ঢাকা রবিবার, ০৮ নভেম্বর ২০২৬
বিজ্ঞাপন 📢 Google AdSense — 728 × 90 Leaderboard Placement

মার্কিন রাজনীতিতে ইতিহাস গড়া সাবা হায়দার কে, উত্তর প্রদেশ থেকে যেভাবে পৌঁছালেন ক্ষমতার শীর্ষে

প্রকাশিত: 7 November 2026, 2:46 pm
ফন্ট:

অনলাইন ডেস্ক:

ভারতের উত্তর প্রদেশের এক সাধারণ পরিবার থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমিয়ে মার্কিন রাজনীতিতে নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন সাবা হায়দার, যিনি ২০২৬ সালের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে ইলিনয়ের ৮৪তম হাউস ডিস্ট্রিক্ট থেকে বিপুল ভোটে জয়লাভ করে প্রথম দক্ষিণ এশীয় মুসলিম নারী হিসেবে আইনসভায় নির্বাচিত হয়েছেন।

গত মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) অনুষ্ঠিত যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে অন্তত ৩০ জন ভারতীয় বংশোদ্ভূত প্রার্থী বিজয়ী হয়েছেন, যাদের মধ্যে অন্যতম সাবা হায়দার ইলিনয় অঙ্গরাজ্যের ৮৪তম হাউস ডিস্ট্রিক্ট থেকে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থী হিসেবে অংশ নিয়ে বড় ব্যবধানে এই সফলতা অর্জন করেন।

নির্বাচনে সাবা মোট ভোটের ৭০ দশমিক ৯ শতাংশ অর্থাৎ ২০ হাজার ৭৫৬ ভোট পেয়েছেন, বিপরীতে তার প্রতিদ্বন্দ্বী রিপাবলিকান প্রার্থী ব্রায়ান স্কোপা পেয়েছেন ৮ হাজার ৫২০ ভোট।

এই দুর্দান্ত জয়ের মধ্য দিয়ে ইলিনয় অঙ্গরাজ্যের আইনসভায় নির্বাচিত প্রথম দক্ষিণ এশীয় নারী হওয়ার গৌরব অর্জন করেছেন সাবা হায়দার।

তার আদি নিবাস ভারতের উত্তর প্রদেশে হওয়ায় মেয়ের এমন ঐতিহাসিক সাফল্যে দারুণ উচ্ছ্বসিত বাবা সৈয়দ আলী হায়দার মন্তব্য করেছেন যে, এটি শুধু তাদের পরিবারের জয় নয়, বরং পুরো দেশের জন্য এক গর্বের মুহূর্ত।

প্রশ্ন জাগে, কে এই সাবা হায়দার এবং কীভাবে ভারতের একটি শহর থেকে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতির এত গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছালেন?

৪২ বছর বয়সি সাবা হায়দার ভারতীয় বংশোদ্ভূত একজন ডেমোক্রেটিক রাজনীতিক, যার পরিবারের আসল শিকড় উত্তর প্রদেশের বুলন্দশহর জেলার আওরঙ্গাবাদ শহরে প্রোথিত রয়েছে।

ভারতেই জন্ম ও বেড়ে ওঠা এই নেত্রীর বাবা সৈয়দ আলী হায়দার একজন অবসরপ্রাপ্ত প্রকৌশলী এবং মায়ের নাম চাঁদনি, যাদের পৈতৃক বাড়ি গাজিয়াবাদে অবস্থিত হওয়ায় মেয়ের বিজয়ের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর সেখানে আত্মীয়স্বজন ও পরিবারের সদস্যরা আনন্দ-উৎসবে মেতে ওঠেন।

শিক্ষাজীবনে সাবা গাজিয়াবাদের হলি চাইল্ড স্কুলে পড়াশোনা শেষ করে রাম চামেলি চাড্ডা বিশ্বাস গার্লস কলেজ থেকে বিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন এবং পরবর্তীতে আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ে (এএমইউ) ভর্তি হয়ে বন্যপ্রাণী বিজ্ঞান বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পাশাপাশি স্বর্ণপদক লাভ করেন।

ছোটবেলা থেকেই বিভিন্ন সামাজিক ও জনস্বার্থমূলক বিষয়ে তার গভীর আগ্রহ ছিল এবং তার মা চাঁদনি জানান যে স্কুলজীবনে তিনি নিয়মিত বিতর্ক ও বক্তৃতা প্রতিযোগিতায় অংশ নিতেন, যার ফলে মানুষের সামনে নিজের মতামত তুলে ধরার আগ্রহ তখন থেকেই তৈরি হয়েছিল।

ব্যক্তিগত জীবনে ২০০৬ সালে বুলন্দশহরের কম্পিউটারবিজ্ঞান প্রকৌশলী আলী কাজমিকে বিয়ে করেন সাবা, এবং এই দম্পতির আজিম নামে ১৬ বছর বয়সি ও আইজা নামে ১২ বছর বয়সি দুটি সন্তান রয়েছে।

