ঢাকা রবিবার, ০৮ নভেম্বর ২০২৬
বিজ্ঞাপন 📢 Google AdSense — 728 × 90 Leaderboard Placement

মোদি সরকারের ১২ বছরে গণতন্ত্রের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে: সোনিয়া গান্ধী

প্রকাশিত: 7 November 2026, 9:11 pm
ফন্ট:

অনলাইন ডেস্ক:

ভারতের ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) গত ১২ বছরের শাসনামলে দেশের গণতন্ত্র ও বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের মারাত্মক ক্ষতি সাধিত হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন কংগ্রেস নেত্রী সোনিয়া গান্ধী। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে ৭৯ বছর বয়সি সোনিয়া গান্ধী জানান যে, দেশের সাধারণ মানুষ এখন এই ক্ষতির বিষয়টি অনুধাবন করতে শুরু করেছেন এবং তাদের মধ্যে অসন্তোষ দিন দিন দানা বাঁধছে। আগামী ১০ নভেম্বর বিশ্বজুড়ে তার আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ‘বিলংগিং: আ জার্নি অব লাভ’ প্রকাশিত হওয়ার প্রাক্কালে তিনি এই মন্তব্য করেন।

সাক্ষাৎকার চলাকালীন ভারতীয় রাজনীতিতে কংগ্রেসের একসময়ের নিরঙ্কুশ আধিপত্য হ্রাসের বিষয়টির অবতারণা করা হলে তিনি স্পষ্ট জানান যে, এ নিয়ে তার মাঝে কোনো গভীর হতাশা কাজ করছে না। বরং তিনি বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে নিজের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন।

সোনিয়া গান্ধী উল্লেখ করেন, বিগত ১২ বছরের ব্যবধানে দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামো এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর বড় ধরনের আঘাত এসেছে। বর্তমান প্রশাসন ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পরও এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে আনা বেশ সময়সাপেক্ষ ব্যাপার হবে এবং এর জন্য দেশের সব রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকেও সর্বাত্মক উদ্যোগ নেওয়া জরুরি হয়ে পড়বে।

তিনি আরও যোগ করেন যে, সাধারণ জনগণ এখন ক্ষুব্ধ হতে শুরু করেছে এবং সরকারের ভুলের কারণে সৃষ্ট ক্ষতিগুলো তারা পরিষ্কার বুঝতে পারছে। তবে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, দেশের আপামর জনসাধারণ ভবিষ্যতে আবারও দেশে সুশাসনের প্রত্যাবর্তনকে সাধুবাদ জানাবে বলেই তার দৃঢ় বিশ্বাস।

আসন্ন ২০২৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি ক্ষমতাচ্যুত হলে ভারতের জাতীয় রাজনীতি পুনরায় নীতি ও উন্নয়নভিত্তিক প্রতিযোগিতার ধারায় ফিরে আসবে কি না, এমন একটি প্রশ্নের জবাবে তিনি এই মন্তব্য করেন।

সাম্প্রতিক সময়ে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়া এবং বিভিন্ন নির্বাচনী অনিয়মের অভিযোগ তুলে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে রাজপথে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে কংগ্রেস। দলটির স্পষ্ট অভিযোগ যে, বিগত নির্বাচনগুলোতে ভোট জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের কার্যপদ্ধতির প্রতিবাদেও তারা নিয়মিত সোচ্চার রয়েছে।

এর পাশাপাশি, চলতি বছরের জুলাই মাসে নিট (NEET) পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে শিক্ষার্থীদের তীব্র আন্দোলনের মুখে পড়ে ভারতের শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।

বাংলাদেশ ও পাকিস্তান থেকে আগত সংখ্যালঘুদের ভারতীয় নাগরিকত্ব প্রদানের ঘোষণা দিয়েছেন শুভেন্দু অধিকারী।

সোনিয়া গান্ধীর গণতন্ত্র বিষয়ক এমন সমালোচনামূলক মন্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে এর কড়া জবাব দিয়েছে ক্ষমতাসীন দল বিজেপি।

ভারতের কেন্দ্রীয় আইনমন্ত্রী অর্জুন রাম মেঘওয়াল কংগ্রেস নেত্রীর এই বক্তব্যের কঠোর সমালোচনা করে তাকে দেশের ইতিহাসে ১৯৭৫ সালের জরুরি অবস্থার কালো অধ্যায়ের কথা স্মরণ করিয়ে দেন।

