অনলাইন ডেস্ক:
যুক্তরাজ্যে জুয়ার নেশার টাকা জোগাতে বন্ধু ও স্বজনদের ব্যক্তিগত পরিচয় চুরি করে রাষ্ট্রীয় কল্যাণ তহবিল থেকে প্রায় সোয়া দুই কোটি টাকা আত্মসাতের দায়ে আতিকুর রহমান নামের এক বাংলাদেশি যুবককে ৪০ মাসের কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। শুক্রবার দেশটির ক্যান্টারবারি ক্রাউন কোর্ট এই রায় ঘোষণা করেন। দণ্ডপ্রাপ্ত এই যুবকের বয়স ৩৪ বছর।
দণ্ডপ্রাপ্ত আতিকুর রহমান কেন্টের মারগেট এলাকার বাসিন্দা এবং পেশায় একজন ডেলিভারি ড্রাইভার। আদালত কারাদণ্ডের পাশাপাশি আগামী আট বছরের জন্য কোনো কোম্পানির পরিচালক হওয়ার ওপরও তার নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, ২০১৫ সালের জুলাই থেকে ২০২১ সালের মে মাস পর্যন্ত দীর্ঘ ছয় বছর ধরে অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে এই জালিয়াতি চালিয়ে যান আতিকুর। নিজের ক্রমবর্ধমান জুয়ার নেশার খরচ মেটাতে তিনি ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও পরিবারের ২৬ জন সদস্যের ব্যক্তিগত নথিপত্র ও পরিচয় চুরি করেন। এছাড়াও কোভিড-১৯ মহামারিকালীন সরকারি প্রণোদনা তহবিল থেকেও আরও ৬২ হাজার পাউন্ড হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন তিনি।
শুনানিতে জানানো হয়, সরকারি তহবিল থেকে অর্থ হাতিয়ে নিতে আতিকুর রহমান ভুয়া কোম্পানি, চাকরির জাল নথিপত্র এবং অস্তিত্বহীন সন্তানের নাম দেখিয়ে ৪০টিরও বেশি আলাদা আবেদন জমা দেন। কাছের মানুষদের সরল বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে তাদের সংবেদনশীল কাগজপত্র সংগ্রহ করতেন তিনি। এরপর দেশটির ওয়ার্ক অ্যান্ড পেনশন বিভাগ এবং রাজস্ব ও শুল্ক বিভাগের অধীনে থাকা বিভিন্ন ভাতার জন্য আবেদন করতেন।
সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা জানান, ইউনিভার্সাল ক্রেডিট, মাতৃত্বকালীন ভাতা বা ম্যাটারনিটি অ্যালাউন্স, চাইল্ড বেনিফিট এবং ওয়ার্কিং ট্যাক্স ক্রেডিটের আওতায় এসব অর্থ তোলা হয়েছিল। আতিকুর এই অবৈধ অর্থ জুয়ার পেছনে উড়িয়ে দিলেও, যাদের নাম ও পরিচয় ব্যবহার করে ভাতা তোলা হচ্ছিল, তারা এ বিষয়ে কিছুই জানতেন না।
২০১৮ সালে ভুক্তভোগীদের একজন নিজে বৈধভাবে সরকারি ভাতার আবেদন করলে জালিয়াতির বিষয়টি প্রথম সামনে আসে। সংশ্লিষ্ট বিভাগীয় কর্মকর্তারা ওই আবেদনকারীর ন্যাশনাল ইনস্যুরেন্স রেকর্ডে অসংগতি খুঁজে পান এবং ফাইলটি বিশেষ তদন্তের জন্য পাঠান। পরবর্তীতে ব্যাংক হিসাবের তথ্য যাচাই-বাছাই করে তদন্তকারীরা দেখতে পান, আপাতদৃষ্টিতে সম্পর্কহীন বেশ কিছু ভাতার অর্থ সরাসরি আতিকুর রহমানের নিয়ন্ত্রণাধীন অ্যাকাউন্টে জমা হচ্ছে।
২০২০ সালে করোনা মহামারির সময় টাকার চাহিদা আরও বেড়ে গেলে তৎকালীন চ্যান্সেলর ঋষি সুনাকের ঘোষিত জরুরি ব্যবসায়িক প্রণোদনা তহবিলের দিকে নজর দেন আতিকুর।
সরকারের ‘ইট আউট টু হেল্প আউট’ বা ‘সোমবার থেকে বুধবার রেস্তোরাঁয় খাবারের ওপর সরকারি ভর্তুকিতে ১০ পাউন্ড ছাড়’ প্রকল্পের আওতায় তিনি ২০টি ভুয়া রেস্তোরাঁর নিবন্ধন জমা দেন।
নিবন্ধনে এসব রেস্তোরাঁ ও হসপিটালিটি ব্যবসার নাম দেখিয়ে সরকারি কোষাগার থেকে ৬২ হাজার পাউন্ডের বেশি অর্থ তুলে নেওয়ার চেষ্টা করেন তিনি। তবে এইচএমআরসির স্বয়ংক্রিয় জালিয়াতি প্রতিরোধ ব্যবস্থায় আবেদনগুলো সন্দেহজনক হিসেবে ধরা পড়ে এবং অর্থ ছাড়ের আগেই তা আটকে দেওয়া হয়।
সংশ্লিষ্ট যৌথ তদন্তের অংশ হিসেবে ২০২১ সালের অক্টোবরে আতিকুরের মারগেটের বাসায় অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেফতার করে তদন্তকারী দল। জিজ্ঞাসাবাদে আতিকুর ভুয়া রেস্তোরাঁ নিবন্ধনের কথা স্বীকার করেন। দীর্ঘ ফরেনসিক অ্যাকাউন্টিং অডিট শেষে ২০২৫ সালের অক্টোবরে তার বিরুদ্ধে প্রতারণার পাঁচটি আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আনা হয়। পরবর্তীতে আদালতে নিজের দোষ স্বীকার করেন তিনি।
তদন্ত সংস্থার উপপরিচালক মার্গারেট মাউসলি সাংবাদিকদের জানান, অর্থ ছাড়ের আগে যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ার কারণেই আতিকুরের এই জালিয়াতি থেকে সরকারি কোষাগারের ৬০ হাজার পাউন্ডের বেশি অর্থ রক্ষা পেয়েছে। উদ্ভাবন, জালিয়াতি ও তথ্যবিষয়ক মন্ত্রী লিলিয়ান গ্রিনউড আতিকুরের এই কর্মকাণ্ডকে বিশ্বাসী বন্ধু ও স্বজনদের সঙ্গে ‘পরিকল্পিত বিশ্বাসঘাতকতা’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, অপরাধমূলক প্রতারণার মাধ্যমে হাতিয়ে নেওয়া প্রতিটি পাউন্ড মূলত জরুরি জনসেবা এবং প্রকৃত প্রাপকদের ন্যায্য তহবিল থেকে বঞ্চিত করে। তার সরকার এক প্রজন্মের মধ্যে সবচেয়ে বড় জালিয়াতিবিরোধী অভিযান পরিচালনা করছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।











