নিজস্ব প্রতিবেদক:
জুলাই আন্দোলনের সময় রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে মাদ্রাসা ছাত্র আরিফ হত্যা মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার তথ্য উপদেষ্টা এবং বেসরকারি টেলিভিশন স্টেশন ডিবিসির চেয়ারম্যান ইকবাল সোবহান চৌধুরীকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। তদন্ত কর্মকর্তার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট সারাহ্ ফারজানা হক এই আদেশ দেন বলে জানান রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মুহাম্মদ শামছুদ্দোহা চৌধুরী।
এর আগে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা যাত্রাবাড়ী থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মোহাম্মদ আমীর হোসেন তাকে কারাগারে আটক রাখার আবেদন করেন।
ইকবাল সোবহান চৌধুরীর পক্ষে তার আইনজীবী চৌধুরী মো. গালিব রাগীব জামিন আবেদন করেননি। তবে তিনি সুচিকিৎসা এবং ডিভিশনের বিষয়ে শুনানি করেন। আদালতকে তিনি জানান যে তারা জামিন আবেদন করেননি। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে ইকবাল সোবহান চৌধুরী ডিবিসি নিউজের সিইও, একজন সিনিয়র সাংবাদিক এবং একজন অসুস্থ মানুষ। তার ডায়াবেটিস, প্রেশার ও নিউরো সমস্যা রয়েছে। তাই তাকে যেন কারাগারে ডিভিশন দেওয়া হয় এবং সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়।
রাষ্ট্রপক্ষে ঢাকা মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী মামলার বিষয়টি তুলে ধরে আদালতকে বলেন, ফ্যাসিস্ট হাসিনাকে খুশি করে তিনি ডিবিসির মালিক হন এবং পরবর্তীতে তার তথ্য উপদেষ্টার পদ পান। তথ্য উপদেষ্টা হয়ে তিনি বিভিন্ন টেলিভিশনের লাইসেন্স দেন ও মিডিয়া নিয়ন্ত্রণ করেন।
তিনি আরও বলেন, জুলাই আন্দোলনের সময় যেন আন্দোলনকারীদের বক্তব্য মিডিয়াতে প্রচারিত না হয় সেই ব্যবস্থা করেন তিনি। সাংবাদিক মোজাম্মেল হক বাবুসহ একটি সংগঠন তৈরি করে টেলিভিশনগুলোকে সরকারের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেন। এসব কাজের মাধ্যমে তিনি গুলশান-বনানী এলাকায় প্রচুর সম্পদ অর্জন করেন। শেখ হাসিনার পতনের পর তিনি আত্মগোপনে চলে যান এবং গতকাল আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাকে গ্রেফতার করে।
এরপর আইনজীবী চৌধুরী মো. গালিব রাগীব বলেন, তিনি প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ছিলেন এবং ওই পদটি প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদার। তাই জেলকোডটা যেন তাকে কভার করে।
জবাবে প্রসিকিউটর ওমর ফারুক বলেন, তথ্য উপদেষ্টার পদ পাওয়ার পর সেটি যে প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদার, তা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করতে হয়। তার ক্ষেত্রে এরকম কোনও ঘোষণা দেওয়া হয়নি।
উভয় পক্ষের শুনানি শেষে বিচারক ইকবাল সোবহান চৌধুরীকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দিয়ে বলেন, সবকিছু দেখে-শুনে তিনি যে নিয়ম অনুযায়ী সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার যোগ্য, তা তাকে দেওয়া হবে।
এর আগে গত বুধবার দুপুরে রাজধানীর মহাখালীতে বেসরকারি টিভি ডিবিসি নিউজের কার্যালয় থেকে টেলিভিশন স্টেশনটির চেয়ারম্যান ইকবাল সোবহান চৌধুরীকে আটক করে পুলিশ। সে সময় প্রতিষ্ঠানের প্রধান অপরাধ প্রতিবেদক রাজীব ঘোষকেও পুলিশ সঙ্গে নিয়ে যায়।
উল্লেখ্য, ইকবাল সোবহান চৌধুরী প্রভাবশালী দৈনিক ডেইলি অবজারভারের সম্পাদক ও প্রকাশকের দায়িত্বেও নিয়োজিত রয়েছেন।
তাকে গ্রেফতারের পরপরই ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) জনসংযোগ বিভাগের ডিসি আকতার হোসেন গণমাধ্যমকে জানান, একটি খবর প্রচারকে কেন্দ্র করে ডিবিসিতে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল। সেখান থেকেই সাংবাদিক ইকবাল সোবহান চৌধুরী ও রাজিব ঘোষকে ডিবি হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। তবে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি ঠিক কী ছিল, সে বিষয়ে তিনি পরিষ্কার করে কিছু বলেননি।
ওই দিন রাতেই পুলিশ ইকবাল সোবহান চৌধুরীকে মাদ্রাসা ছাত্র আরিফ হত্যা মামলায় গ্রেফতার দেখায়। তবে গোয়েন্দা পুলিশের হাতে আটক হওয়া রাজীব ঘোষকে মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তের তথ্য নিশ্চিত করেন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দাপ্রধান শফিকুল ইসলাম।
মামলার বিবরণী থেকে জানা যায়, জুলাই আন্দোলনের সময় ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই বিকেলে যাত্রাবাড়ীর কুতুবখালী এলাকার বউবাজার রোডে পুলিশ ও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের মধ্যকার গোলাগুলির মধ্যে পড়ে চোখে গুলিবিদ্ধ হন লর্ড হার্ডিঞ্জ ফাযিল মাদ্রাসার আলিম প্রথম বর্ষের ছাত্র আরিফ। তাকে দ্রুত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
এই ঘটনায় নিহত আরিফের বাবা ইউসুফ বাদী হয়ে ২০২৪ সালের ২৫ আগস্ট সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ মোট ২৩৩ জনের বিরুদ্ধে যাত্রাবাড়ী থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। ওই মামলার ৫৩ নম্বর আসামি হিসেবে ইকবাল সোবহান চৌধুরীর নাম অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।