আইনমন্ত্রী মেঘওয়াল বলেন, সোনিয়াজি সাক্ষাৎকারে গণতন্ত্রের পক্ষে নানা কথা বলেছেন, কিন্তু তাকে কি ১৯৭৫ সালের সেই মর্মান্তিক সময়ের কথা মনে নেই? সেই সময় কীভাবে গণতন্ত্রকে গলা টিপে হত্যা করা হয়েছিল, বিরোধী দলগুলোর হাজার হাজার জ্যেষ্ঠ নেতাকে কারাগারে বন্দি করা হয়েছিল এবং সংবাদমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করা হয়েছিল, তা তার ভুলে যাওয়া উচিত নয়।

তিনি আরও দাবি করেন যে, গত ১২ বছর ধরে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সুদূর প্রসারী নেতৃত্বে দেশে গণতন্ত্র আরও অনেক বেশি শক্তিশালী হয়েছে এবং তারই জেরে বর্তমান ভারত আজ বিশ্বমঞ্চে ‘গণতন্ত্রের জননী’ হিসেবে নতুন পরিচিতি লাভ করেছে।

কেন্দ্রীয় বস্ত্রমন্ত্রী গিরিরাজ সিংও সোনিয়া গান্ধীর বক্তব্যের তীব্র নিন্দা জানান। তিনি উল্লেখ করেন যে, ভারতের প্রায় নয়টি রাজ্যে গত চার দশক ধরে কংগ্রেসের কোনো অস্তিত্ব বা ক্ষমতা নেই। তার মতে, যারা একসময়ে দেশে জরুরি অবস্থা জারি করে সাধারণ মানুষের কথা বলার অধিকার কেড়ে নিয়েছিল, আজ তারাই গণতন্ত্রের সবক দিচ্ছে।

১৯৭৫ সালের জরুরি অবস্থা জারির পেছনের পটভূমি নিয়ে সাক্ষাৎকারে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেন সোনিয়া গান্ধী।

তিনি জানান যে, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী সেই সময়ে দ্রুত অবনতিশীল জাতীয় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য মরিয়া হয়ে চেষ্টা চালাচ্ছিলেন।

সোনিয়ার ভাষ্য অনুযায়ী, সেই কালপর্বে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে হিংসাত্মক বিক্ষোভ দানা বেঁধেছিল, সরকারি স্থাপনা ও জনপরিবহনে নির্বিচারে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হচ্ছিল এবং ব্যাপক বিশৃঙ্খলার পরিবেশ তৈরি করে সরকারি কর্মকর্তা ও সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের সরকারের নির্দেশ অমান্য করার প্রকাশ্য আহ্বান জানানো হচ্ছিল।

তবে জরুরি অবস্থা জারির মতো কঠোর সিদ্ধান্তকে সরাসরি কোনো সাফাই না দিয়ে তিনি স্বীকার করেন যে, শেষ পর্যন্ত গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই সেই জটিল পরিস্থিতির অবসান ঘটেছিল।

তিনি আরও বলেন, পেছনের দিকে তাকালে ইতিহাসের ঘটনাগুলো আরও স্বচ্ছভাবে উপলব্ধি করা যায়। আমাদের মনে রাখতে হবে যে, ইন্দিরা গান্ধী নিজে থেকেই তৎকালীন পরিস্থিতি মর্মে মর্মে অনুধাবন করতে পেরেছিলেন এবং ১৯৭৭ সালের মার্চ মাসে জাতীয় নির্বাচনের ঘোষণা দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে জরুরি অবস্থার সময় ঘটে যাওয়া অতিরিক্ত কঠোরতার জন্য তিনি প্রকাশ্যে দুঃখ প্রকাশ ও ক্ষমাও প্রার্থনা করেছিলেন।

সোনিয়া গান্ধী অকপটে স্বীকার করেন যে, রাজনীতির মাঠে অনেক সময় বিভিন্ন কারণে সমঝোতা করতে হয়, তবে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) এবং রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) সঙ্গে কংগ্রেস দল অতীতে কখনো কোনো আপস করেনি এবং ভবিষ্যতেও করবে না।

ধারাবাহিকভাবে ২০১৪, ২০১৯ এবং সর্বশেষ ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে বড় ধরনের পরাজয়ের মুখোমুখি হওয়ার পর কংগ্রেস দল এখনো পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াতে সমর্থ হয়নি। দলটির পক্ষ থেকে জোরালো অভিযোগ তোলা হয়েছে যে, নির্বাচন নামক প্রক্রিয়াটির ভেতর খোদ নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরেও এসআইআর প্রক্রিয়া নিয়ে তীব্র মতবিরোধ বিদ্যমান রয়েছে।

প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের অধীনে পরিচালিত ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়া নিয়ে নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক যোশি মাত্র দশ মাসের ব্যবধানে ১৪ বার আনুষ্ঠানিকভাবে নিজেদের দ্বিমত ও আপত্তি জানিয়েছিলেন।

