ঢাকা শনিবার, ০৭ নভেম্বর ২০২৬
বিজ্ঞাপন 📢 Google AdSense — 728 × 90 Leaderboard Placement

স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দূরত্ব নাকি কৌশল? জামায়াত-এনসিপি সম্পর্ক নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে গুঞ্জন

প্রকাশিত: 7 November 2026, 9:09 pm
ফন্ট:

নিজস্ব প্রতিবেদক:

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে ১১ দলীয় জোট গঠিত হয়েছিল, যেখানে ‘মধ্যমণি’ হিসেবে যুক্ত হয় জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। নির্বাচনে জামায়াত জোট বিরোধী দল নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে জামায়াত, জোট এবং এনসিপি একসঙ্গে পথ চললেও, আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে এনসিপির দূরত্ব বাড়ছে বলে রাজনৈতিক অঙ্গন ও গণমাধ্যমে গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়েছে।

বিশেষ করে ঢাকা সিটি করপোরেশনসহ স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জোটের বাইরে গিয়ে পৃথকভাবে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত ঘিরে জোটে ফাটল ধরার জল্পনা চলছে। জোটের সবশেষ লংমার্চ কর্মসূচিতে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম অংশ না নেওয়ায় এই গুঞ্জন আরও ডালপালা মেলে। তবে বিষয়টিকে পুরোপুরি মিডিয়ার অতি সক্রিয়তা এবং সরকারি দলের চক্রান্ত বলে উড়িয়ে দিয়েছেন দল দুটির নেতারা; তাদের মতে, এটি কোনো দূরত্ব নয় বরং সুচিন্তিত রাজনৈতিক কৌশল এবং আসন্ন নির্বাচনে দলগুলো নিজেদের মতো আলাদা লড়াই করলেও তার আঁচ জামায়াত-এনসিপির ঐক্যে পড়বে না।

স্থানীয় সরকার নির্বাচনের তারিখ এখনো চূড়ান্ত না হলেও জামায়াতে ইসলামী নিজেদের সম্ভাব্য একক প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করে নির্বাচনি প্রস্তুতির নির্দেশনা দিয়েছে, অন্যদিকে এনসিপিও নিজ দলের প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করে পুরোদমে প্রস্তুতি নিতে নির্দেশ দেওয়ায় সিটি করপোরেশনসহ স্থানীয় সরকার নির্বাচন জোটবদ্ধভাবে হচ্ছে না। এমন পরিস্থিতিতে গত কয়েক মাস ধরে রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রশ্ন উঠেছে যে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ঐক্যের ভেতরে ফাটল ধরেছে কি না, আর এই প্রশ্নটি জোরালো হয়েছে শনিবার জোটের লংমার্চ কর্মসূচিতে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের অনুপস্থিতিকে কেন্দ্র করে।

এই বিষয়ে এনসিপির সদস্য সচিব ও সংসদ-সদস্য আখতার হোসেন মন্তব্য করেন যে, ১১ দলীয় ঐক্য কিংবা জামায়াতের সঙ্গে এনসিপির কোনো ধরনের ফাটল বা দূরত্বের গুঞ্জন সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং যা কিছু দৃশ্যমান তা মূলত রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক কৌশল মাত্র। জুলাই বিপ্লবের স্পিরিট ও ফ্যাসিবাদের বিলোপ ঘটিয়ে নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত গড়ে তোলা, গণহত্যার বিচার এবং জুলাই সনদের বাস্তবায়নসহ নানা দাবির প্রশ্নে ঐক্য এখনো অটুট থাকলেও, দল হিসেবে নিজস্ব রাজনৈতিক পরিচয় ধারণ করে জনগণের কাছাকাছি পৌঁছানোর নিজস্ব পরিকল্পনা রয়েছে এবং এটি জোট ভাঙার বিষয় নয় বরং সাংগঠনিক ভিত্তি শক্তিশালী করার প্রক্রিয়া।

আখতার হোসেন আরও যোগ করেন যে, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করতে না চাওয়া এবং গণভোটের রায় উপেক্ষা করা পক্ষগুলোই জামায়াত-এনসিপির মধ্যে ফাটল ও দূরত্ব দেখছে যা তাদের চক্রান্তের অংশ। সাফ কথা হলো তারা নিজস্ব রণকৌশল অনুযায়ী রাজপথে থেকে নির্বাচন করবে এবং জামায়াতও নিজস্ব কৌশল ও আদর্শ নিয়ে স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচন করবে। যখন এককভাবে নির্বাচনের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে তখনই ফাটল ও দূরত্বের কথা আসছে, আর জোটের কর্মসূচিতে শীর্ষ নেতাদের উপস্থিতি কাম্য হলেও অসুস্থতা বা ব্যক্তিগত সমস্যার কারণে কেউ না গেলে দলের মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে এমন ভাবাটা চক্রান্ত ছাড়া কিছু নয়।

জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ জানান যে, একটি লংমার্চে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম অসুস্থতা বা অন্য কোনো কারণে যেতে না পারায় কিছু মিডিয়া, সরকারদলীয় লোকজন ও জুলাই বিরোধীরা ইস্যু খুঁজে বেড়াচ্ছে, অথচ দুই দলের মধ্যে বিন্দুমাত্র দূরত্ব নেই এবং তারা সংসদ ও সংসদের বাইরে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে রাজনৈতিক কার্যক্রম চালাচ্ছেন। স্থানীয় সরকার নির্বাচন আলাদাভাবে করা হলেও এতে জোটের কোনো সমস্যা হচ্ছে না এবং আলোচনার দরজা সব সময় উন্মুক্ত থাকায় আলোচনার মাধ্যমে ঐক্যের নির্বাচনও হতে পারে, আর কিছু মিডিয়া ও সরকারদলীয় লোকজন চক্রান্তের অংশ হিসেবে দুটি দলের মধ্যে দূরত্ব ও ফাটলের নকশা তৈরি করতে চাচ্ছে।

রাজনৈতিক মহলের মতে, এনসিপি সম্প্রতি দল পুনর্গঠন করে শীর্ষ নেতাদের পদ-পদবি পরিবর্তন এবং নিষ্ক্রিয় ও দূরে থাকা নেতাদের সক্রিয় করার মাধ্যমে দিন দিন শক্তিশালী হয়ে উঠছে এবং জোটের বাইরে গিয়ে একক নির্বাচন ও বড় সভা-মিছিল করছে, ফলে আসন সমঝোতা বা ভোটের অঙ্কের নিজস্ব রণনীতি থাকাকে জোটের দূরত্ব বা ভাঙন হিসেবে দেখানো সংবাদমাধ্যমের অতিরঞ্জন।

অপরদিকে ১১ দলীয় ঐক্য জোটের কিছু নেতার মতে, জোটের বড় প্রোগ্রামগুলোতে দলের প্রধানদের উপস্থিতি না থাকলে গুঞ্জন এবং টানাপোড়েনের কথা উঠবে, কারণ বেশ কয়েকজন নেতার সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে সিটি করপোরেশনসহ স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে জোটের ভেতর আস্থার সংকট ও তর্ক-বিতর্ক চলছে। দুটি দলের একটি অংশের ধারণা, ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচন জোটগতভাবে হলে জনপ্রিয় প্রার্থীর মাধ্যমে জয়ের সম্ভাবনা বেশি থাকে এবং এ জন্য জোটগত নির্বাচন হতেও পারে।

তবে দুই সিটি করপোরেশনে আলাদাভাবে প্রার্থীর নাম চূড়ান্ত করেছে জামায়াত-এনসিপি, যেখানে এনসিপির প্রার্থী আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার জায়গায় জামায়াত প্রার্থী হিসেবে মহানগর উত্তরের আমির সেলিম উদ্দিনের নাম এবং দক্ষিণ সিটি নির্বাচনে ডাকসুর ভিপি আবু সাদিক কায়েমের নাম চূড়ান্ত করা হয়েছে। যদিও এনসিপি পূর্বে দক্ষিণে আসিফ মাহমুদ ও উত্তরের প্রার্থী হিসেবে আরিফুল ইসলামের নাম ঘোষণা করেছিল এবং পরবর্তীতে সেপ্টেম্বরে আসিফ মাহমুদ ঢাকা উত্তরের ও নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী দক্ষিণের ভোটার হওয়ার পর এনসিপি চূড়ান্তভাবে ঘোষণা করে যে ঢাকা দক্ষিণে নাসীরুদ্দীন এবং উত্তরে আসিফ মাহমুদ নির্বাচন করবেন।

দক্ষিণ কোরিয়া থেকে এনসিপির যুগ্ম-আহ্বায়ক মনিরা শারমিন জানান যে, দলের মধ্যে ভিন্ন রকম মতামত বা দ্বিমত থাকাকে তারা পজিটিভ দেখছেন এবং জোটগত নির্বাচন ভালো কি না তা নিয়ে ভিন্নমত থাকলেও নীতিনির্ধারণী ফোরামের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এনসিপি সম্পূর্ণ এককভাবেই আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে। এককভাবে নির্বাচন করার সিদ্ধান্তের কারণে জোটের ভেতরে দূরত্ব তৈরি হওয়ার কোনো কারণ নেই, কারণ জোটের শরিক দল জামায়াতে ইসলামীও তো এককভাবেই নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে।

মন্তব্য করুন