নিজস্ব প্রতিবেদক:
রাজধানীর মিরপুর-১০ নম্বর এলাকায় ফুটপাত দখলমুক্ত করার অভিযানকে কেন্দ্র করে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনার পরও উচ্ছেদ অভিযান অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রশাসক মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন। তিনি বলেছেন, নগরবাসীর নির্বিঘ্ন ও স্বাচ্ছন্দ্যে চলাচল নিশ্চিত করতে অবৈধভাবে কাউকে ফুটপাত দখল করতে দেওয়া হবে না। অভিযানে বাধা, হামলা বা অরাজকতার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) দুপুরে মিরপুর-১০ নম্বরের হোপ মার্কেট এলাকায় উচ্ছেদ অভিযান পরিদর্শনে গিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় এসব কথা বলেন তিনি। এর আগে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে মিরপুর-১০ গোলচত্বর এলাকায় ফুটপাতের অবৈধ দখল উচ্ছেদে অভিযান শুরু করে ডিএনসিসি।
অভিযান চলাকালে ফুটপাতের ব্যবসায়ী ও হকারদের সঙ্গে সিটি করপোরেশনের কর্মীদের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এ সময় সিটি করপোরেশনের কয়েকটি গাড়িতে আগুন দেওয়া, গাড়ি ও বিভিন্ন স্থাপনা ভাঙচুর এবং পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপের অভিযোগ ওঠে। পুলিশ ও সাংবাদিকদের ওপরও হামলার ঘটনা ঘটে। স্থানীয় সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় ঘটনার বিভিন্ন পর্যায়ের কথা উঠে এসেছে।
ঘটনার পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে এবং ফুটপাতের ব্যবসায়ী ও হকাররা এলাকা থেকে সরে যান। মিরপুর-১০ থেকে মিরপুর-১৪ নম্বর সড়কে কিছু সময় যান চলাচল বন্ধ থাকলেও দুপুর ১টার পর চলাচল স্বাভাবিক হতে দেখা যায়। ওই সড়কে পুলিশ মোতায়েন করা হয়।
ডিএনসিসি প্রশাসক বলেন, কয়েক দিন ধরে নগরবাসীর চাহিদা অনুযায়ী মিরপুরে ফুটপাত দখলমুক্ত করার অভিযান চালানো হচ্ছে। এরই অংশ হিসেবে মিরপুর-১০ এলাকায় অভিযান পরিচালনার সময় দীর্ঘদিন ধরে ফুটপাত দখল করে রাখা ব্যক্তিরা এবং তাদের ইন্ধনে সিটি করপোরেশনের পরিবহন, সাংবাদিক ও কয়েকজন পুলিশ সদস্যের ওপর হামলা হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
তার ভাষ্য, স্থানীয় সাধারণ মানুষের প্রতিরোধের মুখে হামলাকারীরা সরে যেতে বাধ্য হন। তিনি বলেন, নগরবাসীর চলাচলের স্বার্থে ফুটপাত উদ্ধারের কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে।
শফিকুল ইসলাম খান বলেন, “অবৈধভাবে কাউকে ফুটপাত দখল করতে দেওয়া হবে না। এসব দখলের পক্ষে কেউ দাঁড়ালে তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
হামলার ঘটনায় মামলা করার কথাও জানান তিনি। প্রশাসক বলেন, পুলিশের পক্ষ থেকে এবং ডিএনসিসির পক্ষ থেকেও পৃথক মামলা করা হবে। তদন্তের মাধ্যমে জড়িতদের শনাক্ত করে দ্রুত গ্রেপ্তারের ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তার দাবি, হামলায় জড়িত কয়েকজনকে এরই মধ্যে শনাক্ত করা হয়েছে।
মিরপুরের সাধারণ মানুষ ফুটপাত দখলমুক্ত করতে চায় বলেও দাবি করেন ডিএনসিসি প্রশাসক। কারও ইন্ধনে ভবিষ্যতে আবার ফুটপাত দখলের চেষ্টা হলে তাদের বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