সংবাদমাধ্যমের এই প্রতিবেদনকে সামনে রেখে কংগ্রেসের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে, দেশের বহু নির্বাচনেই গুরুতর কারচুপি হয়েছে এবং সেই কারণেই তারা কাগজের ব্যালটের মাধ্যমে ভোটগ্রহণ পদ্ধতি পুনর্বহালের জোরালো দাবি জানাচ্ছে।

সোনিয়া গান্ধীর সুনির্দিষ্ট অভিযোগ, বর্তমান বিজেপি সরকার কেন্দ্রীয় ক্ষমতা দখল করার পর থেকে কংগ্রেসসহ দেশের অন্যান্য বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ক্ষেত্রে সমান সুযোগ বা লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড পাচ্ছে না।

তিনি বলেন, আমি এই পরিস্থিতিতে খুব বেশি হতাশ বোধ করছি না, কারণ বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে বিরোধী দলগুলোকে কখনোই সমান সুযোগ দেওয়া হয়নি। দেশের প্রায় সবকটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর তাদের একচ্ছত্র ও পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। বিশেষ করে নির্বাচন কমিশনকে ব্যবহার করা, মূলধারার গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ করা, বিপুল পরিমাণ অর্থের অবাধ ব্যবহার এবং রাজনৈতিক স্বার্থে ধর্মকে হাতিয়ার করার মাধ্যমে তারা নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থানকে পাকাপোক্ত করেছে।

তবে নানা প্রতিকূল ও কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও কংগ্রেস দল তাদের রাজনৈতিক লড়াই চালিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে।

সোনিয়া জানান, প্রচণ্ড রাজনৈতিক চাপের মুখেও টিকে থাকার অনন্য সক্ষমতা একমাত্র কংগ্রেসই প্রমাণ করেছে। আমাদের নিবেদিতপ্রাণ নেতা-কর্মীরা নজিরবিহীন সাহসিকতার পরিচয় দিয়ে চলেছেন। বিভিন্ন ধরনের রাষ্ট্রীয় হয়রানি ও নির্যাতনের শিকার হওয়া সত্ত্বেও দেশের প্রতিটি গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলে কংগ্রেসের কর্মীরা সংবিধানের মৌলিক মূল্যবোধ রক্ষার্থে রাজপথে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন।

তিনি আরও দাবি করেন যে, সাম্প্রতিক সময়ের বেশ কিছু নির্বাচনে ভোট কারচুপির ঘটনা এখন দিবালোকের মতো প্রমাণিত হয়েছে এবং এ বিষয়ে সাধারণ মানুষ আগের তুলনায় অনেক বেশি সচেতন হয়ে উঠেছে।

সোনিয়া গান্ধী নিশ্চিত করেন যে, কংগ্রেস দল বর্তমানে একই ধরনের রাজনৈতিক আদর্শের দলগুলোর সঙ্গে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করে যাচ্ছে এবং এর ফলে তাদের নির্বাচনী সম্ভাবনা দিন দিন আরও উজ্জ্বল হচ্ছে।

রাহুলের ‘ভোট বাঁচাও যাত্রা’ আন্দোলনকে অনুপ্রবেশকারী বাঁচানোর আন্দোলন বলে মন্তব্য করেছেন অমিত শাহ।

সাক্ষাৎকারের এক পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক উত্থানের পেছনের বিভিন্ন দিক নিয়েও খোলামেলা কথা বলেন সোনিয়া গান্ধী।

মোদিজির অতি সাধারণ চা বিক্রেতা থেকে দেশের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার এই জীবনসংগ্রামের গল্প তার প্রচার দল কিছুটা বাড়িয়ে প্রচার করেছে কি না—এমন এক প্রশ্নের জবাবে সোনিয়া বলেন, আরএসএস-এর মতো একটি ভিন্ন আদর্শিক বলয় থেকে উঠে এসে কোনো ব্যক্তি যখন নিজ যোগ্যতায় ক্ষমতার সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছান, তখন তার জন্য তাকে অবশ্যই কঠোর পরিশ্রম করতে হয়েছে।

তিনি বলেন, এটি অনস্বীকার্য যে তিনি সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি আদর্শিক পরিমণ্ডলে বড় হয়েছেন, তবে রাজনীতিতে সফল হওয়ার ক্ষেত্রে নানা ধরনের পথ খোলা থাকে। আমাদের দল কংগ্রেসের ভেতরেও এমন অনেক উজ্জ্বল উদাহরণ রয়েছে, যেমন ড. মনমোহন সিং কিংবা বর্তমান কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে। সুতরাং, আরএসএস-এর রাজনৈতিক আদর্শ থেকে আমাদের নতুন করে শেখার মতো বিশেষ কিছু আছে বলে আমি মনে করি না।

মন্তব্য করুন