মরুভূমিতে পরিণত হচ্ছে তিস্তা

জেলা প্রতিনিধি:

বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের প্রায় দুই কোটি মানুষের জীবনরেখা তিস্তা নদী আজ ধুঁকছে শেষ নিশ্বাসে। এক সময়ের খরস্রোতা এই নদী এখন বছরের অধিকাংশ সময় শুকনো থাকে। বর্ষায় সাময়িক স্রোতে জেগে ওঠে, কিন্তু শীত এলে পরিণত হয় ধু-ধু বালুচরে। নদীভাঙন, পানিসঙ্কট ও চরগঠনের কারণে তিস্তাপাড়ের কৃষক ও জেলেদের জীবন আজ চরম অনিশ্চয়তায়।

অক্টোবরের শেষ ভাগেই নদী প্রায় পানিশূন্য হয়ে পড়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, গত ১০ দিনে তিস্তা ব্যারেজ পয়েন্টে গড় প্রবাহ নেমে এসেছে মাত্র ১৭ হাজার কিউসেকে, এবং প্রতিদিনই কমছে এই হার। ফলে শুকনো মৌসুম আসার আগেই তিস্তা কার্যত মৃতপ্রায় অবস্থায় পৌঁছেছে।

ভারতের গজলডোবা ব্যারেজ ও বাংলাদেশের দোয়ানী ব্যারেজ নির্মাণের পর থেকেই নদীর প্রাকৃতিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। বিভিন্ন ক্যানেলের মাধ্যমে নদীর পানি সরিয়ে নেওয়ায় তিস্তাপাড়ের জমি ও জনজীবনে নেমেছে মরুকরণের ছায়া।

তিস্তা শুধু একটি নদী নয়, উত্তরবঙ্গের কৃষি, মৎস্য, সংস্কৃতি ও অর্থনীতির ভিত্তি। এই নদীর চরাঞ্চলে একসময় ধান, পাট, ভুট্টা, তিল ও সবজি চাষে ছিল সমৃদ্ধি। কিন্তু ১৯৮৩ সালে ভারতের গজলডোবা ব্যারেজ নির্মাণের পর থেকেই শুষ্ক মৌসুমে পানিসঙ্কট ও বর্ষায় ভয়াবহ বন্যা নিয়মিত দুর্যোগে পরিণত হয়েছে।

পাউবোর হিসেবে, গত এক দশকে তিস্তার ভাঙনে ২০ হাজারেরও বেশি পরিবার বাস্তুচ্যুত হয়েছে। সম্প্রতি লালমনিরহাটের মহিপুর এলাকায় তিস্তা সেতু রক্ষা বাঁধের ৩৫০ মিটার অংশ নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। রাজারহাট, গঙ্গাচড়া ও উলিপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় শত শত পরিবার ঘরবাড়ি হারিয়ে আশ্রয়হীন হয়ে পড়েছে।

তিস্তা বাঁচাতে গত কয়েক বছরে রংপুর বিভাগজুড়ে একের পর এক আন্দোলন হয়েছে। “তিস্তা বাঁচাও, উত্তরবঙ্গ বাঁচাও” স্লোগানে মানববন্ধন, অবস্থান কর্মসূচি ও মশাল মিছিলের মধ্য দিয়ে নদীর দুই তীরে হাজারো মানুষ প্রতিবাদ জানিয়েছেন।
সাম্প্রতিক কর্মসূচিতে নদীর ১১৫ কিলোমিটারে ৪৮ ঘণ্টাব্যাপী অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবেশবাদীরা।

তাদের দাবি, বাংলাদেশ-ভারত তিস্তা পানি বণ্টন চুক্তি দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে এবং তিস্তা মাস্টারপ্ল্যান কার্যকর করতে হবে।

পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান জানিয়েছেন, ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে তিস্তা মহাপরিকল্পনার কাজ শুরু হবে।
১০ বছরের মেয়াদে দুই ধাপে এই প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১২ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রথম ধাপে ৯,১৫০ কোটি টাকায় কাজ হবে, যার মধ্যে ৬,৭০০ কোটি আসবে চীন থেকে ঋণ হিসেবে এবং বাকি ২,৪৫০ কোটি সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে।

তিস্তা নদীরক্ষা আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক আসাদুল হাবিব দুলু বলেন,

“সরকার যদি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগে নিজস্ব অর্থায়নে তিস্তা প্রকল্পের কাজ শুরু না করে, তবে বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।”

পাউবোর রংপুর অঞ্চলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আহসান হাবিব জানান, তলদেশ ভরাট হয়ে যাওয়ার কারণে তিস্তার পানি দ্রুত কমছে।
তবে তিনি আশাবাদী, “বিজ্ঞানসম্মত খনন হলে সেচ মৌসুমে পর্যাপ্ত পানি সরবরাহ সম্ভব হবে।”

নদী বিশেষজ্ঞ ড. তুহিন ওয়াদুদ সতর্ক করেছেন, “যদি তিস্তা বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে খনন না করা হয়, তাহলে গোটা উত্তরাঞ্চল একদিন মরুভূমিতে পরিণত হবে। ভারত একতরফাভাবে পানি প্রত্যাহার করছে, যার ফলেই এই নদী আজ মৃত।”

এক সময়ের প্রমত্তা তিস্তা এখন বালুচর আর শুকনো খাতে পরিণত। হাজারো কৃষক, জেলে ও চরবাসীর জীবিকা ঝুঁকির মুখে। তিস্তা বাঁচানো এখন শুধু পরিবেশ রক্ষার প্রশ্ন নয়, এটি উত্তরবঙ্গের বাঁচা-মরার প্রশ্ন।