নিজস্ব প্রতিবেদক:
দেশে বন্যপ্রাণী পাচারকারী শক্তিশালী সিন্ডিকেট সক্রিয়। ওই সিন্ডিকেট দেশ ও দেশের বাইরে থেকে বন্যপ্রাণী এনে পাচার করে। অভিযানে ধরা পড়লেও তারা কিছুদিনের মধ্যে জামিনে জেল থেকে বেরিয়ে আরো সক্রিয় হয়ে ওঠে। বাংলাদেশ মূলত বন্যপ্রাণী পাচারের ট্রানজিট রুটে পরিণত হয়েছে। কক্সবাজার থেকে চলতি বছরের জুনে বন্য প্রাণী অপরাধ দমন ইউনিট ১২টি বিপন্ন প্রজাতির কচ্ছপসহ একজনকে গ্রেপ্তার করে। তাছাড়া রাজধানীর মিরপুর এলাকা থেকে বন বিভাগ প্রায় বিপন্ন প্রজাতির বন্যপ্রাণী রিভাইজড কচ্ছপ, পিংক বেলিড সাইডনেক কচ্ছপসহ এক হাজার ২০০টি বন্য প্রাণী উদ্ধার করে। আর গত আগস্টে ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট থেকে উদ্ধার করা হয় দুটি লজ্জাবতী বানর। তবে উদ্ধার করা বেশির ভাগ বন্যপ্রাণীর আবাসস্থলই বিদেশে। ওসব প্রাণী পাচারের উদ্দেশ্যে দেশে আনা হয়েছে। বন বিভাগ সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, চোরাকারবারিরা বিভিন্ন মাধ্যমে বিদেশী বন্যপ্রাণী এ দেশে নিয়ে আসে। তারপর কিছুদিন সুবিধাজনক স্থানে রেখে সুযোগ বুঝে অন্য দেশে পাচার করে দেয়। বিগত ২০২৫ সালে ৪১৫টি অভিযানে ৮ হাজার ২৮১টি বন্য প্রাণী জব্দ করা হয়। তার মধ্যে ২৫৪টি স্তন্যপায়ী প্রাণী, ৪ হাজার ৭৩৫টি পাখি, ৩ হাজার ২৯০টি সরীসৃপ ও দুটি মাছ। ওসব অভিযানে ৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাছাড়া ২০২৪ সালে ২৩০টি অভিযানে ৩ হাজার ১৪৫টি বন্য প্রাণী জব্দ করা হয়। তার মধ্যে ৯৮টি স্তন্যপায়ী প্রাণী, এক হাজার ২৭৫টি পাখি, এক হাজার ৭৭৪টি সরীসৃপ। বর্তমানে দেশে বন্যপ্রাণী পাচার রোধে পুলিশ, গোয়েন্দা বিভাগ, বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ, এসআরবিসহ বিভিন্ন সংস্থা কাজ করছে। পাশাপাশি নজরদারি চালিয়ে যাচ্ছে আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থাও (ইন্টারপোল)।
সূত্র জানায়, বন্যপ্রাণী পাচারে বাংলাদেশকে ট্রানজিট বানিয়ে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে সক্রিয় রয়েছে লাইনম্যান। আর ওসব লাইনম্যানের সঙ্গে পাচারকারীরা সরাসরি চুক্তি করে। সেক্ষেত্রে প্রাণী বা পণ্যের ওজন ও আকারের ওপর ভিত্তি করে পাচারের ফি নির্ধারণ করা হয়। পাচারকারীরা দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে বন্য প্রাণী নিয়ে এসে কিছুদিন নিজেদের হেফাজতে রাখে। তারপর সুযোগ বুঝে প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে বাংলাদেশ থেকে ওসব প্রাণী পাচার করা হয়। সেক্ষেত্রে এক দেশের লাইনম্যান সীমান্ত পার করে অন্য দেশের লাইনম্যানের কাছে বন্যপ্রাণী হস্তান্তর করে। তারপর ওই দেশের পাচারকারীরা মূল ক্রেতার কাছে পৌঁছে দেয়। দেশে যশোর, বেনাপোল, সিলেট সীমান্তে লাইনম্যান চক্রটি সবচেয়ে বেশি সক্রিয়। ইতিমধ্যে অভিযানে যেসব বন্যপ্রাণী উদ্ধার হয়েছে তার বেশির ভাগই প্রাণী মরু এলাকা, শুষ্ক অঞ্চল বা পাথুরে এলাকায় বাসকারী প্রাণী। ওসব প্রাণীর এ দেশের আবহাওয়ায় বেঁচে থাকা কঠিন।
সূত্র আরো জানায়, বিলুপ্তপ্রায় বন্য প্রাণী ও উদ্ভিদের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সংক্রান্ত কনভেনশন সাইটিস এবং নন-সাইটিসভুক্ত প্রাণী আমদানি-রপ্তানি বন বিভাগ বন্ধ করে দিয়েছে। কিন্তু তাতেও পাচারকারী চক্রের তৎপরতা বন্ধ হচ্ছে না। বরং উল্টো আইনের অপব্যবহার করে প্রাণিসম্পদ দপ্তরের অনুমতির সুযোগ নিয়ে পাচারকারীরা বিদেশি বন্য প্রাণী দেশে নিয়ে আসছে এবং পরবর্তী সময়ে স্থলসীমান্ত হয়ে প্রতিবেশী দেশে পাচার করে দেয়া হয়। মূলত বিদেশি ক্রেতার চাহিদার ভিত্তিতেই দক্ষিণ আফ্রিকা ও মাদাগাস্কারসহ আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ থেকে বন্য প্রাণী নিয়ে এসে পাচার করা হয়। ভারতে সাইটিস এবং নন-সাইটিসভুক্ত প্রাণী আমদানি-রপ্তানি নিষিদ্ধ থাকায় স্থল সীমান্ত দিয়ে ওসব প্রাণী পাচার করা হয়।
এদিকে এ প্রসঙ্গে বন্য প্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটের পরিচালক মিজানুর রহমান জানান, অনেক সময় লাগেজ ও বিভিন্ন উপায়ে বিমানবন্দর ব্যবহার করেও ছোট ছোট বিদেশি বন্য প্রাণী দেশে আনা বা পাচার করা হয়। পাচারচক্রের সঙ্গে জড়িত বেশ কিছু চিহ্নিত অপরাধীর বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা করা হয়েছে। আর পুরো পাচার নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত সবাইকে চিহ্নিত করার কাজ চলছে। দেশে বন্যপ্রাণী পাচার ও অবৈধ চোরাচালানের সিন্ডিকেট পুরোপুরি নির্মূল করা না গেলেও এ বিষয়ে নজরদারি অব্যাহত রয়েছে। তবে দেশের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরগুলোতে বন্যপ্রাণী বিষয়ক অপরাধ দমনে নজরদারির স্থায়ী কার্যালয় স্থাপন করা গেলে আকাশপথেও বন্যপ্রাণী চোরাচালান নজরদারির আওতায় আনা সম্ভব।