২০০৭ সালে স্বামীর হাত ধরে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান সাবা এবং শিকাগো এলাকায় বসতি গড়ে তোলেন, যেখানে নতুন পরিবেশে জীবন শুরু করার পর নিজের পড়াশোনা ও অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে তিনি ভিন্ন পেশায় যুক্ত হন।

তিনি একজন সার্টিফায়েড যোগব্যায়াম প্রশিক্ষক হিসেবে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন এবং পরবর্তীতে কলেজের শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা ও করপোরেট পেশাজীবীদের যোগব্যায়াম শেখাতে শুরু করেন।

বন্যপ্রাণী বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করলেও যুক্তরাষ্ট্রে এসে সুস্থ জীবনযাপন ও শরীরচর্চার জগতে নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করেন তিনি, যার সুবাদে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার চমৎকার সুযোগ পান।

যোগব্যায়াম শেখানোর পাশাপাশি নানা সামাজিক উদ্যোগেও যুক্ত হন সাবা, যার ফলে স্থানীয় মানুষের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে এবং ধীরে ধীরে কমিউনিটির নানা সমস্যা, মানুষের চাহিদা ও স্থানীয় উন্নয়নসংক্রান্ত বিষয়গুলো নিয়ে তিনি কাজ শুরু করেন।

পরবর্তী সময়ে রাজনীতিতে প্রবেশের ক্ষেত্রে এই সামাজিক যোগাযোগ ও মানুষের সঙ্গে গড়ে ওঠা সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

নিজের রাজনৈতিক প্রচারের সময় কমিউনিটির প্রতি দায়বদ্ধতার কথা স্মরণ করে সাবা বলেছিলেন যে সেই সময় থেকেই যে কমিউনিটি তাকে এবং তার পরিবারকে ইলিনয়কে নিজেদের ঘর হিসেবে গড়ে তুলতে সাহায্য করেছে, তাদের জন্য কিছু করার কাজে তিনি নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন।

সাবার মা চাঁদনিও মেয়ের এই পথচলায় তার স্বামীর সহযোগিতার কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করে জানান যে সাবার স্বামী সব সময় তাকে উৎসাহ দিয়েছেন এবং সামাজিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হতে সহযোগিতা করেছেন।

চাঁদনি আরও বলেন যে বছরের পর বছর সুস্থ জীবনযাপন নিয়ে কাজ এবং বিভিন্ন সামাজিক উদ্যোগের মাধ্যমে সাবা তার কমিউনিটির মানুষের সঙ্গে অত্যন্ত শক্তিশালী সম্পর্ক গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছেন।

সাবার এই রাজনৈতিক যাত্রা অবশ্য কখনোই মসৃণ ছিল না, কারণ নির্বাচনী রাজনীতিতে তার প্রথম পদক্ষেপ ছিল ২০২২ সালের নভেম্বরে ডুপেজ কাউন্টি বোর্ডের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা, যেখানে তিনি প্রায় এক হাজার ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হন।

তবে প্রথম বারের সেই পরাজয় তাকে দমাতে পারেনি, বরং তিনি মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ আরও বাড়িয়ে দেন এবং এলাকার বাসিন্দাদের সঙ্গে দেখা করা, বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোট চাওয়া এবং তাদের সমস্যা ও চাহিদার কথা শোনার কাজ নিয়মিত চালিয়ে যান।

এরপর ২০২৪ সালে আবারও নির্বাচনে অংশ নিয়ে রিপাবলিকান দলের বর্তমান সদস্য প্যাটি গুস্টিনকে পরাজিত করে ডুপেজ কাউন্টি বোর্ডের সদস্য নির্বাচিত হন সাবা।

সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই নির্বাচনে তিনি ৮ হাজার ৫ বণ ৫২১ ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়েছিলেন এবং ডুপেজ কাউন্টির সরকারি নির্বাচনী ফলাফল অনুসারে সাবা পেয়েছিলেন ৪০ হাজার ৩৩০ ভোট, যেখানে প্যাটি গুস্টিন পেয়েছিলেন ৩১ হাজার ৩৯৫ ভোট।

অন্যান্য সংবাদমাধ্যমের বিশ্লেষণেও তার এই বিজয়কে ভারতীয় কমিউনিটির জন্য একটি উল্লেখযোগ্য অর্জন হিসেবে তুলে ধরা হয় এবং ডুপেজ কাউন্টি বোর্ডে নির্বাচিত প্রথম ভারতীয় হিসেবে গাজিয়াবাদ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় তার উঠে আসার গল্প বিশেষভাবে গুরুত্ব পায়।

