নিজস্ব প্রতিবেদক:
প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটে রাজস্ব আদায়ের যে উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, বিদ্যমান প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও সুশাসনের ঘাটতি থাকলে তা অর্জন করা কঠিন হবে বলে মন্তব্য করেছেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। একই সঙ্গে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, নতুন কর কাঠামোর প্রভাব মধ্যবিত্ত ও স্বল্প আয়ের মানুষের ওপর আরও চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
সোমবার (১৫ জুন) প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেট নিয়ে আয়োজিত একাধিক আলোচনা সভায় ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য এসব কথা বলেন। তিনি মনে করেন, বাজেট বাস্তবায়নের সফলতা শুধু রাজস্ব আদায় বা জিডিপি প্রবৃদ্ধির ওপর নির্ভর করে না, বরং সাধারণ মানুষের জীবনমান কতটা উন্নত হলো, সেটিই হওয়া উচিত প্রধান বিবেচ্য বিষয়।
ড. দেবপ্রিয় বলেন, “বাজেটের হিসাব মেলানোর জন্য এনবিআরকে বড় লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও সুশাসন না থাকলে এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন অসম্ভব।” তার মতে, রাজস্ব আহরণে কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া শুধু লক্ষ্যমাত্রা বাড়িয়ে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না।
কর ব্যবস্থার সমালোচনা করে তিনি বলেন, “যার বেশি সম্পদ আছে, তাকেই বেশি কর দিতে হবে। অথচ সরকার ভ্যাটনির্ভর কর কাঠামোর দিকে এগোচ্ছে, যার চাপ শেষ পর্যন্ত স্বল্প আয়ের মানুষের ওপরই পড়ে।” তিনি বাজেটে সম্পদ কর আরোপের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন এবং নতুন আয়কর কাঠামো মধ্যবিত্তের জন্য অতিরিক্ত চাপ তৈরি করতে পারে বলে মন্তব্য করেন।
জাতীয় বাজেটের বিভিন্ন অর্থনৈতিক সূচক নিয়েও প্রশ্ন তোলেন এই অর্থনীতিবিদ। তার দাবি, মূল্যস্ফীতি, জিডিপি প্রবৃদ্ধি ও রাজস্ব আহরণের কিছু তথ্য উপস্থাপনায় বাস্তবতার সঙ্গে অমিল রয়েছে। একই সঙ্গে তিনি বলেন, শুধু জিডিপি বাড়লেই উন্নয়ন নিশ্চিত হয় না। কৃষি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, তৈরি পোশাক খাত এবং আধুনিক সেবা খাতে কর্মসংস্থান বাড়াতে না পারলে সেই প্রবৃদ্ধির সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাবে না।
মূল্যস্ফীতির চেয়ে মজুরি বৃদ্ধির হার কম থাকায় মানুষের প্রকৃত আয় কমছে বলেও উল্লেখ করেন ড. দেবপ্রিয়। তিনি বলেন, নতুন কর কাঠামোর আওতায় নির্দিষ্ট আয়সীমার কিছু মানুষের ওপর অতিরিক্ত করের চাপ সৃষ্টি হতে পারে, যা মধ্যবিত্তের ব্যয়ভার আরও বাড়াবে।
সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, এ খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি ইতিবাচক উদ্যোগ। তবে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের কীভাবে এই সুরক্ষা ব্যবস্থার আওতায় আনা হবে, সে বিষয়ে আরও স্পষ্ট পরিকল্পনা প্রয়োজন। একই সঙ্গে জ্বালানি খাতে ভর্তুকি এবং ভর্তুকি মূল্যে চাল বিতরণ কার্যক্রম অব্যাহত রেখে তা জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সম্প্রসারণের পরামর্শ দেন তিনি।
ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের মতে, নতুন বাজেটের পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা তখনই সফল হবে, যখন মানুষের খাদ্য ব্যয় কমবে, প্রকৃত আয় বাড়বে এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি সাধারণ মানুষের স্বস্তি নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত বাজেট বাস্তবায়নের সবচেয়ে বড় সাফল্য।