ঘটনাটিকে পরিকল্পিত বলে দাবি করে শফিকুল ইসলাম খান বলেন, হামলাকারীরা আগে থেকেই প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিল। তিনি এ ঘটনাকে ‘ফ্যাসিজমের দোসরদের’ কাজ বলে মন্তব্য করেন। তার অভিযোগ, সরকারবিরোধী স্লোগানও দেওয়া হয়েছে এবং মসজিদে আগুন দিয়ে অরাজকতা তৈরির চেষ্টা করা হয়েছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে তদন্তের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেন তিনি।
নিজেকে মিরপুরের সন্তান উল্লেখ করে ডিএনসিসি প্রশাসক বলেন, এলাকার পরিস্থিতি সম্পর্কে তিনি অবগত। “কারা কী করে, আমার চেয়ে বেশি কেউ জানে না। তাদের দাঁতভাঙা জবাব দেওয়া হবে। আমি একজন রাজনৈতিক কর্মী, জনসেবার দায়িত্ব নিয়েছি,” বলেন তিনি।
উচ্ছেদ অভিযানে পুলিশের প্রস্তুতি নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। শফিকুল ইসলাম খান বলেন, অভিযানের জন্য পুলিশ আসার কথা থাকলেও সেখানে কোনো পুলিশ সদস্যকে পাওয়া যায়নি। তার অভিযোগ, সাধারণ উচ্ছেদ অভিযানের মতো করেই বুধবারের কার্যক্রম শুরু করা হয়েছিল, কিন্তু হামলাকারীরা আগে থেকেই পরিকল্পনা করে প্রস্তুত ছিল।
অন্যদিকে, প্রত্যক্ষদর্শীদের কেউ কেউ জানিয়েছেন, ফুটপাত থেকে হকার উচ্ছেদের সময় ডিশ লাইনের তার খুলে ফেলার পর একটি বৈদ্যুতিক তার ছিঁড়ে আগুনের সূত্রপাত হয়। পরে আগুন পাশের বৈদ্যুতিক ট্রান্সফরমারে ছড়িয়ে পড়ে এবং বিস্ফোরণের পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। তবে প্রশাসক হামলা ও অগ্নিসংযোগকে পরিকল্পিত বলে দাবি করেছেন।
ঘটনার সময় সাংবাদিকদের ওপরও হামলার অভিযোগ ওঠে। একাত্তর টেলিভিশনের সাংবাদিক তানভীর সুমনকে হকারদের একটি দল ঘিরে রাখে বলে তিনি জানান। পরে হকারদের একটি অংশের সহায়তায় সেখান থেকে বের হয়ে আসেন বলে জানান তিনি। যমুনা টেলিভিশনের গাড়ি ভাঙচুর, সময় টিভির রিপোর্টার ও ক্যামেরাম্যানকে ধাওয়া এবং মারধরের অভিযোগও রয়েছে। প্রথম আলোর এক ফটো সাংবাদিকের ক্যামেরা ছিনিয়ে নেওয়া হলেও পরে সেটি ফেরত দেওয়া হয়।
ঢাকা মহানগর পুলিশের মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার হাসান মোহাম্মদ নাছের রিকাবদার জানিয়েছেন, পুলিশের একটি গাড়ির গ্লাস ভাঙচুরের খবর পাওয়া গেছে। একই সঙ্গে সিটি করপোরেশনের গাড়িতে আগুন দেওয়ার ঘটনাও ঘটে।
সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়ে ডিএনসিসি প্রশাসক বলেন, “আপনারা দেখেছেন, নগরবাসীর সেবার জন্য ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন প্রতিনিয়ত এই উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করছে। আপনাদের পাশে আছে।”
তিনি জানান, মিরপুর-১০ গোলচত্বর ও ফুটওভারব্রিজ এলাকায় আগের উচ্ছেদ অভিযানের পর সেখানে গাছ লাগানো হয়েছে, যাতে মানুষ স্বাচ্ছন্দ্যে হাঁটতে পারেন। বুধবার যেসব জায়গা দখলমুক্ত করা হয়েছে, সেখানেও পরিকল্পনা অনুযায়ী পরবর্তী কার্যক্রম নেওয়া হবে।
উচ্ছেদ অভিযানে সহযোগিতা করায় স্থানীয় সাধারণ মানুষকে ধন্যবাদ জানান শফিকুল ইসলাম খান। তিনি বলেন, ফুটপাত দখলমুক্ত করা সিটি করপোরেশনের নৈতিক দায়িত্ব। সেই দায়িত্ববোধ থেকেই অভিযান অব্যাহত থাকবে।
ঘটনার পর ডিএনসিসি প্রশাসক, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য এবং বিএনপির নেতা-কর্মীরা মিরপুর-১০ গোলচত্বর থেকে মিরপুর-১৪ এলাকার দিকে মিছিল করেন। পরে পরিস্থিতি শান্ত হলে সড়কে যান চলাচলও স্বাভাবিক হয়।