ডুপেজ কাউন্টি বোর্ডের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে পরিবেশ ও কৌশলগত পরিকল্পনাসংক্রান্ত দুটি গুরুত্বপূর্ণ কমিটির সভাপতির দায়িত্ব অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে পালন করেন সাবা।

এ ছাড়া জনস্বাস্থ্য, স্থানীয় উন্নয়ন এবং কমিউনিটির জীবনমান উন্নয়নের বিভিন্ন বিষয়েও তিনি জোরালোভাবে কাজ করেন এবং কাউন্টির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, পরিবেশ সংরক্ষণ ও স্থানীয় প্রশাসনের বিভিন্ন দায়িত্ব পালনের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন।

শুধু কাউন্টি বোর্ডেই নয়, ডুপেজ কাউন্টি স্বাস্থ্য বিভাগের জনস্বাস্থ্য বোর্ডেও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন এই উদীয়মান রাজনীতিক।

শিক্ষাক্ষেত্রেও রয়েছে তার গভীর সম্পৃক্ততা, কারণ স্থানীয় শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নে কাজ করা ইন্ডিয়ান প্রেইরি এডুকেশনাল ফাউন্ডেশনের পরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন সাবা, যে প্রতিষ্ঠানটি স্থানীয় কমিউনিটির শিক্ষার প্রসার ও উন্নয়নে কাজ করে থাকে।

এভাবেই যোগব্যায়াম প্রশিক্ষক হিসেবে শুরু হওয়া তার সামাজিক যোগাযোগ ধীরে ধীরে তাকে স্থানীয় প্রশাসন, জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ ও শিক্ষা খাতের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে নিয়ে এসেছে।

২০২৬ সালের নির্বাচনে সাবার এই জয়কে তার রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় ও তাৎপর্যপূর্ণ অর্জন হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে, যার মাধ্যমে তিনি ইলিনয় অঙ্গরাজ্যের আইনসভায় নির্বাচিত প্রথম দক্ষিণ দক্ষিণ এশীয় নারীর ইতিহাস গড়েছেন।

তার নির্বাচনী এলাকা ৮৪তম হাউস ডিস্ট্রিক্টের আওতায় রয়েছে উইল, ডুপেজ, কেইন ও কেন্ডাল কাউন্টির কিছু অংশ এবং এ এলাকার গুরুত্বপূর্ণ শহর ও জনপদের মধ্যে রয়েছে অরোরা, ন্যাপারভিল, অসওয়েগো, মন্টগোমারি এবং বোল্ডার হিল।

নির্বাচনী প্রচারে সাবা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়, সাশ্রয়ী স্বাস্থ্যসেবা এবং শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নকে তাদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের জন্য সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন।

তার মতে, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি ও পরিবারের বাড়তি খরচের চাপে কর্মজীবী মানুষ ক্রমেই কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছেন, তাই স্বাস্থ্যসেবাকে আরও সহজলভ্য করা, সরকারি শিক্ষাব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা এবং পরিবারের দৈনন্দিন ব্যয়ের চাপ কমাতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।

সাবা জানান যে নির্বাচনের আগে টানা ১৫ মাস ধরে তার প্রচার দল নির্বাচনী এলাকার বিভিন্ন প্রান্তে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছেছে এবং তাদের সমস্যা, প্রত্যাশা ও উদ্বেগের কথা শুনে মানুষের কাছ থেকে পাওয়া মতামতের ভিত্তিতেই নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিগুলো সাজানো হয়েছে।

বিজয় নিশ্চিত হওয়ার পর নিজের প্রচারাভিযানকে তিনি তৃণমূল পর্যায়ের এবং সাধারণ মানুষের শক্তিতে গড়ে ওঠা এক অপ্রতিরোধ্য আন্দোলন হিসেবে বর্ণনা করেন, যার মূল লক্ষ্য ছিল আরও শক্তিশালী, সমৃদ্ধ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক কমিউনিটি গড়ে তোলা।

তিনি আরও বলেন যে কর্মজীবী পরিবারগুলোর সমস্যা ও উদ্বেগের কথা জোরালোভাবে তুলে ধরতে চান ইলিনয়ের অঙ্গরাজ্য রাজধানী স্প্রিংফিল্ডে, যেখানে নির্বাচিত অন্য প্রতিনিধিদের সঙ্গে একসঙ্গে কাজ করে তিনি সাধারণ মানুষের নিখুঁত সমাধান খুঁজবেন।

নিজের নির্বাচনী প্রচারে সাবা অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বলেছিলেন যে কর্মজীবী পরিবারগুলো ঠিক কী ধরনের কঠিন সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তা তিনি নিজের বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকেই খুব ভালো করে জানেন এবং সবার মুখোমুখি হওয়া সমস্যাগুলোর স্থায়ী সমাধান খুঁজতে তিনি নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতে চান।

মন্তব্য করুন