। গত দুই দশকের মার্কিন রাজনীতিতে এমন দৃশ্য খুব একটা দেখা যায়নি।

নির্বাচনে ভরাডুবির পর ট্রাম্পের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিন পৃষ্ঠার একটি দীর্ঘ বিশ্লেষণ প্রকাশ করেছেন। তার বক্তব্যের মূল নির্যাস হলো, ‘ইরান যুদ্ধের কারণেই আমরা হেরেছি। ভবিষ্যতে এমন পরাজয় এড়াতে হলে সমাধানের শুরুটা করতে হবে ইরান থেকেই।’

ভ্যান্সের বক্তব্যে স্পষ্ট ইঙ্গিত রয়েছে, ইরান যুদ্ধ এখনই বন্ধ করা প্রয়োজন এবং ইসরাইলের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা পররাষ্ট্রনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা জরুরি।

ফ্লোরিডার গভর্নর রন ডি-স্যান্টিস একই সময়ে নিজের অবস্থান জোরালোভাবে তুলে ধরেছেন। তিনি বলেছেন, ফ্লোরিডায় যে সামান্য সাফল্য এসেছে, তা তার নেতৃত্বের কারণেই; ট্রাম্পের জনপ্রিয়তার কারণে নয়—এমনটাই বোঝাতে চেয়েছেন তিনি।

এখন বড় প্রশ্ন, ট্রাম্প কি পারবেন ইসরাইলি লবির চাপ থেকে নিজেকে রক্ষা করতে?

চীনা ভূরাজনীতি বিশ্লেষক ভিক্টর গাও বারবার সতর্ক করে বলেছেন, মোসাদের হাতে এমন কিছু গোপন নথি বা সংবেদনশীল ভিডিও ফুটেজ থাকতে পারে, যা প্রকাশ্যে এলে ট্রাম্প ‘এপস্টিন ফাইলস’সংক্রান্ত বিতর্কে আরও বড় সংকটে পড়তে পারেন। তার এই বক্তব্যের সূত্র ধরে প্রশ্ন উঠছে, ট্রাম্প যদি আবারও ইরানে কোনো উসকানিমূলক সামরিক অভিযান শুরু করেন, তাহলে সেটি কি নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক চাপের ফল হবে?

তবে ট্রাম্পের সামনে আরও বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে। জানুয়ারির ৩ তারিখে ডেমোক্র্যাটরা যদি হাউস ও সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নেয়, তাহলে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে অভিশংসন প্রক্রিয়া শুরু করার পাশাপাশি এপস্টিন ফাইলস বিতর্কও নতুন করে সামনে আসতে পারে।

মার্কিন সংবিধান অনুযায়ী, প্রতিনিধি পরিষদে সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভোটে প্রেসিডেন্টকে অভিশংসিত করা যায়। তবে পদ থেকে অপসারণের জন্য সিনেটে উপস্থিত সদস্যদের দুই-তৃতীয়াংশের সমর্থন প্রয়োজন। ১০০ সদস্যের সিনেটে এর জন্য ৬৭টি ভোট লাগবে। ডেমোক্র্যাটরা যদি ৫৬টি আসন পায়, তাহলে ট্রাম্পকে অপসারণ করতে আরও ১১ জন রিপাবলিকান সিনেটরের সমর্থন প্রয়োজন হবে। নিজ দলের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ বিবেচনায় রিপাবলিকান সিনেটরদের কেউ কেউ তখন ট্রাম্পের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে পারেন।

নিজের দায় স্বীকার না করে ট্রাম্প এখন চারদিকে বলির পাঁঠা খুঁজছেন। কখনো যুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী পিট হেগসেথকে দায়ী করছেন, কখনো আবার অ্যাডমিরাল কুপারের ওপর দোষ চাপাচ্ছেন। এমনকি ট্রাম্প দাবি করেছেন, ‘ভোটে তো আর আমি ছিলাম না, আমি থাকলে জিততাম!’

অথচ নির্বাচনের মাত্র দুই দিন আগেও তিনি বড় গলায় বলেছিলেন, ‘সবাই ভোট দেবে এই ভেবে যে, ব্যালটে আমিও আছি।’ মার্কিন জনগণ সম্ভবত সেটিই বিবেচনায় নিয়েছে এবং নির্বাচনে রিপাবলিকানদের প্রত্যাখ্যান করেছে।

আজ থেকে আট মাস আগে, যখন মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে যুদ্ধ ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, তখনই বলা হয়েছিল—ইরানে এসে ট্রাম্প আটকা পড়বেন। ইরান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের আর কিছু পাওয়ার নেই; বরং হারানোর ঝুঁকিই বেশি।

বর্তমানে ট্রাম্পের সামনে সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ হলো ইরানের বাস্তবতাকে স্বীকার করে সেখান থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া। মার্কিন সাম্রাজ্যের অভ্যন্তরীণ ভঙ্গুরতা আজ বিশ্ববাসীর সামনে ক্রমেই উন্মোচিত হচ্ছে।

সম্প্রতি ডেমোক্র্যাট সিনেটর ক্রিস মারফি সৌদি আরব ও কাতারে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো পরিদর্শন করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন ও পেন্টাগন তাকে অনুমতি দেয়নি। অভিযোগ উঠেছে, ওই ঘাঁটিগুলোতে কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তা আড়াল করতেই এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে ডেমোক্র্যাটদের হাতে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ এলে এসব তথ্য আর গোপন রাখা সম্ভব হবে না।

দিনশেষে ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান—দুই দলই একই সাম্রাজ্যবাদী মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। জো বাইডেন মানবাধিকারের কথা বলে ক্ষমতায় এসেছিলেন, অথচ তার শাসনামলে গাজায় এই শতাব্দীর অন্যতম ভয়াবহ গণহত্যায় ইসরাইলকে সমর্থন ও সামরিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, ট্রাম্প ‘নতুন কোনো যুদ্ধ শুরু করব না’—এমন প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসে ইসরাইলপন্থি লবির প্রভাবে মধ্যপ্রাচ্যকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলেছেন। দুজনকেই তাদের নীতির রাজনৈতিক মূল্য দিতে হচ্ছে।

ইসরাইলি ধনকুবের ও প্রভাবশালী লবিগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক প্রভাবের খেলায় বন্দি হয়ে মার্কিন রাজনৈতিক অভিজাতরা নিজেদের ভবিষ্যৎকেই অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছেন—এমন অভিযোগও ক্রমেই জোরালো হচ্ছে।

অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা ও সামরিক চাপের মধ্যেও ইরান প্রযুক্তি, বিজ্ঞান ও সামরিক সক্ষমতার ক্ষেত্রে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখার চেষ্টা করছে। দেশটির সরকারকে উৎখাত করা তো দূরের কথা, এই অসম সংঘাতের পরিণতিতে দিনশেষে নিজেদের রাজনৈতিক অস্তিত্ব নিয়েই সংকটে পড়তে পারেন ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু।

মন্তব্য করুন